চীনের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও উদ্ভাবন কাছ থেকে দেখতে দেশটিতে বিদেশি বিনিয়োগকারী, উদ্যোক্তা ও নির্বাহীদের ভ্রমণ বাড়ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মানবসদৃশ রোবট, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তির প্রতি বিশ্বব্যাপী আগ্রহের মধ্যেই এই প্রবণতা দেখা দিয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তারা চীনের কারখানায় সরাসরি প্রবেশের সুযোগ পেতে হাজার হাজার ডলার পর্যন্ত ব্যয় করছেন। তাদের অনেকেই মনে করছেন, উন্নত উৎপাদন ও আধুনিক প্রযুক্তিতে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো এগিয়ে যাচ্ছে।
সাংহাইভিত্তিক তথ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাইগুয়ানের প্রধান নির্বাহী রবার্ট উ বলেন, কয়েক বছর আগেও চীনকে মূলত পর্যবেক্ষণ ও শেখার বিষয় হিসেবে দেখার প্রবণতা খুব একটা ছিল না। এখন বিদেশিরা চীনের প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন ব্যবস্থা কাছ থেকে বুঝতে দেশটিতে আসছেন।
এখন পর্যন্ত দুই দফায় দুই ডজনের বেশি বিনিয়োগকারী, উদ্যোক্তা ও নির্বাহীকে নিয়ে প্রযুক্তি ভ্রমণের আয়োজন করেছেন। পাঁচ দিনের এসব কর্মসূচির জন্য সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। অংশগ্রহণকারীদের প্রায় অর্ধেকই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে এসেছেন।
চীনের প্রযুক্তি খাত ঘিরে বিদেশিদের আগ্রহের সঙ্গে দেশটির শিল্পভিত্তিক পর্যটনও বাড়ছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর চীনের শিল্প পর্যটন খাতে ১৭ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার আয় হয়েছে। ২০২৯ সালের মধ্যে তা ৩০০ বিলিয়ন ইউয়ান বা ৪৪ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
সাংহাইভিত্তিক প্রযুক্তি ভ্রমণ সংস্থা গ্লোপেন জানিয়েছে, ২০২৬ সালে তাদের কাছে প্রযুক্তি ভ্রমণের বিষয়ে অনুসন্ধান ৫০ শতাংশ বেড়েছে। অধিকাংশ আগ্রহী গ্রাহক ইউরোপ ও সিঙ্গাপুরের। প্রতিষ্ঠানটি এখন প্রতি মাসে ১০০টির বেশি একদিনের কোম্পানি ভ্রমণের আয়োজন করছে।
বিদেশি উদ্যোক্তাদের এসব ভ্রমণের অন্যতম গন্তব্য বেইজিং, শেনঝেন, সাংহাই, হাংঝৌ ও হেফেই। চীনের বৈদ্যুতিক গাড়ি, ব্যাটারি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবটিকস খাতের বড় কেন্দ্র এসব শহর।
গ্লোবাল শিপিং বিজনেস নেটওয়ার্কের প্রধান নির্বাহী বার্ট্রান্ড চেন বলেন, কারখানার উৎপাদনমুখী পরিবেশে সরাসরি না গেলে চীনা উদ্ভাবনের প্রকৃত মাত্রা, গতি ও বাস্তব প্রয়োগ বোঝা কঠিন।
চীনা-আমেরিকান বিনিয়োগকারী রুই মা ২০১৯ সাল থেকে এ ধরনের ১১টি প্রযুক্তি ভ্রমণের আয়োজন করেছেন। তার মতে, চীনে বিনিয়োগ না করলেও বিশ্বের বিভিন্ন বাজারে চীনা প্রতিষ্ঠানকে প্রতিদ্বন্দ্বী, অংশীদার বা সরবরাহকারী হিসেবে মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
পিছিয়ে পড়ার শঙ্কা
চীন সরকার শিল্প পর্যটনকে উৎসাহিত করছে এবং ১৪০টির বেশি সরকারি প্রদর্শনী কেন্দ্র নির্ধারণ করেছে। অনেক কারখানাও সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য প্রায় ৬০ ডলারে ভ্রমণের সুযোগ দিচ্ছে।
চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান শাওমির বৈদ্যুতিক গাড়ির কারখানায় ২০২৪ সালের মার্চ থেকে আড়াই লাখের বেশি মানুষ ভ্রমণ করেছেন। চাহিদা এত বেশি যে লটারির মাধ্যমে পাওয়া প্রবেশের সুযোগ অনলাইনে ২ হাজার ইউয়ান বা প্রায় ৩০০ ডলার পর্যন্ত দামে বিক্রি হচ্ছে বলে রয়টার্স জানিয়েছে। তবে শাওমি জানিয়েছে, অনলাইন লটারির মাধ্যমে দর্শনার্থী নির্বাচন করা হয় এবং টিকিট হস্তান্তর করা যায় না।
বিশেষ করে ইউরোপের নির্বাহীদের মধ্যে চীনের প্রযুক্তি খাত নিয়ে আগ্রহ বেশি। উৎপাদনশীলতার ধীর গতি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবটিকসে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের তুলনায় পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা তাদের চীনে নিয়ে আসছে।
সাংহাইভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পরামর্শক অ্যালেক্স শেংইউন লু ২০২৫ সালের শেষ দিক থেকে সাতটি প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। এসব দলে সর্বোচ্চ ৫০ জন পর্যন্ত করপোরেট প্রতিনিধি ছিলেন।
লুর ভাষায়, ইউরোপের সবচেয়ে দক্ষ ব্যক্তিরাও পরিস্থিতি সম্পর্কে গভীরভাবে সচেতন এবং তাদের মধ্যে পিছিয়ে পড়ার উদ্বেগ স্পষ্ট। চীনা প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের পদ্ধতি থেকে কী শেখা যায়, তা জানতে তারা দেশটিতে আসছেন।
তবে প্রযুক্তি খাতের কিছু পর্যবেক্ষক চীনের অগ্রগতিকে অতিরঞ্জিত না করার বিষয়ে সতর্ক করেছেন। রুই মা বলেন, চীনের বাইরের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতেই এখনো বৈশ্বিক বাজারের বড় অংশ, সবচেয়ে উন্নত মেধাস্বত্ব এবং সবচেয়ে বেশি মুনাফা রয়েছে।
শেনঝেন হয়ে উঠছে প্রযুক্তি ভ্রমণের কেন্দ্র
চীনের দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রযুক্তি নগরী শেনঝেন এই প্রবণতার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হয়ে উঠেছে। নভেম্বরে এশিয়া-প্যাসিফিক ইকোনমিক কো-অপারেশন বা এপেকের সম্মেলন আয়োজনের প্রস্তুতির পাশাপাশি শহরটি নিজেদের চীনা উদ্ভাবনের প্রদর্শনী হিসেবে তুলে ধরছে।
গত বছর শেনঝেনে বিদেশি দর্শনার্থীর সংখ্যা ৭০ শতাংশ বেড়েছে। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে তা আরও ৩০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। আগস্ট পর্যন্ত এ বছর শহরটিতে ৫০ লাখের বেশি প্রবেশ রেকর্ড হয়েছে।
শহরের ট্যাক্সিতে এখন ইংরেজি ভাষায় ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে। প্রযুক্তি প্রদর্শনীতেও নিয়মিত বিদেশি প্রভাবশালীদের দেখা যাচ্ছে। বিদেশি রোবটিকস ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উদ্যোক্তাদের থাকা ও কাজের জন্য স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সিলিকন ভ্যালির আদলে ‘হ্যাকার হাউস’ও গড়ে তুলছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শেনঝেনে বসবাসকারী মার্কিন উৎপাদন পরামর্শক জোশুয়া উডার্ড বলেন, সিলিকন ভ্যালি ও শেনঝেনের মধ্যে যাতায়াতকারী শত শত মানুষের ওয়েচ্যাট গ্রুপ রয়েছে, যেখানে ব্যাটারি বা ডিসপ্লে কারখানা খুঁজতে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
তার মতে, চীনে থাকা উৎপাদন উপকরণ ও হার্ডওয়্যার থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হওয়া অত্যন্ত কঠিন। তিনি বলেন, বাস্তব পণ্য তৈরির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের কাছে রাজনীতির চেয়ে উৎপাদন ও প্রযুক্তির বিষয়টিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
১১ বছর ধরে শেনঝেনে বসবাসকারী চেক উদ্যোক্তা জান স্মেইকাল বলেন, বিদেশি স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের শহরটি ঘুরে দেখার আগ্রহের অনুরোধ প্রায় প্রতিদিনই আসে। তার ভাষায়, প্রযুক্তিকে কেন্দ্র করে সেটিকে দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে শেনঝেনের মতো করে বিশ্বের আর কোনো শহর একীভূত করেনি।
সূত্র: রয়টার্স
এনএ




Comments