চলন্ত ট্রলার থেকে নদীতে ফেলে দেওয়া যুবকের লাশ ৩৬ ঘণ্টা পর উদ্ধার, আটক ২
হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলায় চলন্ত ইঞ্জিনচালিত ট্রলার থেকে নদীতে ফেলে দেওয়ার পর নিখোঁজ হওয়া মানসিক ভারসাম্যহীন যুবক মো: ফখরুদ্দিনের (৩৫) লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। ঘটনার প্রায় ৩৬ থেকে ৩৭ ঘণ্টা পর নিখোঁজ হওয়ার স্থানেই তাঁর মৃতদেহ ভেসে ওঠে।
এর আগে গত শনিবার (৩০ মে) দুপুর আনুমানিক ২টার দিকে লাখাই থানাধীন ০৬নং বুল্লা ইউনিয়নের ভরপুর্নী গ্রামস্থ বাজারের পশ্চিম-দক্ষিণে ভলাকান্দি ব্রিজ সংলগ্ন 'মরা গাং' নদীতে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে।
নিহত মো: ফখরুদ্দিন ভরপুর্নী নোয়াহাটি (০৬নং ওয়ার্ড, বুল্লা ইউপি) গ্রামের মৃত আব্দুল মালেক ও মৃত মোস্তফা খাতুনের ছেলে। এলাকায় তিনি সহজ-সরল ও মানসিক ভারসাম্যহীন হিসেবেই পরিচিত ছিলেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত শনিবার দুপুর অনুমান ১টা ১৫ মিনিটে বুল্লা বাজার থেকে সুজাতপুরগামী একটি যাত্রীবাহী ইঞ্জিনচালিত ট্রলার নৌকা ছেড়ে আসে। ওই নৌকায় ফখরুদ্দিনসহ অন্যান্য যাত্রীরা ছিলেন। নৌকাটি ভরপুর্নী গ্রামের নিকট পৌঁছালে মানসিক ভারসাম্যহীন ফখরুদ্দিন হঠাৎ নৌকার যাত্রী ঝর্না চৌধুরী (২২) নামের এক নারীর কাছে টাকা চেয়ে অতর্কিতভাবে তাঁকে জড়িয়ে ধরেন।
স্থানীয়রা জানান, এটি ফখরুদ্দিনের পুরনো অভ্যাস ছিল। তিনি মানসিক ভারসাম্যহীন হওয়ায় প্রায়শই চেনা-অচেনা, সহজ-সরল নারী বা পুরুষ যে কাউকে দেখলেই টাকার জন্য এভাবে জড়িয়ে ধরতেন। তবে এই স্বভাবের কথা জানা ছিল না ট্রলারের যাত্রী ঝর্না চৌধুরীর। হঠাৎ এই ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে তিনি চিৎকার শুরু করেন।
ঝর্না চৌধুরীর চিৎকার শুনে নৌকার ছাদে থাকা তাঁর স্বামী মো: রাসেল মিয়া (২২) এবং অপর যাত্রী মো: বোরহান মিয়া (২৬) দ্রুত নৌকার ভেতরে ছুটে আসেন। তারা ক্ষিপ্ত হয়ে ঘটনার কোনো সত্যতা বা ফখরুদ্দিনের মানসিক অবস্থা বিবেচনা না করেই তাকে নৌকা থেকে টেনে বের করেন। একপর্যায়ে চলন্ত নৌকা থেকেই তাকে ভলাকান্দি ব্রিজ সংলগ্ন মরা গাং নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।
ফখরুদ্দিন নদীতে পড়ে যাওয়ার পর নৌকায় থাকা তাঁর পরিচিত অন্য যাত্রীরা তাৎক্ষণিক নৌকা থামিয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই তিনি পানির নিচে তলিয়ে যান। এই অমানবিক ঘটনার খবর এলাকায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় উৎসুক ও ক্ষুব্ধ জনতা ভরপুর্নী বাজারে অভিযুক্ত রাসেল ও বোরহানকে গণপিটুনি দেওয়ার উদ্দেশ্যে আটকে রাখে।
সংবাদ পেয়ে লাখাই থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) এবং দিবাকালীন টহল পার্টির দায়িত্বে থাকা এসআই মুন্না মিয়া সঙ্গীয় ফোর্সসহ দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। পরে তারা বিক্ষুব্ধ জনরোষ থেকে অভিযুক্ত দুজনকে উদ্ধার করে থানা হেফাজতে নিয়ে যান।
আটককৃতরা হলেন— মোড়াকরি গ্রামের মো: ফারুক মিয়ার ছেলে ও ভুক্তভোগী নারীর স্বামী মো: রাসেল মিয়া (২২) এবং লাখাইয়ের বুল্লা বাজারের মৃত আমানুল্লাহর ছেলে মো: বোরহান মিয়া (২৬)।
ঘটনার পর পরই খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের একটি ডুবুরি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। প্রথম দিন বিকেল পর্যন্ত টানা ৪ ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়েও নিখোঁজ ফখরুদ্দিনের কোনো সন্ধান মেলেনি। পরবর্তীতে গত ৩১ মে, রবিবার দিবাগত রাত আনুমানিক ১টার দিকে দুর্ঘটনাস্থলেই ফখরুদ্দিনের মৃতদেহ ভেসে ওঠে। স্থানীয়রা বিষয়টি লাখাই থানা পুলিশকে অবগত করলে পুলিশ গিয়ে নদী থেকে লাশ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে।
এই বিষয়ে লাখাই থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শরীফ আহমেদ জানান, "উদ্ধারকৃত লাশটি ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এখন পর্যন্ত ভিকটিমের পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো লিখিত অভিযোগ বা মামলা দায়ের করা হয়নি। তবে আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখছি। পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ প্রাপ্তি সাপেক্ষে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।"




Comments