প্রেমের গল্প অনেক আছে। তবে শত শত বছর ধরে কোনো জনপদে যে প্রেমের স্মৃতি লোককথা ও লোকঐতিহ্যের অংশ হয়ে টিকে আছে, চণ্ডীদাস-রজকিনীর কাহিনি তারই একটি উদাহরণ। মাগুরার শালিখা উপজেলার শতখালী ইউনিয়নের ধোপাখালী গ্রামে স্থানীয় জনশ্রুতি ও লোকঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁদের প্রায় সাতশ বছরের পুরোনো প্রেমকাহিনি।
স্থানীয়দের দাবি, চণ্ডীদাস-রজকিনীর স্মৃতিবিজড়িত কথিত ঘাট ও আশপাশের স্থান দীর্ঘদিন ধরে অযত্নে পড়ে রয়েছে। সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে নদীর গতিপথ, হারিয়েছে পুরোনো ঘাটের চেহারা। তাঁদের দাবি, ইতিহাস ও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব যাচাই করে স্থানটি সংরক্ষণ করা হোক এবং সেখানে গড়ে তোলা হোক দৃষ্টিনন্দন ঘাট, স্মৃতিফলক ও পর্যটনকেন্দ্র। মাগুরা জেলা শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দক্ষিণে শালিখা উপজেলার ধোপাখালী গ্রাম। স্থানীয়দের কাছে এলাকাটি চণ্ডীদাস-রজকিনী ঘাট ও ‘দুয়া’ নামে পরিচিত। তাঁদের ভাষ্য, এই স্থানকে ঘিরেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে প্রচলিত রয়েছে চণ্ডীদাস ও রজকিনীর প্রেমের কাহিনি।
জনশ্রুতি অনুযায়ী, ঘটনাটি ১৪ শতকের শেষভাগের। চণ্ডীদাস ছিলেন ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান এবং রজকিনী ছিলেন ধোপা পরিবারের মেয়ে। সামাজিক ও জাতপাতের ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও রজকিনীর প্রতি আকৃষ্ট হন চণ্ডীদাস।
প্রচলিত লোককাহিনি অনুযায়ী, দুই পরিবারের বাড়ির মাঝ দিয়ে তখন একটি নদী প্রবাহিত ছিল। রজকিনী নদীর ঘাটে কাপড় ধুতে এলে তাঁকে দেখার জন্য চণ্ডীদাস মাছ ধরার অজুহাতে নদীর অপর পাড়ে বসে থাকতেন। এভাবে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস কেটে যায়।
লোকমুখে প্রচলিত আছে, প্রায় ১২ বছর ধরে এভাবেই রজকিনীর অপেক্ষায় ছিলেন চণ্ডীদাস। একদিন রজকিনী তাঁকে প্রশ্ন করেন, ‘বড়শিতে কি মাছ ধরে? উত্তরে চণ্ডীদাস বলেন, দীর্ঘ অপেক্ষার পর এই প্রথম বড়শিতে মাছের টোকা লেগেছে। এরপর তাঁদের মধ্যে কথোপকথন শুরু হয় এবং গড়ে ওঠে প্রেমের সম্পর্ক।
তবে জাতপাত ও সামাজিক বাধার কারণে তাঁদের সম্পর্ক তৎকালীন সমাজে বিরোধিতার মুখে পড়ে বলে স্থানীয়দের দাবি। একপর্যায়ে তাঁরা এলাকা ছেড়ে-ভারতের বাঁকুড়া জেলার ছাতনা এলাকায় চলে যান-এমন কথাও প্রচলিত রয়েছে। পরে তাঁদের বৃন্দাবনে যাওয়ার কথাও লোকমুখে শোনা যায়। এরপর তাঁদের জীবনের ধারাবাহিক ও নির্ভরযোগ্য তথ্য খুব বেশি পাওয়া যায় না।
বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবি চণ্ডীদাসের পরিচয় ও জীবনী নিয়েও গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। চণ্ডীদাস নামে একাধিক কবির উল্লেখ পাওয়া যায়। ফলে ধোপাখালীর চণ্ডীদাস-রজকিনীর প্রেমকাহিনির ঐতিহাসিক সত্যতা কতটা এবং কোন অংশ লোককথা-তা নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
তবে স্থানীয় মানুষের কাছে এই কাহিনি দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ একটি লোকঐতিহ্য হিসেবে পরিচিত। তাঁদের ভাষ্য, বাপ-দাদার কাছ থেকে তাঁরা ছোটবেলা থেকেই চণ্ডীদাস-রজকিনীর গল্প শুনে আসছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, কথিত চণ্ডীদাস-রজকিনী ঘাটের আগের সেই পরিবেশ আর নেই। সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে নদীর গতিপথ। একসময়কার নদী ও ঘাটের জায়গায় এখন জলধারা ও নিচু জমি রয়েছে। স্থানীয়ভাবে ‘দুয়া’ নামে পরিচিত স্থানটিকেই চণ্ডীদাসের কথিত মাছ ধরার স্থান হিসেবে দেখানো হয়।
একই সঙ্গে জায়গাটির ঐতিহ্য ধরে রাখতে একটি পাকা ঘাট, স্মৃতিফলক, বসার স্থান, হাঁটার পথ ও পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করা হলে এটি মাগুরার অন্যতম সাংস্কৃতিক পর্যটনকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
এ বিষয়ে মাগুরার জেলা প্রশাসক মোতাকাব্বীর আহমেদ বলেন, "চণ্ডীদাস-রজকিনীর ঘটনা মাগুরার সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাঁদের স্মৃতি সংরক্ষণে তেমন কিছু নেই। আমরা বিষয়টি নিয়ে কাজ করব।"
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, চণ্ডীদাস-রজকিনীর প্রেমকাহিনি ইতিহাসের কতটা এবং লোকশ্রুতির কতটা-তা গবেষণার মাধ্যমে স্পষ্ট করা প্রয়োজন। পাশাপাশি গবেষণার ফল ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে স্থানটি সংরক্ষণ করা হলে নতুন প্রজন্ম এই লোকঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবে। তাঁদের প্রত্যাশা, হারিয়ে যাওয়ার আগেই চণ্ডীদাস-রজকিনীর স্মৃতিবিজড়িত স্থানটি সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নেবে প্রশাসন ও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর।
এসএ




Comments