ভারতের শাসনব্যবস্থা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আজ এক নজিরবিহীন ও চরম সংকটের মুখোমুখি। মাত্র দুই মাস আগে বিচারপতির এক কটূক্তিকে কেন্দ্র করে পরিহাসমূলকভাবে আত্মপ্রকাশ করা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা তেলাপোকা জনতা দলের নেতৃত্বাধীন ছাত্র-যুব আন্দোলন এখন দিল্লির কেন্দ্রীয় সরকার পতনের মতো এক রাজনৈতিক বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছে। কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে শুরু হওয়া দিল্লির ছাত্র আন্দোলন এখন রূপ নিয়েছে গণআন্দোলনে। রাজপথে সংঘাত, সীমান্তে কৃষকদের ব্যারিকেড আর ঘরে ঘরে পুলিশি হানাদারি সত্ত্বেও আন্দোলন আরো জোরদার হচ্ছে। আন্দোলনকারীদের প্রতি এবার সরাসরি সমর্থন প্রকাশ করেছেন ভারতের বিশিষ্ট চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বরা।
অন্যদিকে, অভিভাবক ও প্রশাসনের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে দেশের দূর-দূরান্তের গ্রাম ও ছোট শহর থেকে তরুণ-তরুণীরা বাড়ি থেকে পালিয়ে এসে যোগ দিচ্ছেন দিল্লির অবস্থান কর্মসূচিতে। মোদী সরকারের আশ্বাসের পরও আন্দোলনকারীরা আলোচনার প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে শুক্রবার পুরো ভারতজুড়ে নতুন করে বিশাল বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দিয়েছে। দিল্লি এখন কার্যত স্তব্ধ, পুরো ভারত জুড়ে এক গভীর অনিশ্চয়তা ও তীব্র উত্তপ্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
টিয়ারগ্যাস ও লাঠিচার্জে রক্তাক্ত রাজধানী: গত ২০ জুলাই হাজার হাজার শিক্ষার্থী তেলাপোকার মুখোশ পরে ও ব্যঙ্গাত্মক ব্যানার হাতে দিল্লির যন্তর-মন্তর থেকে সংসদ ভবন অভিমুখী পদযাত্রা শুরু করলে ঘটনার সূত্রপাত হয়। আন্দোলনকারীদের মূল দাবি ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের তাত্ক্ষণিক পদত্যাগ এবং দেশের সামগ্রিক পরীক্ষা ও নিয়োগ ব্যবস্থার আমূল সংস্কার। কিন্তু পুলিশ সংসদ ভবনের কয়েকশ মিটার দূরে কাঁটাতার ও ভারী ধাতব পাত্রের দেয়াল দিয়ে পথ আটকে দিলে শুরু হয় তুমুল সংঘাত।
আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ শত শত রাউন্ড টিয়ারগ্যাস বা কাঁদানে গ্যাসের সেল নিক্ষেপ করে এবং বেপরোয়া লাঠিচার্জ চালায়। কাঁদানে গ্যাসের ধোঁয়া ও পুলিশের লাঠির আঘাতে যন্তর-মন্তরের রাজপথ দ্রুতই রক্তাক্ত হয়ে ওঠে। সংঘাত ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় শিক্ষার্থী ও পুলিশ সদস্য মিলিয়ে অন্তত ১৮০ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। আহত শিক্ষার্থীদের বয়ে নিয়ে যাওয়ার বাহনে করে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যেতে দেখা গেছে। রাজপথের রণক্ষেত্র এড়াতে যন্তর-মন্তর ও পার্শ্ববর্তী বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাগুলোতে আন্তর্জাল বা ইন্টারনেট সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে এবং অনভিপ্রেত জনসমাগম নিষিদ্ধ করে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীরা কোনো অবস্থাতেই এলাকা ছাড়তে রাজি নন; তারা ২৪ ঘণ্টার অনশন ও অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন।
‘তেলাপোকা’ কটূক্তি থেকে দেশজুড়ে দাবানল: এই অভূতপূর্ব আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটেছিল ২০২৬ সালের মে মাসে। ভারতের উচ্চ আদালতের এক বিচারক বেকার তরুণ ও অধিকারকর্মী আন্দোলনকারীদের উদ্দেশ্যে “সমাজের পরজীবী ও তেলাপোকা” বলে অবমাননাকর মন্তব্য করেন। এই অবমাননাকর মন্তব্যকে প্রতিবাদের মূল হাতিয়ার বানিয়ে আম আদমি দলের সাবেক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কৌশলবিদ অভিজিত্ দীপক গঠন করেন ব্যঙ্গাত্মক মঞ্চ ‘ককরোচ জনতা পার্টি’। শুরুতে একে সাধারণ উপহাস বা প্রহসন মনে করা হলেও, তরুণ সমাজের দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা ক্ষোভের কারণে এটি রাতারাতি দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে।
জাতীয় স্তরের চিকিত্সা বিজ্ঞান প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, কেন্দ্রীয় মাধ্যমিক শিক্ষা পর্ষদের পরীক্ষার অস্বাভাবিক মূল্যায়ন কেলেঙ্কারী এবং কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ বেকারত্বের রেকর্ড সূচক এই তিন সংকট তরুণদের দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দিয়েছিল। শিক্ষার্থীদের সাফ বার্তা: “যে সরকারকে আমরা ভোট দিয়েছি, তারা আমাদের পড়ার টেবিল থেকে রাজপথে নামিয়ে এনেছে। আর অধিকার চাওয়া হলে আমাদের ‘তেলাপোকা’ বলে গালি দেয়া হয়। আজ এই তেলাপোকারাই রাজপথে ব্যবস্থার ভিত নাড়িয়ে দেবে।”
দেশব্যাপী নতুন বিক্ষোভের ডাক: সংগ্রামের মাঝেই শারীরিক সংকটে পড়েছেন আন্দোলনের শীর্ষ সংগঠক। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিত্ দীপক জানান, তীব্র জ্বর ও প্রচণ্ড শারীরিক যন্ত্রণার কারণে চিকিত্সকদের পরামর্শে যন্তর মন্তরের বিক্ষোভস্থল থেকে তাকে কয়েক ঘণ্টার জন্য বিশ্রামে যেতে হচ্ছে। তিনি বার্তায় জানান, “গত কয়েক দিন ধরে কষ্ট সহ্য করে ব্যথার ওষুধ খেয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলাম। সুস্থ হতে কয়েক ঘণ্টা সময় নিচ্ছি, সন্ধ্যার মধ্যেই রাজপথে ফিরব।”
তবে নেতৃত্বের সাময়িক অনুপস্থিতিতে আন্দোলন শ্লথ হয়নি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে দেয়া এক বার্তায় ককরোচ জনতা পার্টি ঘোষণা করেছে, ভারতজুড়ে পুলিশি সহিংসতার শিকার মানুষদের পাশে দাঁড়াতে আগামীকাল শুক্রবার দেশব্যাপী নতুন বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করা হবে। শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলা হয়েছে, দেশের প্রতিটি কোণে সমাবেশের সামনে মূল দাবিগুলো উচ্চস্বরে পাঠ করতে হবে এবং সব ছাত্র সংগঠনকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
আলোচনা ভেস্তে দিল আন্দোলনকারীরা: এদিকে পরিস্থিতি সামলাতে ব্যাকফুটে থাকা কেন্দ্র সরকার আপসের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। দেশটির কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে জরুরি বৈঠক শেষে বিস্ফোরক তথ্য দিয়ে জানান, আলোচনার জন্য কেন্দ্রীয় সরকার ইতোমধ্যে চার চারবার তেলাপোকা জনতা দলের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
জিতেন্দ্র সিং বলেন, “আমাদের আলোচনার দরজা সব সময় খোলা রয়েছে। আন্দোলনকারীরা চাইলে ভারতীয় জনতা পার্টির সভাপতি জে পি নাড্ডার বাসভবন কিংবা কার্যালয়ে এসে সরাসরি কথা বলতে পারেন।” তবে আন্দোলনকারীরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, পদত্যাগের লিখিত সিদ্ধান্ত ছাড়া কোনো মন্ত্রী বা দলীয় প্রধানের বাসভবনে তারা বৈঠকে বসবেন না।
মোদির আশ্বাসকে ‘ভণ্ডামি’ আখ্যা রাহুলের: চাপের মুখে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রথমবারের মতো প্রশ্নপত্র ফাঁসে জড়িতদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি বলেন, “আমাদের তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যত্ নিয়ে ছিনিমিনি খেলার চেষ্টা করা কাউকেই রেহাই দেয়া হবে না। অপরাধীদের দ্রুত সাজা নিশ্চিত করতে আমরা দ্রুত বিচার আদালত বা ‘ফাস্ট ট্র্যাক কোর্ট’ গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
তবে প্রধানমন্ত্রীর এই আশ্বাসকে “ভণ্ডামি ও চোখে ধুলো দেয়ার চেষ্টা” বলে তীব্র আক্রমণ করেছেন ভারতের প্রধান বিরোধী দল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধী। তিনি পাল্টা তোপ দেগে বলেন, “প্রধানমন্ত্রী মোদিই আসলে দেশের তরুণদের ভবিষ্যত্ ধ্বংসের প্রধান কারিগর। আপনার আমলেই গোটা শিক্ষাব্যবস্থা পঙ্গু করা হয়েছে এবং অপরাধীদের সুরক্ষা দেয়া হয়েছে।” রাহুল গান্ধী সরকারের কাছে ৩ দফা দাবি তুলে ধরেন: ১. শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে অবিলম্বে বরখাস্ত ও গ্রেপ্তার করা, ২. সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে সরকারের ক্ষমা চাওয়া এবং ৩. আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশি হামলাকারীদের বিচার করা।
বাড়ি বাড়ি পুলিশি তল্লাশি: রাজপথে দমনপীড়নের পাশাপাশি এখন শুরু হয়েছে প্রশাসনিক ও ডিজিটাল নজরদারি। মুম্বাইসহ বিভিন্ন বড় শহরের পুলিশ আন্দোলনকারীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরাসরি বার্তা পাঠিয়ে তাত্ক্ষণিক ভৌগোলিক অবস্থান বা ‘লাইভ লোকেশন’ শেয়ার করতে বাধ্য করার চেষ্টা করছে। পাশাপাশি প্রধান পাতাল রেল ও রেললাইনের প্রবেশমুখে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে তরুণদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে হ্যারাসমেন্ট করা হচ্ছে যাকে আন্তর্জাতিক অধিকারকর্মীরা ব্যক্তিস্বাধীনতার ওপর নজিরবিহীন আগ্রাসন বলে অভিহিত করেছেন।
অন্যদিকে, আন্দোলনের সমর্থনে পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও উত্তরপ্রদেশ থেকে আসা হাজার হাজার কৃষককে দিল্লির সীমান্তেই (সিন্ধু ও টিকরি সীমানায়) কন্টেইনার ও বড় বড় ব্যারিকেড দিয়ে আটকে দিয়েছে পুলিশ। তবে কৃষকেরা পিছু না হেটে সীমান্তেই স্থায়ী তাবু গেড়ে অবস্থান নিয়েছেন। সেখান থেকেই তারা কাঁটাতার টপকে প্রতিদিন দিল্লির যন্তর-মন্তরে অবস্থানরত আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের কাছে রসদ, খাদ্য ও চিকিত্সা সামগ্রী সরবরাহ নিশ্চিত করছেন।
দক্ষিণ এশিয়ার হাওয়ায় কাঁপছে দিল্লি: আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের এই চলমান আন্দোলন এখন আর কেবল কোনো প্রবেশিকা পরীক্ষার দাবিতে সীমাবদ্ধ নেই। গত কয়েক বছরে দক্ষিণ এশিয়ার একাধিক প্রতিবেশী দেশে তরুণ সমাজের হাত ধরে যেভাবে বড় বড় সরকারের পতন ঘটেছে, রাজপথে আজ তারই প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে। ককরোচ জনতা পার্টির নেতৃত্বে কাল শুক্রবারের ডাকা নতুন বিক্ষোভ কর্মসূচি ভারতকে কোন রাজনৈতিক পরিণতিতে নিয়ে যায়, সেদিকেই এখন নজর পুরো বিশ্বের।




Comments