জনবহুল রাস্তা কিংবা জনসমাগমপূর্ণ স্থানে অতর্কিত হামলা। মুহূর্তের মধ্যে লক্ষ্যবস্তু ধরাশায়ী করে ভিড়ের মধ্যে মিশে যাওয়া। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের অপরাধ জগতে এক নতুন ও ভয়ংকর প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে—তলোয়ার বা আগ্নেয়াস্ত্রের বদলে ব্যবহার করা হচ্ছে খুদে এবং সহজে লুকানো যায় এমন ‘গুপ্ত অস্ত্র’ বা হিডেন উইপেনস।
পেশাদার খুনিদের কাছে এখন জনপ্রিয়তার শীর্ষে রয়েছে তথাকথিত ‘পেন গান’ বা কলম পিস্তল। দেখতে সাধারণ কলমের মতো হলেও এর ভেতরে থাকে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন স্প্রিং এবং একটি ফায়ারিং পিন, যা দিয়ে নির্দিষ্ট ক্যালিবারের বুলেট ছোঁড়া যায়। কলম পিস্তলটি পকেটে রাখা যায় এবং মেটাল ডিটেক্টরে সহজে ধরা না পড়লে এটি দিয়ে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে মৃত্যু নিশ্চিত করা সম্ভব।
এছাড়া বেল্ট-বাকল ছুরি ব্যবহার করছে অনেকে। ধারালো এই ছোট ছুরিটিবেল্টের বকলসের ভেতরে লুকানো থাকে। ব্যবহূত হচ্ছে কার্ড নাইফ। এটি দেখতে সাধারণ এটিএম কার্ডের মতো হলেও ভাঁজ করলে একটি বিপজ্জনক চাকুর রূপ নেয়। ট্যাকটিক্যাল রিং ব্যবহার করছে অনেকে। সাধারণ আংটির মতো মনে হলেও এতে বিষাক্ত সূঁচ বা ক্ষুদ্র ধারালো অংশ যুক্ত থাকে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও বাংলাদেশে ব্যবহার: বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে আন্ডারওয়ার্ল্ড গ্যাংস্টার এবং গুপ্তঘাতকরা বহু বছর ধরে এই ধরণের অস্ত্র ব্যবহার করে আসছে। তবে বাংলাদেশে সাম্প্রতিক কিছু রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনায় এসব অস্ত্রের ব্যবহার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, প্রতিবেশী দেশের সীমান্ত দিয়ে এবং ডার্ক ওয়েব ব্যবহার করে অনলাইন অর্ডারের মাধ্যমে এসব ক্ষুদ্র অস্ত্র দেশে প্রবেশ করছে।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন: নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা এম আজিজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে অস্ত্র আইন অনুযায়ী, লাইসেন্সবিহীন যেকোনো আগ্নেয়াস্ত্র রাখা দন্ডনীয় অপরাধ। তবে ‘গুপ্ত অস্ত্র’র ক্ষেত্রে আইনের প্রয়োগ কিছুটা জটিল। গুপ্ত অস্ত্র মূলত মনস্তাত্ত্বিকভাবে খুনিকে সুবিধা দেয়। সাধারণ মানুষ তো বটেই, অনেক সময় তল্লাশিকালে পুলিশও এগুলো শনাক্ত করতে পারে না। আমাদের প্রচলিত ১৮৭৮ সালের অস্ত্র আইনে আগ্নেয়াস্ত্রের সংজ্ঞা দেওয়া থাকলেও, আধুনিক এই খুদে প্রযুক্তিগুলোর জন্য কঠোর ও সুনির্দিষ্ট বিধিমালা প্রয়োজন।
আইনী ব্যবস্থা: বাংলাদেশে কেউ যদি পেন গান বা এ ধরণের কোনো অস্ত্র বহন করে, তবে তার বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনের অধীনে মামলা করা হয়। দোষী সাব্যস্ত হলে যাবজ্জীবন কারাদ্ল পর্যন্ত হতে পারে। তবে এই অস্ত্রগুলোর আমদানিকারক ও সরবরাহকারী সিন্ডিকেট ধরাটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
জননিরাপত্তায় ঝুঁকি: তদন্ত কর্মকর্তাদের মতে, এই ক্ষুদ্র অস্ত্রগুলো শনাক্ত করা কঠিন হওয়ার কারণে ভিআইপি প্রটোকল এবং সাধারণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা অনেকটা ঝুঁকির মুখে পড়ছে। বিশেষ করে জনাকীর্ণ স্থানে যেখানে মেটাল ডিটেক্টর নেই, সেখানে কলম বা সাধারণ ব্যবহারের জিনিসের ছদ্মবেশে থাকা এই অস্ত্রগুলো মরণঘাতী হয়ে উঠছে। নিরাপত্তা বাহিনীর দাবি, দেশের সীমান্ত এলাকায় কড়াকড়ি এবং কুরিয়ার সার্ভিসগুলোর স্ক্যানিং ব্যবস্থা জোরদার না করলে এই ‘গুপ্ত অস্ত্র’ টার্গেট কিলিংয়ের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যেতে পারে।




Comments