বাংলাদেশের প্রতি পাকিস্তানের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক আগ্রহ, ঘন ঘন যোগাযোগ এবং বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ স্বাভাবিকভাবেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে। যে রাষ্ট্র একসময় বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিল, গণহত্যা চালিয়েছিল এবং বাঙালির গণতান্ত্রিক অধিকার অস্বীকার করেছিল, সেই পাকিস্তান কি সত্যিই আজ বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু হতে চায়? নাকি সময়ের পরিবর্তিত বাস্তবতায় বন্ধুত্বের মুখোশে নিজেদের ভ‚রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ হাসিলের নতুন কৌশল গ্রহণ করেছে? প্রশ্নটি আবেগের নয়, বরং ইতিহাস ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থের আলোকে বিচার করার বিষয়।
বাংলাদেশের ইতিহাসে পাকিস্তান কেবল একটি প্রতিবেশী বা সাবেক রাষ্ট্রীয় অংশীদারের নাম নয়; পাকিস্তান আমাদের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া একটি রাষ্ট্রের নাম। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ এই দীর্ঘ সময়ে পূর্ব বাংলার মানুষের ওপর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামরিক বৈষম্য চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বাঙালির সুস্পষ্ট গণরায়কে অস্বীকার করা হয়। এরপর ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ শুরু হয় ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ সামরিক অভিযান। লাখো মানুষের প্রাণহানি, অসংখ্য নারীর ওপর নির্যাতন এবং কোটি মানুষের বাস্তুচ্যুতির মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি স্বাধীনতার মূল্য পরিশোধ করেছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো- স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও পাকিস্তান কি সেই ইতিহাসের দায় স্বীকার করেছে? উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। বাংলাদেশ বারবার পাকিস্তানের কাছে ১৯৭১ সালের গণহত্যার জন্য আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনার দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে অমীমাংসিত আর্থিক সম্পদ, দায়দেনা এবং অন্যান্য ঐতিহাসিক বিষয়ও রয়েছে। কিন্তু পাকিস্তানের পক্ষ থেকে এখনো এমন কোনো সুস্পষ্ট, রাষ্ট্রীয় এবং নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা দেখা যায়নি, যা বাংলাদেশের মানুষের ক্ষতকে কিছুটা হলেও সম্মান জানাতে পারে। বরং সা¤প্রতিক বছরগুলোতেও পাকিস্তানের কিছু শীর্ষ পর্যায়ের বক্তব্যে ১৯৭১ সালের অমীমাংসিত বিষয়গুলোকে ‘আগেই নিষ্পত্তি হয়ে গেছে’ বলে দাবি করা হয়েছে- যার সঙ্গে বাংলাদেশ প্রকাশ্যেই দ্বিমত পোষণ করেছে। এই বাস্তবতায় পাকিস্তানের বর্তমান ‘দরদ’ নিয়ে সতর্ক হওয়া অস্বাভাবিক নয়। রাষ্ট্র পরিচালনায় স্থায়ী বন্ধু বা শত্রুর চেয়ে স্থায়ী স্বার্থ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক রাজনীতির এই পুরনো বাস্তবতা পাকিস্তানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান পরিবর্তিত ভ‚রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে। বঙ্গোপসাগর, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগ, ক্রমবর্ধমান অর্থনীতি এবং আঞ্চলিক ক‚টনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান পাকিস্তানের কাছে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্রশ্ন উঠতেই পারে- পাকিস্তানের এই নতুন বন্ধুত্বের আগ্রহ কি বাংলাদেশের প্রতি ভালোবাসা থেকে, নাকি নিজেদের কৌশলগত প্রয়োজন থেকে?
সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, যোগাযোগ, ভ্রমণ ও অন্যান্য ক্ষেত্রে সম্পর্ক বৃদ্ধির আলোচনা হয়েছে। এমনকি বিশ্লেষকরা বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্কের ক্ষেত্রে বর্ধিত কূটনৈতিক ও কৌশলগত যোগাযোগের কথাও উল্লেখ করছেন। কিন্তু সম্পর্কের এই উষ্ণতার পেছনে পারস্পরিক বিশ্বাসের চেয়ে ভূরাজনৈতিক হিসাব বড় ভ‚মিকা রাখছে- এমন মূল্যায়নও রয়েছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ভুল হবে যদি আমরা পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ককে কেবল আবেগ দিয়ে বিচার করি। হয় অন্ধ শত্রুতা, নয় অন্ধ বন্ধুত্ব।
বাংলাদেশের প্রয়োজন বাস্তববাদী কূটনীতি। পাকিস্তানের সঙ্গে বাণিজ্য হতে পারে, শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিনিময় হতে পারে, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কও গড়ে উঠতে পারে। একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ অবশ্যই সব দেশের সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক উন্নয়ন করবে। কিন্তু সম্পর্ক উন্নয়ন আর ইতিহাস ভুলে যাওয়া এক বিষয় নয়। পাকিস্তান বাংলাদেশের বন্ধু হতে চাইলে প্রথমে তাকে বন্ধুত্বের নৈতিক ভিত্তি তৈরি করতে হবে। ১৯৭১ সালের গণহত্যা ও নির্যাতনের বিষয়ে স্পষ্ট ও নিঃশর্ত রাষ্ট্রীয় ক্ষমা প্রার্থনা সেই ভিত্তির অন্যতম শর্ত। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত আর্থিক ও রাষ্ট্রীয় বিষয়গুলোর সমাধানে আন্তরিক পদক্ষেপ নিতে হবে। অতীতের দায় অস্বীকার করে ভবিষ্যতের বন্ধুত্ব দাবি করা যায় না। বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ এখন আর ১৯৭১ সালের যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্র নয়। আজকের বাংলাদেশ একটি স্বাধীন, আত্মমর্যাদাশীল ও সম্ভাবনাময় রাষ্ট্র। আমাদের উন্নয়ন, অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে কোনো রাষ্ট্রের কৌশলগত খেলায় অংশ হওয়ার সুযোগ নেই। কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক এমন পর্যায়ে নেয়া যাবে না, যেখানে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি অন্য কোনো রাষ্ট্রের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা তার হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের টানাপড়েন বা মতপার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের সমস্যা সমাধানের বিকল্প হিসেবে পাকিস্তানের দিকে অন্ধভাবে ঝুঁকে পড়া কোনো বিচক্ষণ কৌশল হতে পারে না। এক দেশের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে গিয়ে আরেক দেশের কৌশলগত প্রভাবের মধ্যে প্রবেশ করা স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির পরিচয় নয়।
বাংলাদেশের নীতি হওয়া উচিত- সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কিন্তু কারও প্রতি অন্ধ আনুগত্য নয়; সবার সঙ্গে বাণিজ্য, কিন্তু জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে নয়; সবার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক, কিন্তু ইতিহাস ও আত্মমর্যাদা বিকিয়ে নয়।
পাকিস্তানকে তাই বাংলাদেশের ‘চিরশত্রু’ হিসেবে আবেগের ভিত্তিতে চিরকাল সংজ্ঞায়িত করার চেয়ে বলা যায়। বাংলাদেশের ইতিহাসে পাকিস্তান একটি গভীরভাবে বৈরী ও বেদনাদায়ক রাষ্ট্রীয় ভূমিকা পালন করেছে, যার দায় এখনো পুরোপুরি স্বীকার ও নিষ্পত্তি হয়নি। সেই ইতিহাস অমীমাংসিত রেখেই পাকিস্তানের হঠাৎ বন্ধুত্বের আহ্বানকে সরল বিশ্বাসে গ্রহণ করার কোনো কারণ নেই। বন্ধুত্বের দরজা বন্ধ থাকবে না, কিন্তু দরজার পাহারাও থাকতে হবে।
বাংলাদেশ পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক করবে নিজের স্বার্থে, পাকিস্তানের স্বার্থে নয়। বন্ধুত্ব হবে সমতার ভিত্তিতে, করুণার ভিত্তিতে নয়। সহযোগিতা হবে স্বচ্ছতার সঙ্গে, গোপন ভূরাজনৈতিক হিসাবের বিনিময়ে নয়। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-১৯৭১ ভুলে নয়, ১৯৭১-এর সত্যকে স্বীকার করেই ভবিষ্যতের সম্পর্ক নির্মাণ করতে হবে। কারণ যে রাষ্ট্র অতীতের অপরাধ স্বীকার করতে পারে না, তার বর্তমানের প্রতিশ্রুতির ওপর আস্থা রাখার আগে শতবার ভাবতে হয়। পাকিস্তান সত্যিই বাংলাদেশের বন্ধু হতে চাইলে প্রমাণের দায়িত্ব পাকিস্তানের। বাংলাদেশের দায়িত্ব হলো- হাসিমুখের কূটনীতির আড়ালে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ, ইতিহাস এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তাকে সতর্ক চোখে দেখা। বর্তমানের মধুর কথায় যেন আমরা অতীতের রক্তের ইতিহাস ভুলে না যাই এবং নতুন কোনো কৌশলগত খেলায় বাংলাদেশের উন্নয়ন ও সার্বভৌমত্ব যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। সেটিই হওয়া উচিত আজকের সবচেয়ে বড় সতর্কতা।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট




Comments