Image description

ভারতে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় পুনর্নিরীক্ষণ (এসআইআর) কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ছে। নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া ও ভোটাধিকার ক্ষুণ্ন করার অভিযোগ তুলে রাজপথে নেমেছেন বিরোধী দলের নেতাকর্মী, শিক্ষার্থী, তরুণ আন্দোলনকর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন অভিনেতা প্রকাশ রাজ ও ইউটিউবার ধ্রুব রাঠীর মতো পরিচিত ব্যক্তিরাও।

শনিবার (১০ অক্টোবর) দিল্লিতে বিক্ষোভ ঘিরে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা ও বিরোধী নেতাসহ বহু আন্দোলনকারীকে আটকের ঘটনায় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল এবং কেরালার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নসহ বিরোধী নেতাদের আটক করা হয়।

ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্ক, রাজপথের বিক্ষোভ এবং বিরোধী দলগুলোর তৎপরতা কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে। তবে এসব ঘটনার ভিত্তিতে নরেন্দ্র মোদি সরকারের পতন আসন্ন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ এখনো নেই।

কেন উত্তাল ভারতের রাজনীতি?

ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় পুনর্নিরীক্ষণ বা এসআইআর কার্যক্রমের উদ্দেশ্য তালিকা যাচাই ও হালনাগাদ করা। এ প্রক্রিয়ায় মৃত, স্থানান্তরিত, দ্বৈত নিবন্ধিত কিংবা ভোটার হওয়ার যোগ্যতা হারিয়েছেন—এমন ব্যক্তিদের তথ্য যাচাই করে তালিকা সংশোধনের কথা বলা হয়।

তবে বিরোধী দল ও আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, যাচাইয়ের নামে অনেক প্রকৃত ভোটারের নামও বাদ পড়েছে বা বাদ পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তাঁদের দাবি, ভোটার তালিকা থেকে যোগ্য নাগরিকদের নাম বাদ পড়লে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশনের অবস্থান হলো ভোটার তালিকা নির্ভুল রাখতে যাচাই ও সংশোধন প্রয়োজন। ফলে বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ভোটার তালিকার নির্ভুলতা এবং সংশোধনপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা।

দিল্লিতে বিক্ষোভ, আটক বিরোধী নেতারা

শনিবার দিল্লির যন্তর মন্তরে বড় প্রতিবাদ কর্মসূচির ডাক দেয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবি ছিল, ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে ওঠা অভিযোগের জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। গুরুত্বপূর্ণ সড়কে ব্যারিকেড, তল্লাশি এবং বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। কিছু এলাকায় যোগাযোগ ও যাতায়াতেও বিঘ্ন ঘটে।

আটকের ঘটনায় বিরোধী শিবিরের ক্ষোভ বেড়েছে। তাদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা এবং শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ জানানোর অধিকার বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে। অন্যদিকে, প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের যুক্তি সামনে এসেছে।

তবে মোট কতজনকে আটক করা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে কতজনকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে এবং কারা এখনো হেফাজতে রয়েছেন—এসব বিষয়ে নির্দিষ্ট ও হালনাগাদ তথ্য প্রয়োজন।

‘ককরোচ’ আন্দোলনের উত্থান

ভারতের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আলোচনায় উঠে এসেছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামটি। তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই আন্দোলন ভোটার তালিকা পুনর্নিরীক্ষণ ও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হওয়া প্রতিবাদ ধীরে ধীরে রাজনৈতিক কর্মসূচি ও রাজপথের সমাবেশে রূপ নিয়েছে।

গত ৮ অক্টোবর বেঙ্গালুরুর ফ্রিডম পার্কে আন্দোলনকারীদের একটি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে অভিনেতা প্রকাশ রাজ, ইউটিউবার ধ্রুব রাঠী এবং আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা অংশ নেন। সমাবেশে ভোটার তালিকা সংশোধনপ্রক্রিয়ায় কথিত অনিয়মের অভিযোগ তুলে নির্বাচন কমিশনের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা বা পরিচিত ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ একাই সারাদেশে আন্দোলনের জনসমর্থনের মাত্রা প্রমাণ করে না। আন্দোলনের বিস্তার বুঝতে বিভিন্ন অঞ্চলে কর্মসূচির ব্যাপ্তি, সাধারণ ভোটারদের অংশগ্রহণ এবং দাবিগুলোর প্রতি জনসমর্থন যাচাই করা জরুরি।

বিরোধীদের জন্য কতটা রাজনৈতিক সুযোগ?

ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্ক বিরোধী দলগুলোর জন্য সরকার ও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ তৈরি করেছে। বিভিন্ন দলের নেতা-কর্মীদের একই আন্দোলনে অংশগ্রহণ বিরোধী শিবিরের তৎপরতাকে দৃশ্যমান করেছে।

এ ধরনের ইস্যুতে বিরোধী দলগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়তে পারে। তবে একই কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া মানেই দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। পরবর্তী কর্মসূচি, পারস্পরিক সমন্বয়, দাবির বিষয়ে ঐকমত্য এবং জনসমর্থন ধরে রাখার সক্ষমতা তাদের রাজনৈতিক প্রভাব নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হবে।

এ ছাড়া ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার অভিযোগের পক্ষে যাচাইযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন এবং ক্ষতিগ্রস্ত ভোটারদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরা জরুরি। শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য বা বিক্ষোভের মাধ্যমে নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগ চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয় না।

তাহলে কি পতন হতে পারে মোদি সরকারের?

বিক্ষোভের তীব্রতা, বিরোধী নেতাদের আটক এবং নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে বিতর্ক কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে। তবে এসব ঘটনার ভিত্তিতে মোদি সরকারের পতন আসন্ন—এমন দাবি করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই।

ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার সংসদীয় ব্যবস্থার অধীনে পরিচালিত হয়। সরকার টিকে থাকার ক্ষেত্রে লোকসভার সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক অস্থিরতা বা জনবিক্ষোভ সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু সরকার পরিবর্তনের জন্য সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানো, জোটের সমর্থন প্রত্যাহার, আস্থা ভোটে পরাজয় কিংবা নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার পরিবর্তনের মতো রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ঘটনা প্রয়োজন।

বর্তমান আন্দোলনের ভবিষ্যৎ বুঝতে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। আন্দোলন দিল্লি বা কয়েকটি শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি দেশের বিভিন্ন রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ে; বিরোধী দলগুলো দীর্ঘমেয়াদে সমন্বিত কর্মসূচি চালাতে পারে কি না; ভোটার তালিকা নিয়ে অভিযোগের পক্ষে কতটা নির্ভরযোগ্য তথ্য সামনে আসে; এবং নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় সরকার কীভাবে এসব অভিযোগের জবাব দেয়—এসবের ওপর পরিস্থিতির গতিপথ নির্ভর করবে।

আসন্ন নির্বাচনগুলোতে ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্কের প্রভাব, বিরোধী দলগুলোর নির্বাচনী ফলাফল এবং ক্ষমতাসীন জোটের সংসদীয় সমর্থনও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

সব মিলিয়ে, ভারতের বর্তমান পরিস্থিতি মোদি সরকারের পতনের নিশ্চিত পূর্বাভাস নয়; বরং ভোটার তালিকা, নির্বাচনী স্বচ্ছতা ও নাগরিক অধিকার নিয়ে ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। আন্দোলনের ধারাবাহিকতা, জনসমর্থন, অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়াই নির্ধারণ করবে এই রাজনৈতিক চাপ কতটা দূর পর্যন্ত গড়ায়।

সূত্র: রয়টার্স, বিবিসি বাংলা ও সরবরাহ করা প্রতিবেদন

এনএ