তীব্র গরমে প্রশান্তির ছোঁয়া, চন্দনাইশের হাতপাখার কদর এখন বিশ্বজুড়ে
তীব্র তাপদাহ আর ঘন ঘন বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ে যখন জনজীবন ওষ্ঠাগত, বৈদ্যুতিক পাখা যখন অচল—ঠিক তখনই শরীরের ক্লান্তি জুড়াতে সাধারণ মানুষের একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে ঐতিহ্যবাহী তালপাতার হাতপাখা। যান্ত্রিক সভ্যতার এই যুগেও চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার তৈরি এই হাতপাখা মানুষের শরীরে বুলিয়ে দিচ্ছে প্রশান্তির প্রলেপ। আর এই প্রশান্তির জোগান দিতে দিন-রাত নিরলস কাজ করে চলেছেন উপজেলার দুই শতাধিক পরিবার।
চন্দনাইশে তৈরি এই দৃষ্টিনন্দন হাতপাখার খ্যাতি এখন আর শুধু স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা ছড়িয়ে পড়েছে দেশ থেকে দেশান্তরে। এমনকি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে চন্দনাইশের এই ঐতিহ্যবাহী পণ্য। যেসব দুর্গম এলাকায় এখনও বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি, সেখানে তীব্র গরমে পরম বন্ধু এই হাতপাখা। গুণগত মান ও ঐতিহ্যের কারণে এর জনপ্রিয়তা আজও আকাশচুম্বী।
অনুসন্ধানে জানা যায়, চন্দনাইশে হাতপাখা শিল্পের ইতিহাস বেশ পুরনো। ব্রিটিশ শাসনামলে ১৯৪২-৪৩ খ্রিষ্টাব্দের দিকে চন্দনাইশের আবদুল বারীহাট এলাকার সাহাব মিয়া, বদর রহমান ও আবুল হাশেমসহ বেশ কয়েকজন ব্যক্তি জীবিকার সন্ধানে বের হয়ে এই শিল্প আয়ত্ত করেন। পরবর্তীতে তারাই চন্দনাইশে এই কুটির শিল্পের গোড়াপত্তন করেন। বর্তমানে উপজেলার দক্ষিণ জোয়ারা জিহস ফকির পাড়া এবং দক্ষিণ গাছবাড়ীয়া ছিকন কাজী পাড়ায় ব্যাপকভাবে তালপাতার পাখা তৈরি হয়। তবে এর মধ্যে কুটিরশিল্পের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে শীর্ষস্থানে রয়েছে দক্ষিণ জোয়ারা জিহস ফকির পাড়া।
সরেজমিনে চন্দনাইশের গ্রামগুলোতে গিয়ে দেখা যায় এক উৎসবমুখর পরিবেশ। পাখা তৈরির কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন পরিবারের আবালবৃদ্ধবনিতা। সাধারণত পরিবারের পুরুষ সদস্যরা দূর-দূরান্ত থেকে পাখা তৈরির মূল উপকরণ সংগ্রহ করে আনেন। আর ঘরের নারীরা সুনিপুণ ও শৈল্পিক হাতের ছোঁয়ায় তৈরি করেন নজরকাড়া সব পাখা। ঘরের সব কাজ সামলে নারীরা এই শিল্পে দারুণ অবদান রাখছেন। গ্রামের প্রবীণ কারিগর হাশেম, করম আলী ও মো. সৈয়দ জানান, চৈত্র ও বৈশাখ—এই দুই মাস তাদের দম ফেলার ফুসরত থাকে না। একজন কারিগর প্রতিদিন গড়ে ৭ থেকে ৮টি পাখা তৈরি করতে পারেন। এই পাখা বিক্রির আয় দিয়েই চলে তাদের সংসার।
সম্পূর্ণ দেশীয় পদ্ধতিতে, কোনো আধুনিক যন্ত্রপাতি ছাড়াই কেবল দা আর ছুরির সাহায্যে অত্যন্ত নিপুণভাবে তৈরি হয় এই পাখা। এর প্রধান উপকরণগুলো হলো তালপাতা, ডলু ও নিতা বাঁশ, বেত এবং আকর্ষণীয় রঙ। পাখার মান ও দাম নির্ধারণ করা হয় এর বুনন এবং ‘তারি’-র ওপর ভিত্তি করে। কারিগরদের ভাষায়—৭, ৯, ১১ বা ১৩ তারি হিসেবে পাখা বিক্রি হয়। পাখার চারপাশে যতটি বেতের বর্ডার বা বাঁধন দেওয়া হয়, সেটিকে তত ‘তারি’ বলা হয়। বর্ডার যত বেশি হয়, পাখার স্থায়িত্ব ও সৌন্দর্য তত বাড়ে।
বর্তমানে কাঁচামাল তথা তালপাতা, বাঁশ ও বেতের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ কিছুটা বেড়েছে। প্রকারভেদে ও নকশা অনুযায়ী প্রতিটি পাখা পাইকারি ও খুচরা বাজারে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী লালদীঘির মেলা, জব্বারের বলীখেলা, বিভিন্ন বৈশাখী মেলা, গ্রামীণ হাট-বাজার এমনকি গরুর লড়াইয়ের মাঠেও বিপুল পরিমাণে চন্দনাইশের পাখা বিক্রি হয়। এই পাখার গুণগত মান ভালো হওয়ায় কক্সবাজার, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, ফেনী, কুমিল্লা এবং রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা এসে অগ্রিম টাকা দিয়ে পাখা কিনে নিয়ে যান।
শত প্রতিকূলতার মধ্যেও চন্দনাইশের এই দুই শতাধিক পরিবার তাদের পূর্বপুরুষের ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রেখেছেন। কারিগরদের দাবি, সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা গেলে এই কুটির শিল্পটি আরও সমৃদ্ধ হতে পারে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখতে পারে।
মানবকণ্ঠ/ডিআর




Comments