Image description

বিশ্বকাপ ফাইনালে ১০ জনের দলে পরিণত হওয়ার পরও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরেছে আর্জেন্টিনা। ১৯৫৮ ও ১৯৬২ সালের পর প্রথম দল হিসেবে টানা দুটি বিশ্বকাপ জয়ের সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার পর আবেগাপ্লুত হয়ে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তার কথা জানিয়েছেন আর্জেন্টিনার প্রধান কোচ লিওনেল স্কালোনি। তার মতে, আলবিসেলেস্তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও স্পেন যোগ্য দল হিসেবেই বিশ্বকাপের ফাইনালে জয়ী হয়েছে।

৪৮ বছর বয়সী স্কালোনিকে ২০১৮ বিশ্বকাপে শেষ ষোলো থেকে আর্জেন্টিনা বিদায় নেওয়ার পর জাতীয় দলের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। সে সময় প্রধান কোচ হিসেবে তার অভিজ্ঞতা না থাকা এবং সহকারী কোচ হিসেবে অল্প সময় কাজ করার কারণে সিদ্ধান্তটি নিয়ে অনেক সংশয় ছিল।

তবে ডিসেম্বরে বর্তমান চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর দায়িত্ব ছাড়লে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে সফল কোচ হিসেবেই বিদায় নেবেন স্কালোনি। তার অধীনে আর্জেন্টিনা ২০২২ বিশ্বকাপ জেতে, ২০২৬ বিশ্বকাপে রানার্সআপ হয় এবং ২০২১ ও ২০২৪ সালে কোপা আমেরিকার শিরোপাও জিতে।

ফাইনাল ম্যাচ শেষে স্কালোনি দোভাষীর মাধ্যমে বলেন, ‘আমি ফেডারেশনের সভাপতির সঙ্গে কথা বলব। আমি কী করতে চাই, সে বিষয়ে আমার একটি ধারণা আছে। আমি আমার চুক্তির মেয়াদ পূরণ করব। তবে আমার মনে হচ্ছে, বিষয়টি নিয়ে ভাবা প্রয়োজন। কারণ, আবারও এত বড় কিছু করা সম্ভব হবে কি না, আমি জানি না। তাই বিষয়টি নিয়ে আমাদের আলোচনা করা দরকার।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই দায়িত্ব দেওয়ার জন্য আমি সভাপতির প্রতি কৃতজ্ঞ। সে সময় এটি সবার জন্যই একটি স্বপ্নের জায়গা ছিল। কোচিং স্টাফ ও খেলোয়াড়রা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নিজেদের সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। তাই বিষয়টি নিয়ে ভাবার জন্য নিজের কাছে কিছুটা সময় নেওয়া ন্যায্য বলেই আমি মনে করি।’

এ সময় আবেগ ধরে রাখতে না পেরে চোখের পানি মুছতে মুছতে স্কালোনি বলেন, ‘জীবনে কখনোই আমি—আমাকে একটু সময় দিন—আমি বা আমার কোচিং স্টাফ কেউই কল্পনা করিনি যে আমরা এমন একটি জায়গায় পৌঁছাব।’

চোখের পানি ধরে রাখতে না পেরে স্কালোনি বলেন, ‘আমি কখনোই কল্পনা করিনি, আমার কোচিং স্টাফও কল্পনা করেনি যে আমরা এই জায়গায় পৌঁছাব।’

এরপর তিনি বলেন, ‘এভাবে এগিয়ে যেতে হলে অনেক কিছু প্রয়োজন। সবচেয়ে বেশি দরকার মানসিকভাবে নতুন করে শুরু করা। আবার এমন একটি দল গড়ে তোলা খুবই কঠিন। সত্যিই এটি ভীষণ কষ্টের। আমি খুবই দুঃখিত।’

এ কথা বলেই তিনি সংবাদ সম্মেলন শেষ করেন। উপস্থিত সাংবাদিকরা করতালির মাধ্যমে তাকে বিদায় জানান।

সংবাদ সম্মেলনের শুরুতেই স্কালোনি জানান, ফাইনালের ফলাফল নিয়ে তার কোনো অভিযোগ নেই। তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের সব সমর্থকের প্রতি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ। তারা আমাদের যে শক্তি দিয়েছেন, সেটিই আমাদের এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ম্যাচটি যখন পুরোপুরি উন্মুক্ত ছিল, তখনও আমরা শেষ পর্যন্ত লড়াই করেছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা আমাদের পক্ষে যায়নি। স্পেনই জয়ের যোগ্য ছিল। এটাই বাস্তবতা এবং আমাদের সেটি মেনে নিতে হবে। তবে সত্যি বলতে, আমরা খুব কাছাকাছি ছিলাম। আরেকটি বিশ্বকাপ ফাইনালে পৌঁছাতে যারা আমাদের সহায়তা করেছেন, বিশেষ করে আমার খেলোয়াড়দের, আমি সবাইকে ধন্যবাদ জানাতে চাই।’

এই বিশ্বকাপ সম্ভবত আর্জেন্টিনার সেরা তারকা লিওনেল মেসির জন্যও শেষ আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট হতে পারে। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই খেলোয়াড় এবার শিরোপাহীনভাবেই টুর্নামেন্ট শেষ করলেন। তবে স্কালোনি মনে করেন, মেসি নিজে সিদ্ধান্ত না নেওয়া পর্যন্ত খেলতে থাকবেন।

তিনি বলেন, ‘আমার কাছে বিষয়টি একেবারেই পরিষ্কার—সে (মেসি) নিজে থামার সিদ্ধান্ত না নেওয়া পর্যন্ত খেলবে। দল সব সময় তার পাশে থাকবে। আমি আশা করি, সবাই তাকে নিয়ে গর্ববোধ করবে, সে যা অর্জন করেছে তার জন্য। কারণ, আমার মতে সে সর্বকালের সেরা ফুটবলার।’

ম্যাচ শেষে মাঠেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন মেসি। আর্জেন্টিনার সমর্থকদের স্ট্যান্ডের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে তিনি ও তার সতীর্থরা সমর্থকদের অভিবাদন গ্রহণ করেন। এ সময় মেসির চোখেও অশ্রু দেখা যায়।

সমর্থকদের উদ্দেশে স্কালোনি বলেন, ‘আমি নিশ্চিত, আমাদের মতো সমর্থকেরাও কষ্ট পাচ্ছেন। কিন্তু এমন সময় থেকেই আরও শক্তভাবে ঘুরে দাঁড়াতে হয়। রানার্সআপ হওয়ার আনন্দ কখনোই চ্যাম্পিয়ন হওয়ার আনন্দের মতো নয়। তারপরও আমাদের এগিয়ে যেতে হবে।’

আর্জেন্টিনার ক্লাব নিউয়েলস ওল্ড বয়েজের একাডেমির খেলোয়াড় ছিলেন স্কালোনি। একই ক্লাবের বয়সভিত্তিক দলে খেলেই ফুটবলে বেড়ে উঠেছিলেন মেসিও। দুই দশকের খেলোয়াড়ি ক্যারিয়ারে স্কালোনি আর্জেন্টিনা, স্পেন, ইতালি ও অল্প সময়ের জন্য ইংল্যান্ডের বিভিন্ন ক্লাবে খেলেছেন। তবে আর্জেন্টিনার সিনিয়র জাতীয় দলের হয়ে তিনি মাত্র সাতটি ম্যাচ খেলেন। জাতীয় দলের জার্সিতে তার সবচেয়ে স্মরণীয় ম্যাচ ছিল ২০০৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে মেক্সিকোর বিপক্ষে ২-১ গোলের জয়, যেখানে তিনি পুরো ম্যাচ খেলেছিলেন।
মানবকন্ঠ/এমআর