Image description

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিশ্ববাজারে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে। গত এক সপ্তাহে দেশটিতে সাধারণ মানের পেট্রোলের (রেগুলার গ্যাসোলিন) দাম গ্যালনপ্রতি ৩১ সেন্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৫৪ ডলারে। অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন ‘এএএ’-এর তথ্য অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় এই দাম এখন ৫২ শতাংশ বেশি।

হরমুজ প্রণালীতে অচলাবস্থাই মূল কারণ: জ্বালানি তেলের দাম এভাবে লাফিয়ে বাড়ার পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে বৈশ্বিক তেল বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ ‘হরমুজ প্রণালী’র অচলাবস্থাকে। বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের এক-পঞ্চমাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। কিন্তু যুদ্ধের কারণে ইরান এই পথটি কার্যত বন্ধ করে দেওয়ায় গত দুই মাস ধরে তেলের সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে খুচরা বাজারে।

এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল এনার্জির পরিচালক রব স্মিথ বলেন, “সরকার বা বিশ্লেষকরা যা-ই বলুক না কেন, হরমুজ প্রণালী যতদিন অবরুদ্ধ থাকবে, তেলের দামের ওপর ঊর্ধ্বমুখী চাপ বজায় থাকবেই। কারণ চাহিদার তুলনায় সরবরাহে এখন বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।”

ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও তেলের বাজার: বিশ্লেষকদের মতে, এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানকে শাস্তিস্বরূপ তাদের তেল রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধের যে সিদ্ধান্ত নেয়, সেটিও দাম বাড়ার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে। রাইস ইউনিভার্সিটির এনার্জি রিসার্চ ফেলো জিম ক্রেন বলেন, “ইরান আগে প্রচুর তেল সরবরাহ করে বাজার নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করছিল। কিন্তু মার্কিন অবরোধের ফলে সেই সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের সংকট তীব্র হয়েছে।”

নিজস্ব উৎপাদন সত্ত্বেও কেন সংকটে যুক্তরাষ্ট্র?: যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে আমদানির চেয়ে তেল রপ্তানি বেশি করে, তবুও দেশটি কেন অভ্যন্তরীণ দাম নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না—এটি একটি বড় প্রশ্ন। এর মূল কারণ যুক্তরাষ্ট্রের শোধনাগারগুলোর কারিগরি সীমাবদ্ধতা। আমেরিকান ফুয়েল অ্যান্ড পেট্রোকেমিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারার্স (এএফপিএম)-এর তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৭০ শতাংশ শোধনাগার ‘হেভি সাওয়ার’ বা ভারী তেল পরিশোধনের উপযোগী করে তৈরি, যা মূলত মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব খনিগুলো থেকে উত্তোলিত তেল হলো ‘লাইট সুইট’ বা হালকা তেল। দেশীয় শোধনাগারগুলোকে এই হালকা তেল পরিশোধনের উপযোগী করে গড়ে তুলতে কোটি কোটি ডলারের বিনিয়োগ এবং দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন, যা তাৎক্ষণিক সংকট সমাধানে কোনো কাজে আসছে না।

ভবিষ্যৎ কী?: যদিও সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি প্রাথমিক চুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের নিচে নেমেছে, তবে বিশেষজ্ঞরা এখনই আশাবাদী হতে পারছেন না। যুদ্ধের স্থায়ী সমাধান হলেও বীমা খরচ ও নিরাপত্তা ঝুঁকি বা ‘রিস্ক প্রিমিয়াম’ আগের অবস্থায় ফিরতে দীর্ঘ সময় লেগে যাবে। ফলে আমেরিকান গ্রাহকদের আরও কিছুদিন চড়া দামেই জ্বালানি কিনতে হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

মানবকণ্ঠ/আরআই