Image description

সকালের এক কাপ চা। খেটে খাওয়া মানুষের দিন শুরু হয় টং দোকানের এই গরম চায়ে চুমুক দিয়ে। আর এই চায়ের সঙ্গে নিত্যসঙ্গী হিসেবে থাকে ‘টা’, অর্থাৎ হরেক রকমের বেকারি পণ্য। সাভারের বিসিক শিল্পনগরীর ট্যানারিশ্রমিক আনিসও তেমনি একজন। সকালে কাজে যাওয়ার আগে দোকানের বেঞ্চে বসে পরম তৃপ্তিতে চায়ের সঙ্গে খাচ্ছিলেন ‘নৌকা কেক’। আনিসের মতো অনেক শ্রমিকই একসঙ্গে চায়ের দোকানে নাস্তা করছেন। কিন্তু আনিসের মতো অগণিত শ্রমজীবী মানুষ কি জানেন, যে খাবার দিয়ে তারা নাস্তা সারছেন, তা আসলে কোন পরিবেশে তৈরি হচ্ছে? জানলে হয়তো রুচিতে বাধত।

বুধবার (২২ জুলাই) সাভারের বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিন অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এসব বেকারির ভয়াবহ ও অস্বাস্থ্যকর চিত্র। তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়নের জয়নাবাড়ি এলাকায় অবস্থিত ‘সেভেন স্টার বেকারি’। ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে লোমহর্ষক দৃশ্য। খালি গায়ে ঘামে ভেজা শরীরে দুজন শ্রমিক কেকের খামির বানাচ্ছেন। পাশেই নোংরা মেঝেতে পত্রিকা বিছিয়ে রাখা হয়েছে চুলা থেকে নামানো স্লাইস কেক। সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে তেড়ে আসেন বেকারির ম্যানেজার। ছবি তুলতে বাধা দিয়ে অদ্ভুতভাবে নিজেকে একজন ‘কনটেন্ট ক্রিয়েটর’ হিসেবে পরিচয় দেন।

একই চিত্র দেখা যায় জয়নাবাড়ি এলাকার ‘জয় ফুড’ নামের আরেকটি বেকারিতে। সেখানে দেখা যায়, শ্রমিকরা কোনো ধরনের গ্লাভস ছাড়াই খালি গায়ে সরাসরি হাত দিয়ে বালতির ভেতর ময়দার মিশ্রণে রং মিশিয়ে নৌকা কেকের ‘ডো’ তৈরি করছেন। শ্রমিকদের গায়ের ঘাম টপটপ করে পড়ছে সেই বালতির মিশ্রণে।

সারা দিন সাভারের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ছোট-বড় প্রায় শতাধিক বেকারি ও শিশুখাদ্য তৈরির কারখানা কোনো ধরনের বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই গড়ে উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশেরই নেই বিএসটিআই সনদ কিংবা পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র।

কারখানাগুলোর ভেতরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, চারদিকে মাছির আনাগোনা এবং পোকামাকড়ের উপদ্রব। খাবার সংরক্ষণে নেই কোনো সঠিক ব্যবস্থা। পোড়া তেল ও নিম্নমানের রাসায়নিক মিশিয়ে তৈরি করা হচ্ছে বিস্কুট, চানাচুর ও পাউরুটি। অধিকাংশ পণ্যের মোড়কে নেই উৎপাদন বা মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে নামি প্রতিষ্ঠানের মোড়ক নকল করে নিম্নমানের পণ্য বাজারজাত করা হচ্ছে।

স্থানীয় দোকানদারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এসব পণ্য দামে সস্তা এবং লাভ বেশি হওয়ায় তারা বিক্রিতে আগ্রহী হন। সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষ, সস্তায় পেয়ে এসব খাবার কিনে নিচ্ছেন। ফলে তারা অজান্তেই মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন। স্থানীয় অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এসব খাবার খেয়ে শিশুরা প্রায়ই আমাশয়, পেটের পীড়াসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।

সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সার্জন জানান, এসব ভেজাল ও নোংরা পরিবেশে তৈরি খাবার মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। দীর্ঘদিন ধরে এসব ভেজাল খাবার ও ক্ষতিকর রং মিশ্রিত পণ্য খেলে ডায়রিয়া, আমাশয়সহ যকৃতের কার্যক্ষমতা নষ্ট হতে পারে। এমনকি অন্ত্রে ক্যানসারের মতো মরণব্যাধি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। শিশুদের ক্ষেত্রে দাঁতের ক্ষয়, কৃমি সংক্রমণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পেটের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

তিনি আরও বলেন, উপজেলা জুড়ে এসব কারখানায় স্যানিটারি ইন্সপেক্টরদের মাধ্যমে নিয়মিত পরিদর্শন ও তদারকি করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম জানান, সাভার একটি শ্রমিক অধ্যুষিত এলাকা হওয়ায় এখানকার চায়ের দোকানগুলোতে মূলত শ্রমিকরাই বেকারি পণ্য দিয়ে নাস্তা করেন। আমরা নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে এসব বিষয়ে জরিমানা করছি। নিরাপদ খাদ্য নীতিমালা অমান্য করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।