Image description

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দেশটির রাজধানী নয়াদিল্লিসহ বিভিন্ন রাজ্যে বিক্ষোভ চলছে। জেন-জির দল ককরোচ জনতা পার্টিসহ (সিজেপি) বিরোধী দলগুলো তার পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন করছে।

নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে অতীতের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড—সব মিলিয়ে জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা বিতর্ক। বিরোধীদের অভিযোগ, তিনি ক্ষমতাসীন বিজেপিকে রাজনৈতিকভাবে সুবিধা দিতে নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে জ্ঞানেশ কুমারের পক্ষ থেকে কী বক্তব্য রয়েছে, তা প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়নি।

প্রশাসন থেকে নির্বাচন কমিশনে

জ্ঞানেশ কুমারের জন্ম ভারতের উত্তর প্রদেশের আগ্রায় ১৯৬৪ সালের ২৭ জানুয়ারি। তিনি উত্তর প্রদেশের একটি সরকারি কলেজ থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর ১৯৮৮ সালে ভারতীয় প্রশাসনিক পরিষেবায় (আইএএস) যোগ দেন।

কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে দক্ষিণ ভারতের কেরালা রাজ্যে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ২০১৬ সালে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন জম্মু ও কাশ্মীরবিষয়ক বিভাগে যোগ দেন।

রাম মন্দির নির্মাণের দায়িত্বেও ছিলেন

২০১৯ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ধ্বংসের স্থানে রাম মন্দির নির্মাণের পথ খুলে দেয়। আদালতের রায় বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি দলের প্রধান করা হয় জ্ঞানেশ কুমারকে।

রাম মন্দির নির্মাণের জন্য ট্রাস্ট গঠন ও নির্মাণকাজ তদারকিও ওই দলের দায়িত্বের মধ্যে ছিল। চলতি বছর ওই ট্রাস্টের বিরুদ্ধে মন্দির নির্মাণের জন্য সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সংগৃহীত কয়েকশ কোটি রুপি আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। সেই অভিযোগে জ্ঞানেশ কুমারের নামও আলোচনায় আসে।

বিজেপির হয়ে নির্বাচনে লড়ার পরামর্শ?

জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে সাম্প্রতিক বিতর্কের অন্যতম বিষয় কেরালার সাবেক মুখ্যসচিব জিজি থমসনের অভিযোগ।

এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৬ সালে দিল্লিগামী একটি বিমানে তাদের মধ্যে কথোপকথনের সময় জ্ঞানেশ কুমার তাকে বিজেপির হয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পরামর্শ দেন বলে দাবি করেছেন থমসন।

থমসনের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে কেরালার পাথানামথিট্টা আসন থেকে বিজেপির প্রার্থী হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন জ্ঞানেশ কুমার। নির্বাচনে জয়ী হলে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনার কথাও তাকে বলা হয়েছিল বলে দাবি করেন থমসন।

২০০৬ সালের ঘুষের অভিযোগ

জ্ঞানেশ কুমারের কর্মজীবনের পুরোনো একটি ঘটনাও সম্প্রতি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৬ সালে জ্ঞানেশ কুমার কেরালা সরকারের গণপূর্ত বিভাগের সচিব ছিলেন। ওই সময় বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত কেরালা স্টেট ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্টের (কেএসটিপি) একটি কাজকে কেন্দ্র করে বিতর্ক তৈরি হয়।

প্রকল্পটির প্রায় ২১৬ কোটি রুপির কাজ পেয়েছিল ভারতীয় প্রতিষ্ঠান ভাগীরথা ইঞ্জিনিয়ারিং ও মালয়েশীয় প্রতিষ্ঠান পিএটিআইয়ের যৌথ উদ্যোগ পিএটিআই-বিইএল।

কাজ শেষ করতে দেরি, জমি অধিগ্রহণে বিলম্ব ও ব্যয় বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও রাজ্য সরকারের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। পরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চুক্তির অর্থ প্রায় ৩০ শতাংশ বাড়ানোর দাবি জানায়।

এ সময় প্রকল্পটির প্রধান ব্যবস্থাপক মালয়েশীয় প্রকৌশলী লি সি বিন আত্মহত্যা করেন। ২০০৬ সালের নভেম্বরে কুয়ালালামপুরে তার মৃত্যুর পর ঘুষ দাবির অভিযোগ সামনে আসে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, তার রেখে যাওয়া বলে দাবি করা একটি নোটে প্রকল্পের বিল ছাড়ের জন্য গণপূর্ত বিভাগের কর্মকর্তাদের ঘুষ দাবির অভিযোগ ছিল। সেখানে জ্ঞানেশ কুমারের নামও ছিল।

বিতর্কের কেন্দ্রে ভোটার তালিকা সংশোধন

বর্তমানে জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর কর্মসূচি নিয়ে।

নির্বাচন কমিশনের এই প্রক্রিয়ায় ভোটারদের তথ্য যাচাই করে তালিকা সংশোধন করা হচ্ছে। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার ফলে যোগ্য নাগরিকদের ভোটাধিকার হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এতে বিজেপি রাজনৈতিকভাবে সুবিধা পেতে পারে বলেও অভিযোগ তাদের।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসআইআর প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন রাজ্যের খসড়া ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটির বেশি নাম বাদ পড়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ মৃত ভোটার, ৬ কোটি ৩০ লাখ স্থানান্তরিত ভোটার এবং প্রায় ৩ কোটি এমন ভোটার রয়েছেন, যাদের খুঁজে পাওয়া যায়নি।

বিরোধীদের দাবি, এত বিপুলসংখ্যক নাম বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় ভুল হলে প্রকৃত ভোটারদের অধিকার ক্ষুণ্ন হতে পারে।

এ ছাড়া দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভোটার তালিকা, নিবন্ধন পদ্ধতি ও নির্বাচন কমিশনের ডিজিটাল ব্যবস্থা নিয়ে বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বিষয়ে জ্ঞানেশ কুমারের দুই ডেপুটি গত ১০ মাসে অন্তত ১৪টি আনুষ্ঠানিক আপত্তি জানিয়েছিলেন।

এসব অভিযোগ ও বিতর্কের মধ্যেই জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন জোরদার হয়েছে। ফলে ভারতের নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

এসএস