Image description

প্রকৃতির বুকে গাছের জীবন্ত শিকড় দিয়ে তৈরি এক বিস্ময়কর সেতু। নেই কংক্রিট, নেই লোহার কাঠামো—গাছের শিকড় পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে তৈরি করেছে চলাচলের পথ। ভারতের মেঘালয়ের এই ব্যতিক্রমী সেতু দেখতে প্রতিদিন ভিড় করছেন দেশ-বিদেশের অসংখ্য পর্যটক। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য ও মানুষের ঐতিহ্যবাহী নির্মাণকৌশলের অনন্য সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই সেতু এখন পর্যটকদের কাছে অন্যতম আকর্ষণ।

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মেঘালয়ের খাসি পাহাড়ি অঞ্চলে অবস্থিত লিভিং রুট ব্রিজ (Living Root Bridge) বা জীবন্ত শিকড়ের সেতু প্রকৃতি ও মানুষের দীর্ঘদিনের সহাবস্থানের এক অনন্য নিদর্শন। বিশেষ করে নংরিয়াট গ্রামের বিখ্যাত ডাবল ডেকার লিভিং রুট ব্রিজ পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। দুটি স্তরে নির্মিত এই সেতু দেখতে পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ ও অসংখ্য সিঁড়ি পেরিয়ে পৌঁছাতে হয় দর্শনার্থীদের। দুর্গম পথের ক্লান্তি পেরিয়ে সেতুটির সামনে দাঁড়ালে এর ব্যতিক্রমী নির্মাণশৈলী মুগ্ধ করে পর্যটকদের।

স্থানীয়ভাবে পরিচালিত ব্যবস্থাপনার আওতায় সেতুটি পরিদর্শনে জনপ্রতি ৪০ টাকা প্রবেশমূল্য নেওয়া হয় বলে জানা গেছে। নির্ধারিত ফি দিয়ে পর্যটকেরা সেতুটি ঘুরে দেখার পাশাপাশি আশপাশের পাহাড়ি পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করেন।

লিভিং রুট ব্রিজের নির্মাণপদ্ধতি প্রচলিত সেতুর তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন। স্থানীয় জনগোষ্ঠী Ficus elastica প্রজাতির গাছের বায়বীয় শিকড়কে বিশেষ কৌশলে নির্দিষ্ট দিকে পরিচালিত করে এসব সেতু তৈরি করেন। সময়ের সঙ্গে শিকড়গুলো বড় হয়, পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে যায় এবং ধীরে ধীরে শক্ত কাঠামো গড়ে তোলে। দীর্ঘদিনের পরিচর্যা, ধৈর্য ও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অর্জিত অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তৈরি এই সেতু স্থানীয় মানুষের ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান ও প্রকৃতির সঙ্গে অভিযোজনের অসাধারণ উদাহরণ।

সেতুর ওপর দিয়ে হাঁটা, চারপাশের সবুজ বনভূমি উপভোগ করা এবং পাহাড়ি ঝরনা ও জলধারার মনোমুগ্ধকর দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করতে দেখা যায় পর্যটকদের। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা ভ্রমণপিপাসুরাও মেঘালয়ের এই জীবন্ত সেতুর প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন। পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের সঙ্গে অনেকেই এখানে আসেন প্রকৃতির ভিন্নধর্মী সৌন্দর্য উপভোগ করতে। দীর্ঘ পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে সেতুতে পৌঁছানোর অভিজ্ঞতা তাঁদের ভ্রমণে যোগ করে বাড়তি আনন্দ ও রোমাঞ্চ।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি জীবন্ত শিকড়ের সেতু স্থানীয় ঐতিহ্য, পরিবেশবান্ধব নির্মাণকৌশল এবং মানুষের সৃজনশীলতার গুরুত্বও তুলে ধরে। আধুনিক নির্মাণসামগ্রীর ওপর নির্ভর না করে প্রকৃতির উপাদানকে কাজে লাগিয়ে কীভাবে দীর্ঘস্থায়ী কাঠামো তৈরি করা যায়, এই সেতু তার অনন্য দৃষ্টান্ত। একই সঙ্গে পর্যটকদের আগমন স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকা ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসার প্রসারেও সম্ভাবনা তৈরি করছে।

তবে পর্যটকদের বাড়তি চাপের মধ্যে সেতু ও আশপাশের পরিবেশ সংরক্ষণ করাও জরুরি। শিকড়ের ক্ষতি না করা, নির্ধারিত পথ অনুসরণ করা, যেখানে-সেখানে ময়লা না ফেলা এবং স্থানীয় নিয়মকানুন মেনে চলার মাধ্যমে দর্শনার্থীরা এই অনন্য ঐতিহ্য রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারেন।

প্রকৃতি ও মানুষের সৃজনশীলতার এই অসাধারণ নিদর্শন মেঘালয়ের পর্যটন আকর্ষণকে আরও সমৃদ্ধ করছে। গাছের শিকড় দিয়ে তৈরি জীবন্ত সেতু কেবল একটি দর্শনীয় স্থান নয়; এটি ঐতিহ্য, ধৈর্য, পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজন এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের নিবিড় সম্পর্কের এক জীবন্ত প্রতীক।

এসএ