জুলাই আন্দোলনে আহত ভুক্তভোগী সাংবাদিকের ন্যায়বিচারের দাবি
২০২৪ সালের রক্তঝরা জুলাই বিপ্লবের উত্তাল সময়ে রাজপথে কলম হাতে সত্য তুলে ধরতে গিয়ে নৃশংস হামলার শিকার হয়েছিলেন সাংবাদিক মো. শফিকুল ইসলাম (দুখু)। বর্তমানে তিনি ‘মানবকণ্ঠ’-এর হালুয়াঘাট প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত থাকলেও, তাঁর জীবন কাটছে চরম যন্ত্রণা আর অনিশ্চয়তায়। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মিললেও এখনো মেলেনি উন্নত চিকিৎসা ও ন্যায়বিচার। দীর্ঘ দুই বছর ধরে চলা এই লড়াইয়ে তিনি ও তাঁর পরিবার আজ নিঃস্বপ্রায়।
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট গাজীপুরের শ্রীপুর পৌর এলাকার মাস্টারবাড়িতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সংবাদ সংগ্রহ করছিলেন শফিকুল ইসলাম। এসময় ২০-৩০ জন দুর্বৃত্ত লাঠি ও রড নিয়ে তাঁর ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। হামলায় তাঁর মাথা ফেটে যায় এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর জখম হয়। হামলাকারীরা তাঁর পেশাগত কাজের ক্যামেরা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়। স্থানীয়রা তাঁকে উদ্ধার করে শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে মাথায় ৭টি সেলাই দেওয়া হয়।
হামলার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবে ২০২৬ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি হঠাৎ তাঁর নাক ও মুখ দিয়ে প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ শুরু হয়। এরপর থেকে তিনি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ, ঢাকা সিএমএইচ ও নিউরোসায়েন্স ইনস্টিটিউটসহ একাধিক হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তাঁর নাকে ও মাথায় গুরুতর আঘাতের ফলে ন্যাসোফ্যারিংসে জটিলতা ও স্কার টিস্যু তৈরি হয়েছে। এর ফলে তিনি তীব্র মাথাব্যথা ও শ্বাসকষ্টে ভুগছেন। দ্রুত অস্ত্রোপচার ও উন্নত চিকিৎসা না হলে বড় ধরনের বিপদের আশঙ্কা রয়েছে।
হামলার পর শ্রীপুর থানায় অভিযোগ ও জিডি করা হলেও আজ পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। বারবার যোগাযোগ করেও পুলিশের কাছ থেকে সন্তোষজনক সাড়া না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এই সাংবাদিক। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করার পথে থাকলেও হামলাকারীরা রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
সাহসিকতার জন্য ২০২৫ সালের মার্চে প্রকাশিত গেজেটে তাঁকে ‘জুলাই যোদ্ধা’ (গেজেট নম্বর ৩৭৬) হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হয়। বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টি থেকেও তিনি সম্মাননা পেয়েছেন। তবে এই সম্মাননা তাঁর পরিবারের অন্ন সংস্থান বা চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে পারছে না। সাত সদস্যের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি শফিকুল এখন শয্যাশায়ী।
আরেকটি মর্মান্তিক পরিহাস হলো, সরকারের পক্ষ থেকে তাঁকে যে জমি বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছে, তা প্রায় ৫ ফুট গভীর গর্ত। সেখানে কোনো যাতায়াতের রাস্তা নেই এবং বর্ষাকালে তা পানির নিচে তলিয়ে থাকে। জমিটি বসবাসের উপযোগী করতে জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে আবেদন করলেও এখন পর্যন্ত কোনো ফল মেলেনি।
অশ্রুসজল চোখে শফিকুল ইসলাম বলেন, “রাষ্ট্র আমাকে স্বীকৃতি দিয়েছে, কিন্তু আমার সুচিকিৎসা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়নি। আমি বাঁচতে চাই এবং আমার ওপর হামলাকারীদের বিচার চাই।”
হালুয়াঘাট প্রেসক্লাবের কার্যকরী সদস্য শফিকুলের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে এবং তাঁর বসতভিটাটি দ্রুত বসবাসের উপযোগী করতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন স্থানীয় সাংবাদিক ও সুশীল সমাজ।
মানবকণ্ঠ/ডিআর




Comments