Image description

সকাল থেকে রাত—ব্যস্ততায় ছুটে চলে রাজশাহী। যানবাহনের শব্দ, মানুষের কর্মব্যস্ততা, নগরজীবনের নানা আয়োজন; সব মিলিয়ে শহরের চেনা চিত্র প্রায় একই। কিন্তু শরৎ এলেই সেই ব্যস্ত নগরের কোথাও কোথাও যেন বদলে যায় দৃশ্যপট। নীল আকাশের নিচে বাতাসে দুলতে থাকে শুভ্র কাশফুল। সবুজের বুক চিরে যাওয়া পথের দুই পাশে সাদা ফুলের সারি হয়ে ওঠে প্রকৃতির নিজস্ব সাজ।

কাশের সাদা ঢেউয়ের এমন মায়ায় কয়েক মুহূর্তের জন্য থেমে যাচ্ছে নগরজীবনের ব্যস্ততা। কেউ পরিবার নিয়ে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে, আবার কেউ নিছক প্রকৃতির টানে ছুটছেন কাশবনে। ছবি তুলছেন, গল্প করছেন, হাঁটছেন—শরতের এই সাময়িক সৌন্দর্যে খুঁজছেন একটু প্রশান্তি।

সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) রাজশাহীর বাইপাস সড়ক, পদ্মার চরাঞ্চল, বারনই আবাসিক এলাকা, বড়বনগ্রাম, জামালপুর ও বিনোদপুরের বেতার মাঠসহ নগরের বিভিন্ন খোলা জায়গা ঘুরে এমন দৃশ্য দেখা গেছে।

ব্যস্ত শহরের মাঝে সাদা-সবুজের ক্যানভাস

সরেজমিনে দেখা যায়, কোথাও সড়কের পাশে, কোথাও মাঠের কিনারায়, আবার কোথাও উন্মুক্ত জমির প্রান্তজুড়ে মাথা উঁচু করে ফুটে আছে কাশফুল। পিচঢালা সড়কের এক পাশে নগরের ব্যস্ততা, অন্য পাশে সাদা কাশের দোলা। দূর থেকে মনে হয়, প্রকৃতি যেন ব্যস্ত শহরের মাঝেই এঁকে দিয়েছে সাদা-সবুজের বিশাল এক ক্যানভাস।

বিকেল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে মানুষের আনাগোনা। তরুণ-তরুণী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, পরিবার নিয়ে আসা মানুষ কিংবা একান্তে প্রকৃতির সান্নিধ্য খুঁজতে বের হওয়া নগরবাসী—সবাইকে দেখা যায় কাশফুলের পাশে সময় কাটাতে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ছে এসব স্থানের ছবি ও ভিডিও। ফলে রাজশাহীর বাইরের মানুষের কাছেও শরতের এই স্বাভাবিক সৌন্দর্য হয়ে উঠছে আকর্ষণের বিষয়।

শুধু বাইপাস নয়, নগরের ভেতরেও কাশের মায়া

শরতের কাশফুল দেখতে রাজশাহীবাসীকে সবসময় নগরের বাইরে যেতে হচ্ছে না। বড়বনগ্রাম, জামালপুর ও বিনোদপুরের বেতার মাঠেও ফুটেছে কাশফুল। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের এসব এলাকায় শিক্ষার্থী ও তরুণদের যাতায়াতও তুলনামূলক সহজ।

বড়বনগ্রামের পরিবেশ কিছুটা ভিন্ন। নগরের কাছেই খোলা মাঠ, সবুজ আর গ্রামীণ আবহ—সব মিলিয়ে সেখানে শরতের সৌন্দর্য যেন আরও স্বাভাবিক ও প্রাণবন্ত।

পদ্মার চরাঞ্চলও রাজশাহীর শরৎ-সৌন্দর্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে চলতি মৌসুমে নদীতে পানি বেশি থাকায় আগের তুলনায় কিছু চরে কাশফুলের বিস্তার কমেছে। তারপরও পদ্মাপাড়ের বিভিন্ন এলাকায় কাশের শুভ্রতা দেখতে মানুষের আগ্রহ কমেনি।

কাশের আড়ালে খোঁজা হচ্ছে একটু ‘শান্তি’

রাজশাহীর নগরজীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য তার উন্মুক্ত পরিবেশ। শহরের ভেতর ও আশপাশে পদ্মার পাড়, পার্ক, লেক, খোলা মাঠ ও সবুজ এলাকা নাগরিকদের ব্যস্ততা থেকে কিছুটা স্বস্তি দেয়।

সরকারি পর্যটন তথ্যেও বুলনপুর থেকে বড়কুঠি ও পঞ্চবটি হয়ে সাতবাড়িয়া পর্যন্ত প্রায় ১২ কিলোমিটার পদ্মাপাড়কে নগরবাসীর বিনোদনের গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঈদসহ বিভিন্ন ছুটির দিনে এসব এলাকায় মানুষের ভিড়ও দেখা যায়। ফলে কাশফুলের মৌসুমি সৌন্দর্যকে বিচ্ছিন্ন কোনো প্রাকৃতিক দৃশ্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এটি রাজশাহীর উন্মুক্ত, সবুজ ও তুলনামূলক শান্ত নগর-পরিবেশেরই একটি অংশ।

পরীক্ষা-ক্লাসের ব্যস্ততায় কাশফুল এক টুকরো শান্তি

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু বকর অনিক বন্ধুদের সঙ্গে কাশফুল দেখতে এসেছেন। তিনি বলেন, “পরীক্ষা ও ক্লাসের ব্যস্ততার মধ্যে বাইপাসের কাশফুল যেন এক টুকরো শান্তির জায়গা। বাতাসে কাশফুলের ঢেউ দেখলে স্বাভাবিকভাবেই মন ভালো হয়ে যায়।”

পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী সানজিদা আক্তার বলেন, “শহরে খোলা জায়গা দিন দিন কমে যাচ্ছে। শরতের বিকেলে সন্তানদের নিয়ে কাশফুলের মধ্যে হাঁটাহাঁটি করার আনন্দ আলাদা।”

পদ্মাপাড়ে ঘুরতে আসা দর্শনার্থীদের অনেকের ভাষ্য, বড় কোনো বিনোদনকেন্দ্রে না গিয়েও রাজশাহীতে পরিবার নিয়ে কয়েক ঘণ্টা ভালো সময় কাটানো যায়। নদী, বাতাস, খোলা জায়গা আর কাশফুল—সব মিলিয়ে তৈরি হয় অন্যরকম পরিবেশ।

সবুজ ও অবকাশের নগরী গড়ার পরিকল্পনা

রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন মানবকণ্ঠকে বলেন, নগরীর উন্মুক্ত স্থান, সবুজায়ন ও বিনোদন ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে রাজশাহীকে পরিচ্ছন্ন, আধুনিক, সবুজ, স্বাস্থ্যকর, নিরাপদ, বাসযোগ্য ও শান্তির নগরী হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, নগর সৌন্দর্যবর্ধন, সবুজায়ন, পার্ক ও বিনোদনকেন্দ্র উন্নয়নে নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। নগর পরিকল্পনার সঙ্গে প্রকৃতির সমন্বয় করা গেলে খোলা জায়গা ও সবুজ অঞ্চলগুলো শুধু সৌন্দর্যের অংশ থাকবে না; নাগরিকদের অবকাশ, হাঁটাচলা, পরিবার নিয়ে সময় কাটানো এবং মানসিক প্রশান্তিরও স্থায়ী জায়গা হয়ে উঠবে।

রাসিকের পরিকল্পনায় টি-বাঁধসংলগ্ন সড়কে গার্ডেন লাইট স্থাপন, গুলজারবাগ লেক, ভদ্রা লেক ও সোনাদিঘিতে সৌন্দর্যবর্ধন এবং কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানার উন্নয়নের উদ্যোগ রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মধ্যে টি-বাঁধের দক্ষিণের পদ্মার চরে পাখির অভয়ারণ্য এবং সার্কিট হাউস সড়কের দক্ষিণে পদ্মার চরে বনায়নের পরিকল্পনাও রয়েছে।

সম্প্রতি রাসিক প্রশাসক পদ্মার ‘মিডল চর’ পরিদর্শন করেছেন। রাসিকের তথ্য অনুযায়ী, এলাকাটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য আকর্ষণীয় এবং ভবিষ্যৎ নগর বিনোদন ও পর্যটন ভাবনায় পদ্মাপাড়ের গুরুত্ব রয়েছে।

সৌন্দর্য উপভোগে দায়িত্বও আছে

কাশফুলের এই সাময়িক সৌন্দর্য ধরে রাখতে দর্শনার্থীদের সচেতন হওয়ারও তাগিদ রয়েছে। কাশফুল ছিঁড়ে ফেলা, কাশবনের ভেতর অযথা প্রবেশ, প্লাস্টিক ও খাবারের প্যাকেট ফেলে রাখা কিংবা অতিরিক্ত ভিড় প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্ষতি করতে পারে।

বিশেষ করে পদ্মাপাড়ের মতো নদীসংলগ্ন এলাকায় সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। প্রাকৃতিক স্থানগুলোকে পরিকল্পিত বিনোদনকেন্দ্রে রূপ দিতে হলে পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা, বসার ব্যবস্থা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো নাগরিক সুবিধাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

কাশের শুভ্রতা মনে করিয়ে দেয় রাজশাহীর আসল সৌন্দর্য

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক রেজিস্ট্রার ও অধ্যাপক ড. ইফতিখারুল আলম মাসউদ মানবকণ্ঠকে বলেন, “শরতের কাশফুল বেশিদিন থাকে না। ক্ষণস্থায়ী এই শুভ্রতা ব্যস্ত নগরজীবনে কিছুটা প্রশান্তি এনে দিয়েছে।”

তিনি বলেন, “বাইপাস থেকে বড়বনগ্রাম, জামালপুর থেকে বিনোদপুর, আর পদ্মার পাড় থেকে নগরের বিভিন্ন উন্মুক্ত প্রান্তর—সব মিলিয়ে শরৎ যেন নতুন করে মনে করিয়ে দিচ্ছে, রাজশাহীর সৌন্দর্য শুধু পরিচ্ছন্ন সড়ক কিংবা স্থাপনায় সীমাবদ্ধ নয়। এ শহরের বড় শক্তি তার খোলা আকাশ, সবুজ, নদী ও শান্ত পরিবেশ।”

তিনি আরও বলেন, “কাশফুলের সাদা ঢেউ শুধু শরতের আগমনী বার্তা নয়; এটি শান্তির নগরী রাজশাহীর প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের গভীর সম্পর্কেরও এক নীরব প্রতিচ্ছবি।”

বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রধান ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা (পশ্চিম) উপসচিব নাদিম সারওয়ার মানবকণ্ঠকে বলেন, শরতের কাশফুলসহ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের স্থানগুলো রক্ষায় দর্শনার্থীদের সচেতন হওয়া জরুরি। সৌন্দর্য নষ্ট হয়—এমন কোনো কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার পাশাপাশি যেখানে-সেখানে ময়লা-আবর্জনা না ফেলে পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার বিষয়ে সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে।

তিনি বলেন, এসব স্থানে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বেশি থাকায় অভিভাবকদেরও সচেতন ও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। সন্তানরা যেন মাদকাসক্তি কিংবা নৈতিক ও চারিত্রিক অবক্ষয়ের মতো ঝুঁকিতে না জড়ায়, সেদিকে অভিভাবকদের নিয়মিত নজর রাখা দরকার।

নাদিম সারওয়ার আরও বলেন, দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। চুরি, ছিনতাই ও নানা ধরনের হয়রানি থেকে মানুষকে নিরাপদ রাখতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন। একই সঙ্গে কিশোর গ্যাং বা পথশিশুদের মাধ্যমে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা যাতে না ঘটে, সে বিষয়েও প্রশাসনের প্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা উচিত।

শহর যখন প্রতিদিনের ব্যস্ততায় ছুটছে, তখন রাস্তার ধারে দুলতে থাকা একগুচ্ছ কাশফুল যেন সেই ছুটে চলা মানুষকেই থামিয়ে দিয়ে বলছে—কিছুটা সময় প্রকৃতির কাছেও থাকা দরকার। শরতের শুভ্রতায় তাই নতুন করে ধরা দিচ্ছে রাজশাহীর আরেক রূপ—যেখানে নগরের ব্যস্ততার পাশেই রয়েছে খোলা আকাশ, সবুজের বিস্তার, পদ্মার বাতাস আর এক টুকরো শান্তি।

কাশফুলের সাদা ঢেউ তাই শুধু শরতের আগমনী বার্তা নয়—এটি যেন শান্তির নগরী রাজশাহীর প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের গভীর সম্পর্কেরও এক নীরব প্রতিচ্ছবি।

এসএ