Image description

কেরানীগঞ্জের শাক্তা ইউনিয়নে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে জমি দখল, প্রতিপক্ষকে মামলা দিয়ে হয়রানি ও ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ উঠেছে সজীব ব্যাপারীর বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ক্ষমতাসীন দলের একাধিক নেতা, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে এলাকায় নিজের প্রভাববলয় তৈরি করেন তিনি। এখন রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে সেই প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সজীব ব্যাপারী কেরানীগঞ্জ মডেল থানাধীন শাক্তা ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। স্থানীয়দের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাজনৈতিক যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে এলাকায় জমি দখল, বিরোধপূর্ণ সম্পত্তি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া এবং প্রতিপক্ষকে মামলা দিয়ে চাপে রাখার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। শ্বশুরের রাজনৈতিক যোগাযোগের প্রভাব সজীব ব্যাপারীর প্রভাব বিস্তারের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলেও অভিযোগ স্থানীয়দের।

অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সঙ্গে নজরুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। সেই রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়েই সজীব এলাকায় নিজের অবস্থান শক্ত করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে সখ্য থাকায় সজীবের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও অনেকেই তখন প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস করতেন না। জমি নিয়ে বিরোধ কিংবা স্থানীয় কোনো বিরোধে তার পক্ষে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।

শ্বশুর নজরুলের বিরুদ্ধেও মামলা

সজীবের শ্বশুর নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধেও রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় মামলার তথ্য রয়েছে। ২০১৫ সালের ২০ এপ্রিল রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলা, ভাঙচুর ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে ২০২৪ সালের ২২ আগস্ট তেজগাঁও থানায় মামলা হয়। ওই মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১১৩ জনকে আসামি করা হয়। মামলার আসামিদের মধ্যে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের নামও রয়েছে।

ওই সময় খালেদা জিয়া ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থী তাবিথ আউয়ালের পক্ষে প্রচারণায় ছিলেন। গাড়িবহরে হামলার ঘটনায় বেশ কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর ও কয়েকজন আহত হওয়ার তথ্য তখন সংবাদমাধ্যমে আসে।

এবার মাদক মামলার এজাহারেও সজীব

সজীব ব্যাপারীর বিরুদ্ধে অভিযোগের তালিকায় নতুন করে সামনে এসেছে আরেকটি পুলিশি নথি। তাজহাট থানা, আরপিএমপি, রংপুরের একটি এজাহারে ‘মো. সজিব (৩৬)’ নামে এক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। এজাহারে তার পিতার নাম মৃত ইবরাহিম, মাতার নাম ছাবেদা বেগম এবং ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে—সাতা, থানা কেরানীগঞ্জ, জেলা ঢাকা।

পুলিশের এজাহার অনুযায়ী, ২৫ মার্চ ২০২৬ তারিখের একটি সাধারণ ডায়েরির সূত্র ধরে ২৬ মার্চ রাতে তাজহাট থানার পুলিশ রংপুরের দর্শনা মোড় এলাকার রংপুর ফিলিং স্টেশনের সামনে অভিযান চালায়।

পুলিশের দাবি, সেখানে একটি NOAH HYBRID মাইক্রোবাসে কয়েকজন ব্যক্তি বিদেশি মদ নিয়ে অবস্থান করছিলেন। পরে গাড়িটিতে তল্লাশি চালিয়ে দুটি ROYAL STAG ব্র্যান্ডের বোতল উদ্ধার করা হয়। প্রতিটি বোতলে ৩৭৫ মিলিলিটার করে মোট ৭৫০ মিলিলিটার বিদেশি মদ ছিল বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

পুলিশের নথিতে উদ্ধার হওয়া মদের আনুমানিক মূল্য ৮ হাজার টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ঢাকা মেট্রো-চ-১৪-৩৭৬৮ নম্বরের একটি অফ-হোয়াইট রঙের NOAH HYBRID মাইক্রোবাস জব্দের কথাও উল্লেখ রয়েছে।

এজাহারে আরও বলা হয়েছে, আটক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে তারা ওই গাড়িতে বিদেশি মদ পরিবহন ও নিজেদের হেফাজতে রাখার কথা স্বীকার করেছেন—এমন দাবি করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর ৩৬(১) সারণির ২৪(ক)/৩৮ ধারায় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এজাহারে থাকা ‘মো. সজিব’ এবং কেরানীগঞ্জের আলোচিত সজীব ব্যাপারী একই ব্যক্তি কি না, তা জাতীয় পরিচয়পত্র, মামলার নথি বা সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী কর্মকর্তার বক্তব্য দিয়ে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

একের পর এক অভিযোগ, বদলায় শুধু রাজনৈতিক ছায়া?

স্থানীয়দের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার মাধ্যমে প্রভাবশালী হয়ে ওঠা সজীব এখন রাজনৈতিক বাস্তবতা পরিবর্তনের পর বিএনপির ছত্রছায়ায় থাকার চেষ্টা করছেন।

অভিযোগ রয়েছে, যেসব জমি দখলের মাধ্যমে তিনি সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে স্থানীয়দের দাবি, সেসব জমি উদ্ধারে ভুক্তভোগীরা এগিয়ে গেলে উল্টো তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হচ্ছে। এমনকি এসব ঘটনায় পুলিশের একটি অংশের সহযোগিতা পাওয়ার অভিযোগও করেছেন কেউ কেউ।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার বিভিন্ন মন্ত্রী-এমপির সঙ্গে সজীব ব্যাপারীর ছবি ছড়িয়ে থাকার দাবি করেছেন স্থানীয়রা। তাদের অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিচয় ও ক্ষমতাবানদের সঙ্গে যোগাযোগকে তিনি দীর্ঘদিন ধরে ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, ক্ষমতা বদলেছে, রাজনৈতিক ছায়া বদলেছে—কিন্তু প্রভাব বিস্তারের কৌশল বদলায়নি। জমি নিয়ে বিরোধ থেকে মামলা, প্রতিপক্ষকে চাপে রাখা থেকে রাজনৈতিক পরিচয়ের ব্যবহার—সব মিলিয়ে সজীব ব্যাপারীর বিরুদ্ধে অভিযোগের পরিধি দীর্ঘ হচ্ছে।

তথ্য বলছে, সজীব ব্যাপারী এখন বিএনপির ছত্রছায়ায় আশ্রয় নিয়েছেন। নিজেকে বিএনপির আড়ালে রাখার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। যাদের জমি দখল করে কোটি টাকার মালিক হয়েছেন সজীব—এমন অভিযোগ রয়েছে স্থানীয়দের—সেই জমি উদ্ধারে গেলে উল্টো তাদের বিরুদ্ধে মামলা করছেন তিনি। অভিযোগ রয়েছে, এতে পুলিশের একটি মহলও সহযোগিতা করছে।

তবে সজীব ব্যাপারীর বিরুদ্ধে আনা এসব অভিযোগের বিষয়ে তার ব্যক্তিগত ফোন নম্বরে যোগাযোগ করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি।

এসএ