চার মাস নজরদারি, এক চুরিতেই ২০০ ভরি স্বর্ণ
রাজশাহীর স্বর্ণপট্টিতে ‘ফিল্মি কায়দায়’ চুরি : আন্তঃজেলা চক্রের ৭ সদস্যসহ গ্রেপ্তার ৮, উদ্ধার স্বর্ণ-রূপা ও ২৫ লাখ টাকা
চুরির আগে চার মাস ধরে নজরদারি। ব্যবসার আড়ালে স্বর্ণপট্টি ও আশপাশের এলাকা পর্যবেক্ষণ। এরপর ভোরে দোকানের সামনে বসানো হয় বিভিন্ন পণ্যের পসরা। তৈরি করা হয় কৃত্রিম জটলা। সেই সুযোগে পাশের দোকানের তালা খুলে ভেতরে প্রবেশ। পরে দেয়াল কেটে ঢোকা হয় টার্গেট করা স্বর্ণের দোকানে। ভেঙে ফেলা হয় সিন্দুক। মুহূর্তেই লুট করা হয় বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ, রূপা ও নগদ টাকা। যেন কোনো সিনেমার দৃশ্য!
রাজশাহীর সাহেববাজার স্বর্ণপট্টির কারুশ্রী জুয়েলার্সে এমনই ‘ফিল্মি কায়দায়’ প্রায় ২০০ ভরি স্বর্ণ, ১ হাজার ২০০ ভরি রূপা ও নগদ ২০ লাখ টাকা চুরির ঘটনায় আন্তঃজেলা চোর চক্রের সাত সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে রাজশাহী মহানগর পুলিশের (আরএমপি) গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে চোরাই স্বর্ণ কেনার অভিযোগে এক স্বর্ণ ব্যবসায়ীসহ গ্রেপ্তার করা হয়েছে মোট আটজনকে। তাঁদের কাছ থেকে ২৬ ভরি স্বর্ণ, ৬২ ভরি রূপা এবং চোরাই স্বর্ণ বিক্রির ২৫ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) আরএমপির কনফারেন্স রুমে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান আরএমপির মুখপাত্র, উপ-পুলিশ কমিশনার (সিটিটিসি) (ভারপ্রাপ্ত) ও এডিসি মিডিয়া মো. গাজিউর রহমান।
পুলিশের ভাষ্য, গ্রেপ্তার চক্রটি অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে বড় ধরনের চুরি করে। বছরে মাত্র এক থেকে দুটি বড় চুরিতে অংশ নেয় তারা। প্রতিটি অপরাধের আগে তিন থেকে চার মাস ধরে টার্গেট করা এলাকা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে। এরপর নির্ধারণ করে চুরির সময়, প্রবেশের কৌশল এবং নিরাপদে পালানোর পথ।
যেভাবে চুরি হয় স্বর্ণপট্টিতে
আরএমপি সূত্রে জানা গেছে, গত ১৯ জুন ভোরে সাহেববাজার স্বর্ণপট্টির কারুশ্রী জুয়েলার্সে চুরির ঘটনা ঘটে। ওইদিন ভোরে অজ্ঞাতনামা ১০ থেকে ১২ জনের একটি দল দোকানটির সামনে এসে বিভিন্ন সামগ্রী বিক্রির দোকান বসায় এবং পর্দা দিয়ে আড়াল করে দোকান ঘিরে রাখার কৌশলে। এতে সেখানে তৈরি হয় জটলা।
একপর্যায়ে চক্রের সদস্যরা কৌশলে পাশের একটি স্বর্ণের দোকানের তালা খুলে ভেতরে প্রবেশ করে। পরে কারুশ্রী জুয়েলার্সের পশ্চিম পাশের দেয়াল কেটে দোকানের ভেতরে ঢোকে তারা। এরপর সিন্দুক ভেঙে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ ও রূপা নিয়ে পালিয়ে যায়।
এ ঘটনায় কারুশ্রী জুয়েলার্সের মালিক তুর্য সরকার বাদী হয়ে বোয়ালিয়া মডেল থানায় মামলা করেন। মামলার অভিযোগে বলা হয়, চোরেরা প্রায় ২০০ ভরি স্বর্ণ, ১ হাজার ২০০ ভরি রূপা, তিন বক্স স্বর্ণের নাকফুল এবং নগদ ২০ লাখ টাকা নিয়ে গেছে।
চার মাস ধরে 'রেকি'- ‘অপারেশন কয়েক ঘণ্টায়’
ঘটনার পর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ ফয়েজুল কবিরের নির্দেশে মামলাটি ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়। পরে ডিবি, সাইবার ইউনিট ও সিসি ক্যামেরা ইউনিট যৌথভাবে তদন্ত শুরু করে। তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে চক্রটির সদস্যদের শনাক্ত করা হয়।
তদন্তে উঠে আসে চক্রটির অভিনব কৌশলের তথ্য। পুলিশের দাবি, কারুশ্রী জুয়েলার্সে চুরির প্রায় চার মাস আগে চক্রটির সদস্যরা রাজশাহীতে আসে। তারা বিভিন্ন হোটেলে অবস্থান করে। ব্যবসার আড়ালে স্বর্ণপট্টি ও আশপাশের এলাকা ঘুরে ঘুরে পর্যবেক্ষণ করে। দোকানের অবস্থান, নিরাপত্তাব্যবস্থা, আশপাশের পরিবেশ এবং পালানোর সম্ভাব্য পথ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে তারা। পরে এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে চুরির পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়।
মোবাইল-সিমেও ছিল কৌশল
চক্রটির সদস্যরা শুধু সরেজমিন নজরদারিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। মোবাইল ফোন ও সিম ব্যবহারের ক্ষেত্রেও তারা বিশেষ কৌশল নিত বলে জানিয়েছে পুলিশ। আরএমপির দাবি, একটি মোবাইল ফোন একাধিকবার ব্যবহার করত না চক্রের সদস্যরা। ব্যবহৃত সিমগুলোও অন্য ব্যক্তিদের নামে নিবন্ধিত থাকত। এমনকি যাঁদের নামে এসব সিম নিবন্ধিত ছিল, তাঁদের অনেকেই সিম ব্যবহারের বিষয়ে জানতেন না।
অপরাধ সংঘটনের পর দ্রুত স্থান পরিবর্তন করত চক্রের সদস্যরা। কোনো একটি এলাকায় দীর্ঘদিন অবস্থান না করে তারা বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ত। এ কারণেই তাদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করতে তদন্তকারীদের প্রযুক্তিগত তথ্য ও গোয়েন্দা নজরদারির ওপর নির্ভর করতে হয়েছে।
খুলনা-ঢাকায় অভিযান, গ্রেপ্তার ৮
তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ কমিশনারের নির্দেশে আরএমপির একাধিক দল অভিযান শুরু করে। তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গত পরশু দিবাগত রাতে খুলনা থেকে বাগেরহাটের মোংলা থানার শেহলাবুনিয়া মোর্শেদ সড়ক গ্রামের ফজলুল হকের ছেলে রুস্তম আলী শেখকে (৬৪) গ্রেপ্তার করা হয়।
এ ছাড়া ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া থানার মাধবপুরা (মাইল্যারহাট) গ্রামের আ. হাকিমের ছেলে স্বপন (৬২), একই গ্রামের মানিক ফকিরের ছেলে উজ্জল (৩৭), একই থানার মাধবপুরা গ্রামের মতি ফকিরের ছেলে রিয়াজ ওরফে সুমন ওরফে সুজন ওরফে গেদু (৩৯), বাগেরহাটের শরনখোলা থানার খোন্তাকাটা (জিমতলা) গ্রামের মোসাকের ছেলে আবু তালেব (৪৫), বর্তমানে পটুয়াখালীর গলাচিপা এলাকায় বসবাসরত, একই থানার পূর্ব খোন্তাকাটা গ্রামের শেখ ফজলু শেখের ছেলে মো. কালাম শেখ (৪৮) এবং পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া থানার মাধবপুরা গ্রামের আ. হাকিমের ছেলে ইউনুসকে (৪৫) গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে চোরাই মাল কেনার সঙ্গে জড়িত স্বর্ণ ব্যবসায়ী রবিউল হাসানকেও (৪৫) ঢাকার একটি এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি চাঁদপুরের কচুয়া থানার সরকার বাড়ী বজনীখোলা গ্রামের রফিজ উদ্দিনের ছেলে।
ব্যবসায়ীর হেফাজতে স্বর্ণ-রূপা, ২৫ লাখ টাকা
পুলিশের দাবি, রবিউল হাসানের হেফাজত থেকে কারুশ্রী জুয়েলার্স থেকে চুরি হওয়া ২৬ ভরি স্বর্ণ ও ৬২ ভরি রূপা উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া চোরাই স্বর্ণ বিক্রি করে পাওয়া ২৫ লাখ টাকাও তাঁর কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়।
গ্রেপ্তারের পর অসুস্থ হয়ে পড়লে পুলিশ পাহারায় রবিউল হাসানকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
আরও বড় চক্রের সন্ধানের আশা
আরএমপি জানিয়েছে, চুরি যাওয়া বাকি মালামাল উদ্ধারের পাশাপাশি এই চক্রের সঙ্গে জড়িত অন্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের আদালতে হাজির করে প্রত্যেকের সাত দিনের রিমান্ড চাওয়া হবে।
পুলিশের ধারণা, চক্রটি শুধু রাজশাহীর কারুশ্রী জুয়েলার্স নয়, দেশের বিভিন্ন এলাকায় একই কায়দায় পরিকল্পিতভাবে বড় ধরনের চুরির সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে চক্রটির বিস্তৃত নেটওয়ার্ক ও আরও চোরাই মালামালের সন্ধান মিলতে পারে বলে আশা করছে তদন্তসংশ্লিষ্টরা। সংবাদ সম্মেলনে আরএমপি ডিবির এডিসি হাফিজুর রহমান, সাইবার ক্রাইম ইউনিটের ইন্সপেক্টর সমিত কুমার কুন্ডু এবং মামলার তদন্ত কর্মকর্তা (আইও) সাব-ইন্সপেক্টর শাহ আলীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এসএ




Comments