গলছে বরফ ভাঙছে সীমানা
হিমবাহ ধস বদলে দিতে পারে বাংলাদেশের মানচিত্র
হিমালয়ের বরফাবৃত চূড়া থেকে বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশি—প্রকৃতির এই অনন্য যোগসূত্রের ওপর দাঁড়িয়ে আছে আমাদের অস্তিত্ব। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এশিয়ার ‘জল-মিনার’ হিসেবে পরিচিত হিমালয়ে আজ তৈরি হয়েছে নজিরবিহীন অস্থিরতা। সম্প্রতি নেপালের ত্রিশূলী ও ভোটেকোশী নদী অববাহিকায় ঘটে যাওয়া ভয়াবহ হিমবাহ ধস এবং জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সমুদ্র-গবেষণা সংস্থার চরম সতর্কবার্তা কেবল পাহাড়ের ধ্বংসলীলা নয়, বরং সমুদ্রসমতলের শেষ সীমানায় অবস্থান করা বাংলাদেশের ভূমিরূপ ও ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্র পুরোপুরি বদলে দেওয়ার এক অশনিসংকেত বহন করছে।
বরফ ধস ও পলি-প্লাবন: ভূ-প্রাকৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, হিমালয় কেবল উঁচু পাহাড়ের সারি নয়; এটি বরফ ও পাথরের এক পরম গতিশীল বাস্তুতন্ত্র। সম্প্রতি নেপালে যে বিশাল আকারের বরফ ও পাথরের ধস নেমেছে, তা কোনো সাধারণ বন্যা নয়। ভূ-কম্পন মাপক যন্ত্রে রিখটার স্কেলে ৫.২ মাত্রার কম্পন ধরা পড়ার মতো তীব্র আঘাত হেনেছিল ওই বরফ ধস। মাত্র আধা ঘণ্টার ব্যবধানে নদীপৃষ্ঠের উচ্চতা ৩০ ফুটেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছিল, যা ভাসিয়ে নিয়ে গেছে সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্র।
আন্তর্জাতিক পর্বত গবেষণা সংস্থা (ICIMOD) এবং জাতিসংঘের সর্বশেষ বিশ্ব পানি উন্নয়ন প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, ২০০০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে এশিয়ার উচ্চ পর্বতগুলোর ৫ থেকে ২১ শতাংশ হিমবাহ গলে নিঃশেষ হয়ে গেছে। হিমালয়ের উত্তর সীমান্তে হাজার হাজার হিমবাহ গলনের কারণে সৃষ্ট ‘হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণ বন্যা’ কেবল উজানের পার্বত্য এলাকা ধ্বংস করছে না, অতিরিক্ত পলি ও পানির প্রবল প্রবাহ নিয়ে তা নেমে আসছে ভাটির গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তা অববাহিকায়।
ভূখণ্ড ক্ষয় বনাম নতুন চর: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—হিমবাহ ধসের পানি ও পলি কি বাংলাদেশের মানচিত্রকে ছোট করবে, নাকি এর আয়তন বাড়াবে? উত্তরটি ভূ-প্রাকৃতিক রসায়নে বেশ জটিল। হিমবাহ ধসের সময় বরফ গলে আসার পাশাপাশি কোটি কোটি টন পলি, বালি ও নুড়ি পাথর নদীপ্রবাহে পরিবাহিত হয়। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা বদ্বীপ মূলত এই পলির আমানতেই হাজার বছর ধরে গড়ে উঠেছে।
এখানে মূলত কাজ করে একটি দ্বিমুখী প্রক্রিয়া। একদিকে অতিরিক্ত পানির তীব্র বেগ দেশের উত্তরাঞ্চল, বিশেষ করে তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় ভয়াবহ নদীভাঙন ঘটাচ্ছে। কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, বগুড়া এবং সিরাজগঞ্জের বিপুল ভূখণ্ড নদীগর্ভে বিলীন হয়ে মানচিত্রের সীমানা সংকুচিত করছে। অন্যদিকে, এই বিশাল পলিরাশি যখন বঙ্গোপসাগরের মোহনায় গিয়ে জমা হয়, তখন সেখানে ‘ভূমি পুনরুদ্ধার’ বা নতুন চর সূচিত হয়। তবে বর্তমানে বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে যে আশঙ্কাজনক গতিতে সমুদ্রের পানি সমতল বৃদ্ধি পাচ্ছে, তার কাছে নদী থেকে পলি জমে নতুন জমি গড়ে ওঠার গতি অনেকটাই হার মানছে।
বিশেষ করে ২০৭৫ সাল নাগাদ ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় প্লাবন প্রবাহ শতকরা ৮০ ভাগ এবং গঙ্গা বা পদ্মা অববাহিকায় প্লাবন প্রবাহ ১০৮ ভাগ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। এর ফলে একদিকে উত্তরাঞ্চলের বিস্তৃত চর বিলীন হয়ে নদীগর্ভ প্রশস্ত হবে, অন্যদিকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নোনা পানির প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়ে উপকূলীয় ভাঙন তীব্রতর হবে।
বর্ষায় প্লাবন, শুষ্কে মরুকরণ: হিমালয় হলো একটি প্রাকৃতিক জলাধার। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের শুষ্ক মৌসুমে মিষ্টি পানির চাহিদার ৬৫ শতাংশ ব্রহ্মপুত্র এবং ৭০ শতাংশ গঙ্গা নদী পূরণ করে থাকে এই হিমবাহ গলে আসা পানি থেকে। কিন্তু বরফ গলে যাওয়ার অতি-গতি এই ভারসাম্যকে তছনছ করে দিচ্ছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু নির্গমন নিয়ন্ত্রণে না এলে গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় প্লাবন প্রবাহ বহুগুণ বেড়ে যাবে। এর অর্থ হলো—বর্ষাকালে আকস্মিক ভয়াবহ বন্যা দেশের মধ্যাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চল প্লাবিত করবে। অথচ এর ঠিক উল্টো পিঠে, যখন হিমবাহগুলো ছোট হতে হতে প্রায় নিঃশেষ হয়ে আসবে, তখন শুষ্ক মৌসুমে নদীগুলোতে দেখা দেবে তীব্র পানির আকাল। নদী শুকিয়ে যাওয়া মানেই আমাদের সীমান্ত পয়েন্টগুলোতে সংকট চরম আকার ধারণ করবে, যা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ কৃষি ও নদী ব্যবস্থাকে মরুকরণের দিকে ঠেলে দেবে। সহজ কথায়, বাংলাদেশ বর্ষায় বরফগলা পানির তোড়ে প্লাবিত হবে, আর শুষ্ক মৌসুমে মিষ্টি পানির অভাবে শুকাবে। হিমবাহের এই ভারসাম্যহীন গলন বাংলাদেশের নদীর স্বাভাবিক গতিপথ বদলে দিয়ে মানচিত্রের চিরচেনা অবয়বকে ছিন্নভিন্ন করে দেবে।
তিন ফুট সমুদ্রপৃষ্ঠ বৃদ্ধির চরম বাস্তবতা: হিমালয়ের গলিত বরফের পানি নদী হয়ে শেষ পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরেই পতিত হয়। জাতিসংঘের আইপিসিসি ও আন্তর্জাতিক গবেষণার তথ্য বলছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা যদি ৩ ফুটের বেশি (১ মিটার) বৃদ্ধি পায়, তবে বাংলাদেশের মোট ভূখণ্ডের অন্তত ১৮ শতাংশ—যা প্রায় ২৫ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা—স্থায়ীভাবে পানির নিচে তলিয়ে যাবে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়বে আমাদের ভৌগোলিক সীমানায়। বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা এবং খুলনার নিচু দ্বীপগুলো সমুদ্রগর্ভে বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। ভোলার মতো বৃহত্তম দ্বীপের অবয়ব মানচিত্র থেকে সংকুচিত হয়ে যেতে পারে। আমাদের প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে পরিচিত সুন্দরবনের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ অংশ নোনা পানিতে তলিয়ে যাবে। সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হবে জনমিতিতে; প্রায় তিন কোটিরও বেশি মানুষ নিজেদের ভিটেমাটি হারিয়ে ‘জলবায়ু শরণার্থী’তে পরিণত হবেন। এত বিপুল জনগোষ্ঠীকে দেশের ভৌগোলিক অভ্যন্তরে নতুন করে পুনর্বাসন করা এক মহাজাগতিক চ্যালেঞ্জের জন্ম দেবে।
মানচিত্র কি সংহত হবে নাকি বদলাবে: সার্বিক বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণে এটি স্পষ্ট যে, বাংলাদেশের ভৌগোলিক মানচিত্র সংহত হওয়ার চেয়ে রাজনৈতিক, সামাজিক ও গাঠনিক রূপান্তরে আমূল বদলে যাওয়ার চরম ঝুঁকিতে রয়েছে।
তবে বিজ্ঞানভিত্তিক সমন্বিত পদক্ষেপ নিলে এই প্রাকৃতিক ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা সম্ভব। প্রথমত, নেপাল, ভুটান, ভারত ও চীনকে সাথে নিয়ে বাংলাদেশকে একটি ‘আঞ্চলিক আগাম পূর্বাভাস ব্যবস্থা’ গড়ে তুলতে হবে। নেপালে হিমবাহে কোনো ধস নামলে তা কত ঘণ্টার মধ্যে বাংলাদেশের সীমান্ত স্পর্শ করবে, তার প্রযুক্তিগত মানচিত্রায়ন প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, উজানের পলিকে নদী ভরাট করতে না দিয়ে পরিকল্পিত নদীখননের মাধ্যমে গতিপথ ঠিক করে উপকূলীয় অঞ্চলে পাঠাতে হবে, যাতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে তাল মিলিয়ে পলি জমা হয়ে নতুন স্থলভাগ তৈরি হয়। তৃতীয়ত, নেদারল্যান্ডসের আদলে উপকূলীয় মেগা-বাঁধ নির্মাণ এবং উপকূলজুড়ে কৃত্রিম ম্যানগ্রোভ বা সবুজ বেষ্টনীর বিস্তার ঘটিয়ে সমুদ্রের নোনা পানির আগ্রাসন রোধ করতে হবে।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, ২০০০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে হিমালয়ের ৫ থেকে ২১ শতাংশ হিমবাহ ইতোমধ্যে গলে গেছে, যা ভাটির নদীগুলোকে চরম অনিশ্চয়তায় ফেলেছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও নদীভাঙনে বিশাল ভূখণ্ড তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে দেশের ভৌগোলিক সীমানা মারাত্মকভাবে ছোট হয়ে আসতে পারে।
হিমালয়ের বরফ গলার খবরটি কেবল একটি দূরবর্তী বৈজ্ঞানিক তথ্য নয়; এটি বাংলাদেশের প্রতিটি ইঞ্চি ভূখণ্ডের টিকে থাকার লড়াই। প্রকৃতি যদি তার দীর্ঘদিনের গতিপথ বদলে দেয়, আর বৈজ্ঞানিক ও টেকসই ভূ-প্রাকৃতিক পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে আগামী কয়েক দশকে দেশের মানচিত্র থেকে অনেক পরিচিত জনপদ চিরতরে হারিয়ে যাবে। সঠিক প্রজ্ঞা ও বাস্তবমুখী কৌশলের মাধ্যমে এখনই সোচ্চার হতে হবে—নতুবা হিমবাহ ধসের তোড়ে কেবল নদী নয়, বদলে যাবে প্রিয় মাতৃভূমির ভৌগোলিক পরিচয়।
ডিআর




Comments