Image description

পেটের তাগিদে প্রতিদিনের মতো সেদিনও সকালে ঘর থেকে বের হয়েছিলেন জামাল হোসেন ও মো. সোহাগ। কে জানত, এই সকালই হবে তাঁদের জীবনের শেষ সকাল! নির্মাণাধীন ভবনের সেপটিক ট্যাংকের অন্ধকার গহ্বরে যে এমন মরণফাঁদ অপেক্ষা করছিল, তা ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেননি তাঁরা। ট্যাংকের ভেতরে জমে থাকা বিষাক্ত গ্যাস কেড়ে নিল দুই শ্রমিকের প্রাণ। তাঁদের আকস্মিক মৃত্যুতে নিভে গেল দুটি পরিবারের আশার আলো, নেমে এল শোকের কালো ছায়া।

বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) দুপুরে বরিশালের বানারীপাড়া পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডে এসএস প্রি-ক্যাডেট স্কুলসংলগ্ন এলাকায় জাল ব্যবসায়ী রিয়াজ হোসেনের নির্মাণাধীন বাড়িতে এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। দুই শ্রমিকের মৃত্যুর খবরে এলাকায় শোকের মাতম চলছে। স্বজনদের আহাজারি আর বুকফাটা কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে নির্মাণাধীন ভবনের সেপটিক ট্যাংকের ভেতরে সেন্টারিংয়ের বাঁশ ও কাঠ খোলার কাজ করতে সিঁড়ির নিচের ছোট ফাঁকা জায়গা দিয়ে ট্যাংকে প্রবেশের চেষ্টা করেন জামাল হোসেন ও মো. সোহাগ। এ সময় ভেতরে জমে থাকা বিষাক্ত গ্যাসের প্রভাবে তাঁরা অসুস্থ হয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।

খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় বানারীপাড়া ফায়ার সার্ভিসের একটি দল। ট্যাংকের ভেতরে বিষাক্ত গ্যাসের তীব্রতা থাকায় উদ্ধারকর্মীরা তাৎক্ষণিকভাবে ভেতরে প্রবেশ করতে পারেননি। পরে অক্সিজেন সরবরাহের মাধ্যমে গ্যাস অপসারণের ব্যবস্থা করে স্থানীয়দের সহায়তায় প্রায় এক ঘণ্টা পর দুই শ্রমিককে উদ্ধার করা হয়। এরপর তাঁদের বানারীপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে দুজনকেই মৃত ঘোষণা করেন।

এ দুর্ঘটনায় তছনছ হয়ে গেছে দুটি পরিবারের স্বপ্ন ও সাজানো সংসার। নিহত জামাল হোসেন সলিয়াবাকপুর গ্রামের মৃত আব্দুল মজিদ মোল্লার ছেলে। পৌর এলাকায় ভাড়া বাসায় থেকে দিনমজুরের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন তিনি। পরিবারের একমাত্র ভরসা জামালের আকস্মিক মৃত্যুতে তাঁর স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়ে এখন দিশেহারা। পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।

অন্যদিকে, নিহত মো. সোহাগ পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো. চুন্নু মিয়ার ছেলে। তাঁর মৃত্যুতেও পরিবারে নেমে এসেছে গভীর শোক ও অন্ধকার। স্ত্রী, দুই কন্যাসন্তান ও এক পুত্রসন্তানকে রেখে চিরবিদায় নিয়েছেন তিনি। অকালে বাবাকে হারানো শিশুদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে স্বজনদের চোখের পানি যেন কিছুতেই থামছে না। প্রিয়জনকে হারানোর শোকে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন পরিবারের সদস্যরা।

বানারীপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মজিবুর রহমান জানান, নির্মাণাধীন ভবনের সেপটিক ট্যাংকের ভেতরে সেন্টারিংয়ের কাজ করার সময় অক্সিজেনের অভাবে দুই শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। খবর পেয়ে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। এ ঘটনায় আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

জীবিকার তাগিদে যাঁরা অন্যের মাথা গোঁজার ঠাঁই নির্মাণে ইট-সিমেন্ট, বাঁশ-কাঠ নিয়ে প্রতিদিন পরিশ্রম করতেন, আজ তাঁদের নিজেদের পরিবারই হারাল বেঁচে থাকার অবলম্বন। সামান্য উপার্জনের আশায় কাজে নেমে এমন করুণ পরিণতি যেন আর কোনো শ্রমিকের ভাগ্যে না ঘটে। সেপটিক ট্যাংকের মতো বদ্ধ স্থানে প্রবেশের আগে বিষাক্ত গ্যাস পরীক্ষা, পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণের গুরুত্ব আবারও সামনে নিয়ে এসেছে এই দুর্ঘটনা।

দুই শ্রমিকের অকালমৃত্যুতে বানারীপাড়াজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্বজনদের কান্না আর পিতৃহারা শিশুদের অসহায় মুখ যেন বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে—নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা শুধু নিয়মের বিষয় নয়, এটি মানুষের জীবন রক্ষার অপরিহার্য শর্ত।

এসএ