কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই কি সত্যি একদিন পৃথিবীর ৮৩০ কোটি মানুষকে নিশ্চিহ্ন করে দেবে? এআই খাতের একদল গবেষক ও প্রযুক্তিবিদ মনে করেন, আগামী এক দশকের মধ্যেই এ ধরনের অস্তিত্বগত বিপর্যয় ঘটতে পারে। সম্প্রতি এআই প্রতিষ্ঠান ‘অ্যানথ্রপিক’-এর সাবেক কর্মী ইভান হাবিবঙ্গার দাবি করেছেন, আগামী ১০ বছরের মধ্যে এআইয়ের কারণে মানবজাতি বিলুপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা ১০ শতাংশের বেশি। তবে ঠিক কীভাবে একটি কম্পিউটারভিত্তিক সফটওয়্যার গোটা মানবজাতিকে ধ্বংস করবে, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে তীব্র বিতর্ক ও ভিন্নমত রয়েছে।
এআই মানবজাতি নিশ্চিহ্ন করতে পারে কি না—তা নিয়ে সম্ভাব্য যেসব ঝুঁকিপূর্ণ দৃশ্যপট বা থিওরি আলোচনায় এসেছে, সেগুলোর প্রধান দিকগুলো নিম্নে তুলে ধরা হলো:
১. প্রাণঘাতী জৈব ভাইরাসের বিস্তার
এআই ফিউচারস প্রজেক্ট ও এমআইআরআই (MIRI)-এর গবেষকদের একাংশের মতে, অতিমানবীয় বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন কোনো এআই মানুষকে প্রতারিত করে কিংবা পরীক্ষাগারের গবেষকদের প্রভাবিত করে মহামারি সৃষ্টিকারী অতি-প্রাণঘাতী ভাইরাসের নকশা তৈরি বা তা ছড়িয়ে দিতে প্ররোচিত করতে পারে। তবে কার্নেগি মেলন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের মতে, এটি বাস্তবে ঘটানো প্রায় অসম্ভব। কারণ কেবল কোডিং দিয়ে ভাইরাস তৈরি হয় না; জিনগত ক্রম, সঠিক তাপমাত্রা ও পরিবেশ এবং রাসায়নিকের চরম নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন, যা কঠোর আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার নজরদারিতে থাকে।
২. রোবট বাহিনীর মাধ্যমে মানব আক্রমণ
স্বয়ংক্রিয় রোবট যদি নিজেরা কারখানা তৈরি করে আরও কোটি কোটি রোবট উৎপাদন করতে পারে, তবে তা যান্ত্রিক বাহিনী হিসেবে মানুষের ওপর হামলা চালাতে পারে। তবে বর্তমান প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা (যেমন: টেসলার অপ্টিমাস রোবটের মন্থর অগ্রগতি) বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রোবটের এ ধরনের সম্পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণ ব্যবস্থা গড়ে ওঠা নিকট ভবিষ্যতে দৃশ্যমান নয়।
৩. পারমাণবিক অস্ত্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা
অন্যতম আশঙ্কার স্থান হলো এআই পারমাণবিক অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে কি না। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও নিরাপত্তা গবেষকদের মতে, বিশ্বের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ইন্টারনেট থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন (‘এয়ার-গ্যাপড’) থাকে। ফলে বাইরে থেকে কোনো এআইয়ের পক্ষে এসব মারণাস্ত্র সরাসরি হ্যাক বা পরিচালনা করা প্রায় অসম্ভব।
৪. ‘রিকার্সিভ সেল্ফ-ইমপ্রুভমেন্ট’ বা নিজ থেকে উন্নতির সক্ষমতা
সবচেয়ে বড় ভয় হলো এআই যদি মানুষের সহায়তা ছাড়াই নিজেকে ক্রমাগত উন্নত করতে থাকে, তবে একপর্যায়ে এটি মানুষের বোধগম্যতার বাইরে চলে যাবে। এআইয়ের নিজস্ব লক্ষ্য অর্জনে যদি মানুষের চেয়ে অধিক প্রাকৃতিক সম্পদ বা কম্পিউটিং পাওয়ার প্রয়োজন হয়, তবে সে মানব অস্তিত্বের পরোয়া না করেই পরিবেশকে নিজের মতো করে বদলে ফেলতে পারে। সম্প্রতি ওপেনএআই-এর কিছু মডেলে এ ধরনের ‘মিসঅ্যালাইনমেন্ট’ বা অনিয়ন্ত্রিত আচরণের কিছু ঘটনা ধরাও পড়েছে।
বাস্তবতার নিরিখে মূল মূল্যায়ন
অনেক এআই বিশেষজ্ঞের মতে, 'এআই মানবজাতি নিশ্চিহ্ন করবে'—এমন দাবিগুলোর সপক্ষে এখনো পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক ও পরীক্ষাযোগ্য প্রমাণের অভাব রয়েছে। এআই নাও ইনস্টিটিউটের প্রধান বিজ্ঞানী হেইডি খলাফ বলেন, বৈজ্ঞানিক যুক্তির ক্ষেত্রে দাবি প্রমাণের সুযোগ থাকা জরুরি; পরীক্ষা ছাড়া এমন আশঙ্কা প্রকাশের বিষয়টি অনেকটা রূপকথা বা অন্ধ বিশ্বাসের রূপ নেয়।
পরিশেষে, এআই মানবজাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দেবে কি না—তার সুনির্দিষ্ট উত্তর এখনই দেওয়া সম্ভব নয়। প্রযুক্তিবিদদের একাংশ যখন মানব বিলুপ্তির পথগুলো নিয়ে সতর্ক করছেন, অন্য অংশ বিষয়টিকে কেবলি কল্পবিজ্ঞান ও অনুমাননির্ভর যুক্তি হিসেবে দেখছেন। তবে প্রযুক্তিকে মানুষের নিয়ন্ত্রণাধীন ও নিরাপদ রাখতে বাস্তবসম্মত নীতি, আইনি কাঠামো ও আন্তর্জাতিক তদারকি জোরদার করার বিকল্প নেই।
ডিআর




Comments