এক মুঠো পুষ্টিকর খাবারের আশায় প্রতিদিন বিদ্যালয়ে আসে হাওরপাড়ের শত শত কোমলমতি শিশু। দারিদ্র্যপীড়িত পরিবারের অনেক শিশুর কাছেই বিদ্যালয়ের খাবার দিনের অন্যতম ভরসা। অথচ সেই খাবারেই যদি থাকে পচন, দুর্গন্ধ কিংবা ফাঙ্গাস, তাহলে আনন্দের বদলে তাদের চোখেমুখে নেমে আসে আতঙ্ক।
নেত্রকোনার খালিয়াজুরীতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের স্কুল ফিডিং কর্মসূচির আওতায় খাবার বিতরণে অনিয়ম ও নিম্নমানের খাদ্য সরবরাহের অভিযোগ উঠেছে। অভিভাবকদের অভিযোগ, কোথাও পচা ডিম, ছোট ও পচা কলা এবং ফাঙ্গাসযুক্ত বা মেয়াদোত্তীর্ণ বনরুটি দেওয়া হচ্ছে। আবার কোথাও নিয়মিত দেওয়া হচ্ছে না বিস্কুট, ডিম, কলা কিংবা দুধ।
নিম্নমানের খাবার দেখে অনেক শিক্ষার্থী তা মুখে তুলছে না; বাধ্য হয়ে ফেলে দিচ্ছে। এতে সরকারের পুষ্টি কর্মসূচির সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে শিশুরা। একই সঙ্গে নিম্নমানের খাবার খেয়ে শিশুদের অসুস্থ হয়ে পড়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
খালিয়াজুরীর কল্যাণপুর ও কুতুবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ উপজেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে খাবার বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ করেছেন অভিভাবকেরা। দুর্গম হাওরাঞ্চলের বানোয়ারি জুয়েল চৌধুরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রানিচাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মেন্দিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ অন্তত ১৫টি বিদ্যালয়ে খোঁজ নিয়ে একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
মেন্দিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অভিভাবক প্রিয়াংকা আক্তার ও রীতামনি আক্তার বলেন, ‘রুটিগুলো খাবার উপযোগী নয়। ফাঙ্গাসে আক্রান্ত রুটি ফেলে দিতে হয়। কলা ও ডিমও নষ্ট থাকে। দুধ মাঝে মাঝে দেওয়া হয়। এসব খাবার খেয়ে শিশুরা পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হয়।’
অভিভাবকদের প্রশ্ন, যে খাবার কোমলমতি শিশুরা খেতেই পারছে না, সেই খাবার সরবরাহ করে প্রকল্পের উদ্দেশ্য কতটা পূরণ হচ্ছে?
স্থানীয় অভিভাবক গোপেশ তালুকদার বলেন, শিশুদের জন্য বরাদ্দ খাবার পচা বা বাসি হলে তাদের স্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তাই নিয়মিত ও কার্যকর মনিটরিং প্রয়োজন। শিশুদের জন্য বরাদ্দ অতিরিক্ত খাবার কোথায় যায় বা কোথাও বিক্রি হয় কি না, সেসব বিষয়ও তদন্তের দাবি জানান তিনি।
মেন্দিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও উপজেলা শিক্ষক সমিতির সভাপতি হিমাংশু সরকার বলেন, ‘খালিয়াজুরীতে বিস্কুট প্রথম সপ্তাহে দেওয়ার পর আর দেওয়া হচ্ছে না। রুটি, কলা মানসম্মত না হলে আমরা রাখছি না। তবে শিশুদের খাবার না রাখলেও পরে আর এগুলো দেওয়া হয় না। এতে শিশুরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমরা উপজেলা আইনশৃঙ্খলা ও উন্নয়ন সভায় বিষয়টি বারবার জানিয়েছি।’
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিম্নমানের খাবার গ্রহণ না করলে তার বিকল্প হিসেবে মানসম্মত খাবার সরবরাহ নিশ্চিত করা হচ্ছে না কেন—এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, বিদ্যালয়ে খাবার গ্রহণের আগে প্রধান শিক্ষকদের খাবারের গুণগত মান যাচাই করতে হয়। বনরুটি তাজা, নরম, দুর্গন্ধ ও ফাঙ্গাসমুক্ত কি না এবং প্যাকেটে উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ সঠিক আছে কি না, তা পরীক্ষা করার কথা।
ডিমে ফাটল, দুর্গন্ধ বা পিচ্ছিল ভাব থাকলে তা গ্রহণ না করার নির্দেশনা রয়েছে। কলা হতে হবে পচন, দাগ ও পোকামাকড়মুক্ত। ইউএইচটি মিল্ক ও ফর্টিফাইড বিস্কুটের প্যাকেট অক্ষত কি না, উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ এবং নেট ওজনও যাচাই করার কথা।
কিন্তু খালিয়াজুরীর মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। অভিভাবকদের অভিযোগ, যথাযথ তদারকি ও মান যাচাই ছাড়াই অনেক সময় খাবার বিদ্যালয়ে পৌঁছাচ্ছে।
দুর্গম হাওরাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে সংকট আরও প্রকট বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার সুযোগে নিম্নমানের খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। নির্ধারিত দিনে খাবার না পাওয়া, তালিকাভুক্ত খাবারের পরিবর্তে অন্য খাবার দেওয়া এবং নিম্নমানের খাদ্য সরবরাহের অভিযোগও রয়েছে।
শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করা এবং বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া রোধে স্কুল ফিডিং কর্মসূচি চালু করা হলেও খাবার বিতরণে অনিয়ম হলে এর মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হতে পারে বলে মনে করছেন অভিভাবকেরা।
খালিয়াজুরী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আজিমেল কদর বলেন, ‘আমি এলপিআরে চলে যাচ্ছি। অনেক চেষ্টা করেছি, অনেক ত্রুটি আছে। প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের খাদ্যসামগ্রী বিতরণে অনিয়মের বিষয়টি আমরা অবগত হয়েছি। বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী নিয়মিত বিতরণে সমস্যা রয়েছে।’
খালিয়াজুরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অলিদুজ্জামান বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত খাদ্যসামগ্রী বিতরণে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। দুর্গম হাওরাঞ্চলে নির্ধারিত তালিকার খাদ্যসামগ্রীর ধরন পরিবর্তন করা হলে এ ধরনের সংকট কিছুটা কমতে পারে।’
জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে কোনো অবস্থাতেই কারও গাফিলতি মেনে নেওয়া হবে না। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সরকারের স্কুল ফিডিং কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারের শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করা। অথচ সেই খাবার যদি পচা বা বাসি হয় এবং শিশুরা তা খেতে না পারে, তাহলে সরকারি অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি প্রশ্নবিদ্ধ হয় পুরো ব্যবস্থাপনা।
অভিভাবকদের দাবি, শুধু নির্দেশনা জারি করলেই দায়িত্ব শেষ করা যাবে না। বিদ্যালয়ে আকস্মিক পরিদর্শন, খাবারের মান পরীক্ষা, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
কারণ, এটি শুধু খাবার বিতরণে অনিয়মের বিষয় নয়—এটি দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য ও পুষ্টির প্রশ্ন। হাওরের দরিদ্র পরিবারের যে শিশুটি ক্ষুধার্ত পেটে বিদ্যালয়ে আসে, তার হাতে পুষ্টিকর খাবারের বদলে পচা বা নিম্নমানের খাবার তুলে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
অভিভাবকদের একটাই দাবি—শিশুদের বরাদ্দ খাবারে নয়, তাদের মুখে ফুটুক সুস্থতার হাসি।
এসএ




Comments