ফুটবল মাঠে অসংখ্য রেকর্ড, ট্রফি ও সাফল্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে লিওনেল মেসির নাম। তবে বার্সেলোনায় তাঁর অবদানের এক উজ্জ্বল ও চিরস্থায়ী অধ্যায় রচিত হয়েছে সবুজ গ্যালারির বাইরে—শিশুদের ক্যানসার চিকিৎসার পরিধি ও সুযোগ বৃদ্ধির অনন্য মানবিক উদ্যোগে।
স্পেনের বার্সেলোনায় ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ বিশেষায়িত ‘এসজেডি পেডিয়াট্রিক ক্যানসার সেন্টার’ গড়ে তুলতে অসামান্য ভূমিকা রেখেছে ফুটবল জাদুকরের দাতব্য সংস্থা ‘লিও মেসি ফাউন্ডেশন’। ২০২২ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হওয়া এই সর্বাধুনিক ক্যানসার কেন্দ্রে বর্তমানে প্রতি বছর নতুন করে ক্যানসারে আক্রান্ত সর্বোচ্চ ৪০০ শিশুকে বিশ্বমানের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার পূর্ণ সক্ষমতা তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক ক্রীড়া মাধ্যম বেইন স্পোর্টসের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, হসপিটাল সান্ত জোয়ান দে দেউয়ের উদ্যোগে এই ক্যানসার সেন্টার প্রতিষ্ঠার মহাপরিকল্পনা শুরু হয়। এর নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার আগেই গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে যুক্ত হয় লিও মেসি ফাউন্ডেশন। কেন্দ্রটির আধুনিক স্থাপত্য নকশার অর্থায়ন থেকে শুরু করে বড় আকারের তহবিল সংগ্রহ অভিযান জোরদার করতে মূল ভূমিকা পালন করে তাঁর সংস্থাটি। পরবর্তীতে প্রকল্পটির ১০টি প্রতিষ্ঠাতা দাতার অন্যতম হয়ে ওঠে মেসির ফাউন্ডেশন।
২০১৮ সালের অক্টোবরে সেন্টারটির নির্মাণ নিশ্চিত করতে নির্ধারিত ৩ কোটি ইউরোর বিশাল লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে ২৬ লাখ ইউরোর ঘাটতি দেখা দিয়েছিল। সে সময় লিও মেসি ফাউন্ডেশন ও স্ট্যাভরোস নিয়ারকোস ফাউন্ডেশন যৌথভাবে ওই প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান নিশ্চিত করে। অবশেষে ২০২২ সালে যাত্রা শুরু করে বিশেষায়িত এই চিকিৎসাকেন্দ্রটি, যা একই ছাদের নিচে শিশু রোগীদের চিকিৎসা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও তাদের স্বজনদের সার্বিক সহায়তার এক অনন্য ঠিকানা।
২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘লিও মেসি ফাউন্ডেশন’ মূলত সুবিধাবঞ্চিত শিশু ও কিশোরদের স্বাস্থ্য এবং শিক্ষার মানোন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। এ ছাড়া ২০১০ সাল থেকে জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফের (UNICEF) শুভেচ্ছাদূত হিসেবে বিশ্বজুড়ে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন মেসি। ২০১২ সালে কলম্বিয়ায় ‘স্পোর্টস ফর পিস’ প্রকল্পের অর্থায়ন থেকে শুরু করে ২০১৭ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ায় ২০টি প্রিফ্যাব্রিকেটেড শ্রেণিকক্ষ নির্মাণে সহায়তা করে ১,৬০০-এর বেশি শিশুর পড়াশোনার সুযোগ করে দিয়েছিল তাঁর সংস্থা।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাব ইন্টার মায়ামিতে যোগ দেওয়ার পরও মেসির এই দূরদর্শী দাতব্য কাজ থেমে নেই। ২০২৫ সালে ইন্টার মায়ামি সিএফ ফাউন্ডেশন ও ইউনিসেফের যৌথ উদ্যোগে আর্জেন্টিনা, এল সালভাদর, হাইতি, হন্ডুরাস ও মেক্সিকোর সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার প্রসারে ৩ বছর মেয়াদি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এই তহবিলের জন্য ২০০৯ সালের চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে করা তাঁর অবিস্মরণীয় গোলটিকে কেন্দ্র করে শিল্পী রেফিক আনাদোলের সঙ্গে ‘আ গোল ইন লাইফ’ শীর্ষক ডিজিটাল আর্ট তৈরি করেন তিনি, যা ক্রিস্টিসের নিলামে ১৮ লাখ ৭০ হাজার ডলারে বিক্রি হয়।
ফুটবল ও ব্যবসার গণ্ডি পেরিয়ে বার্সেলোনার শিশুদের এই ক্যানসার চিকিৎসাকেন্দ্রটি মেসির এক কালজয়ী মানবিক ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছে। এককালীন অর্থ সহায়তার বাইরেও স্থাপত্য পরিকল্পনা থেকে শুরু করে হাসপাতাল চালু হওয়া পর্যন্ত দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় যুক্ত থেকে তিনি প্রমাণ করেছেন—মাঠের পারফরম্যান্সের মতোই মানবতার দরবারেও তিনি এক অনবদ্য কাণ্ডারি।
ডিআর




Comments