সরকারি সার্ভেয়ার দিয়ে উভয় পক্ষের উপস্থিতিতে জমি মাপজোখ করে সীমানা নির্ধারণের পর বাড়ি নির্মাণ শুরু করেছিলেন রাজিয়া সুলতানা শেলী (৪৭)। নির্মাণকাজ প্রায় শেষ হওয়ার পর খড়খড়ি উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. রমজান আলী ও সহকারী শিক্ষক এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) রাজশাহী মহানগরের আহ্বায়ক মো. মোবাশ্বের আলী লাল্টুর বিরুদ্ধে তার নির্মাণাধীন বাড়ির বাথরুমের ইটের দেয়াল ভেঙে দেওয়ার অভিযোগ করেছেন তিনি। এ ঘটনায় মতিহার থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) ও এজাহার দিয়েছেন বলেও দাবি করেছেন রাজিয়া।
তার অভিযোগ, সরকারি সার্ভেয়ারের মাপজোখ ও সীমানা নির্ধারণের পরও কোনো লিখিত নোটিশ না দিয়ে তার স্থাপনা ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় তিনি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলেও দাবি করেন। তবে এনসিপি নেতা মোবাশ্বের আলী লাল্টুর দাবি, স্থাপনাটি স্কুলের জায়গায় করা হয়েছিল এবং প্রধান শিক্ষকের অনুমতি নিয়েই জায়গাটি পরিষ্কার করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) বিকেল ৩টায় রাজশাহী নগরীর নানকিং চাইনিজ রেস্টুরেন্টে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন রাজিয়া সুলতানা। তিনি নগরীর মতিহার থানার ললিতাহার এলাকার বাসিন্দা।
সরকারি সার্ভেয়ারে সীমানা নির্ধারণ
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে রাজিয়া বলেন, খড়খড়ি বাইপাস উচ্চবিদ্যালয়ের পাশে তিনি একটি বাড়ি নির্মাণ করছেন। নির্মাণকাজ শুরু করলে স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. রমজান আলী আপত্তি তুলে পবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। পরে তিনিও উপজেলা প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করেন।
রাজিয়ার ভাষ্য, উভয় পক্ষের আবেদনের পর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সরকারি সার্ভেয়ার ঘটনাস্থলে গিয়ে জমি মাপজোখ করেন। এ সময় উভয় পক্ষ ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। মাপজোখ শেষে সীমানা নির্ধারণ করে দেওয়া হয় এবং সংশ্লিষ্টরা তা মেনে নেন। এ মাপজোখের সার্ভেয়ারের স্বাক্ষর করা নকশাও তার কাছে রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
এরপর তিনি পুনরায় বাড়ি নির্মাণ শুরু করেন। গাঁথুনির কাজ শেষ হওয়ার পর বাথরুম নির্মাণের কাজ চলছিল। কিন্তু গত ৪ অক্টোবর বেলা আনুমানিক ১১টার দিকে প্রধান শিক্ষক মো. রমজান আলী ও সহকারী শিক্ষক মোবাশ্বের আলী লাল্টু সেখানে গিয়ে দেয়াল ভেঙে দেন বলে অভিযোগ করেন রাজিয়া।
তিনি বলেন, ওই সময় প্রধান শিক্ষক তার মোবাইল ফোনে তাকে কল করে স্কুলের পাঁচ ফুট জায়গা রয়েছে বলে দাবি করেন। তখন তিনি ২৩ মে সরকারি সার্ভেয়ারের মাধ্যমে উভয় পক্ষের উপস্থিতিতে মাপজোখ করে সীমানা নির্ধারণের বিষয়টি জানান। এরপরও কোনো লিখিত নোটিশ না দিয়ে দেয়াল ভেঙে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ তার।
রাজিয়া বলেন, ‘স্কুলের জায়গা যদি সেখানে থেকে থাকে, তাহলে আমাকে নোটিশ করলেই আমি বিষয়টি মেনে নিতাম। প্রয়োজন হলে আবার আমিন এনে মাপজোখ করা যেত। স্কুলের জায়গা প্রমাণিত হলে আমি নিজেই দেয়াল সরিয়ে নিতাম। কিন্তু আমাকে না জানিয়ে দেয়াল ভেঙে দেওয়া হলো।’
‘আমি অসহায়, নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি’
সংবাদ সম্মেলনে রাজিয়া আরও বলেন, ঘটনার পর তিনি স্কুলের সভাপতিকে বিষয়টি জানিয়েছেন। পাশাপাশি মতিহার থানায় পৃথক জিডি ও এজাহার করেছেন। পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে রাজিয়া অভিযোগ করেন, তাকে সরাসরি হুমকি দেওয়া হয়েছে। দেয়াল ভাঙার সময়ের ভিডিও ফুটেজ তার কাছে রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘আমি এখন আমার জীবনের নিরাপত্তা পাচ্ছি না। আমি অসহায় অবস্থায় আপনাদের সামনে এসেছি। সরকারি সার্ভেয়ার দিয়ে জমি মাপজোখের পর সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এরপরও আমার নির্মাণাধীন বাড়ির দেয়াল ভেঙে দেওয়া হয়েছে। আমি এর সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার চাই।’
তিনি আরও অভিযোগ করেন, এনসিপি নেতা মোবাশ্বের আলী তার রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব ব্যবহার করে তাকে হয়রানি করছেন।
প্রক্সি শিক্ষক রাখার অভিযোগ
সংবাদ সম্মেলনে রাজিয়া মোবাশ্বের আলী লাল্টুর বিরুদ্ধে খড়খড়ি উচ্চবিদ্যালয়ে নিয়মিত ক্লাস না নেওয়া এবং তার পরিবর্তে অন্য একজনকে দিয়ে ক্লাস করানোরও অভিযোগ করেন।
তার দাবি, দীর্ঘদিন ধরে ওই শিক্ষক নিয়মিত ক্লাস না নিয়েও বেতন-ভাতা তুলে নিচ্ছেন। তার পরিবর্তে একজনকে ‘প্রক্সি শিক্ষক’ হিসেবে রাখা হয়েছে। এ বিষয়টি তদন্ত করে দেখার আহ্বান জানান তিনি।
তবে মোবাশ্বের আলী লাল্টু এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘স্কুলে নিয়মিত ক্লাস না নেওয়ার অভিযোগ সত্য নয়।’
পুরোনো বিরোধের জেরেও হয়রানির অভিযোগ
রাজিয়া আরও জানান, তার প্রতিষ্ঠান নবদিগন্ত মহিলা উন্নয়ন সংস্থায় মো. আবু তালেব নামে এক ব্যক্তি খড়খড়ি উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. রমজান আলীর বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ করেছিলেন। ওই অভিযোগে তার ছেলের স্ত্রী হাসনা হেনাকে স্কুলে আয়া পদে চাকরি দেওয়ার কথা বলে ৯ লাখ ৩০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছিল বলে দাবি করেন রাজিয়া।
তার ভাষ্য, ওই অভিযোগের পর তার প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে আইনজীবী সাইফুর রহমান খান প্রধান শিক্ষককে একটি লিগ্যাল নোটিশ পাঠান। এরপর থেকেই প্রধান শিক্ষক তার ক্ষতি করার চেষ্টা করছেন বলে তিনি মনে করছেন।
তবে অভিযোগটির সত্যতা ও এর সঙ্গে বর্তমান জমি বিরোধের সম্পর্ক স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
‘স্কুলের জায়গায় নির্মাণ করা হয়েছিল’
অভিযোগের বিষয়ে মোবাশ্বের আলী লাল্টু বলেন, ‘ওটা স্কুলের জায়গার ওপর করা হয়েছিল। স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি আব্দুর রাজ্জাকের পরামর্শে প্রধান শিক্ষক, শিক্ষক ও এলাকাবাসীকে নিয়ে সেখানে যাওয়া হয়।’
তিনি দাবি করেন, ওই নারীকে ফোন করে স্কুলের জায়গায় নির্মাণের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি স্থাপনাটি অস্থায়ী এবং ওজুখানার জন্য করা হয়েছে বলে জানান। তখন তাকে অন্য জায়গায় ওজুখানা করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
মোবাশ্বের আলী বলেন, ‘তখন তিনি বলে থাকেন, জায়গাটি যদি স্কুলের হয়, তাহলে আপনারা ভেঙে নিতে পারেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রধান শিক্ষকের অনুমতি নিয়েই স্কুলের পিয়ন দিয়ে জায়গাটি পরিষ্কার করা হয়েছে। এটি আমার ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, স্কুলের জায়গা।’
প্রক্সি শিক্ষক রাখার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটা সত্য নয়।’
খড়খড়ি উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. রমজান আলী বলেন, ‘টয়লেটটি স্কুলের জায়গার মধ্যে রয়েছে।’ প্রক্সি শিক্ষক নিয়োগের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘স্কুলে আসেন, সাক্ষাতে এ বিষয়ে আলাপ করব।’
পুলিশের বক্তব্য
মতিহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আরজুনকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ না করায় এ বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) মুখপাত্র ও উপ-পুলিশ কমিশনার মো. গাজিউর রহমান বলেন, সাধারণ ডায়েরির বিষয়টি আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে পর্যালোচনা করে আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সংবাদ সম্মেলনে রাজিয়া জমি মাপজোখের নোটিশ, সার্ভেয়ারের মাপজোখের নকশা এবং বাথরুমের ইটের দেয়াল ভাঙার ছবি সাংবাদিকদের সামনে উপস্থাপন করেন। তিনি বিষয়টি তদন্ত করে সুষ্ঠু ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পুলিশ প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রতি আহ্বান জানান।




Comments