Image description

অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী মারাত্মক ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের চিকিৎসায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) ব্যবহার করে নিখুঁতভাবে নকশা করা বিশেষ ভাইরাস এক রোগীর শরীরে পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগ করেছেন বিজ্ঞানীরা। ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক এআই স্টার্টআপ ‘র‍্যাডিক্যাল নিউমেরিকস’-এর তৈরি এই ভাইরাসটি যুক্তরাষ্ট্রের এক রোগীর চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়েছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে মানবদেহে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে এআই-নকশা করা কোনো ভাইরাস প্রয়োগের এটিই প্রথম ঘটনা বলে দাবি করেছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটি।

শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেন্ডেন্টের এক প্রতিবেদনে এই অভিনব ও যুগান্তকারী চিকিৎসা অর্জনের কথা জানানো হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গুরুতর ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণে আক্রান্ত ওই রোগীর চিকিৎসায় র‍্যাডিক্যাল নিউমেরিকসের নিজস্ব এআই মডেল ‘ওমনি-১’ (Omnii-1) ব্যবহার করা হয়েছে। এই এআই মডেলটি মূলত ‘ব্যাকটেরিওফাজ’ বা ‘ফাজ’ নামের একশ্রেণির ভাইরাস নিখুঁতভাবে নকশা করতে পারে। বিশেষ এই ভাইরাসগুলো মানুষের সুস্থ কোষে কোনো ধরনের আক্রমণ না করে কেবল নির্দিষ্ট ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াকে টার্গেট করে সংক্রমিত ও ধ্বংস করতে সক্ষম।

প্রচলিত ‘ফাজ থেরাপিতে’ সাধারণত রোগীর শরীরে থাকা ব্যাকটেরিয়া ধ্বংসের জন্য প্রকৃতি থেকে উপযোগী ভাইরাস খুঁজে বের করতে হয়, যা বেশ সময়সাপেক্ষ। তবে র‍্যাডিক্যাল নিউমেরিকসের এআই মডেলটি সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছে। নতুন ভাইরাস খোঁজার পরিবর্তে বিদ্যমান একটি প্রাকৃতিক ভাইরাসের নির্দিষ্ট জিনগত অংশ পুনর্নকশা করেছে ‘ওমনি-১’। এর ফলে লক্ষ্যবস্তু ব্যাকটেরিয়ার সুনির্দিষ্ট প্রজাতিকে আরও দ্রুত ও কার্যকরভাবে শনাক্ত ও আক্রমণ করতে পারে নতুন এই ভাইরাসটি।

প্রতিষ্ঠানের দাবি, এআই-নির্ভর এই পদ্ধতির মাধ্যমে ভবিষ্যতে রোগীর সংক্রমণের নির্দিষ্ট ধরন বিশ্লেষণ করে মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই উপযুক্ত ফাজ ভাইরাস তৈরি করা সম্ভব হবে। ফলে জটিল ও অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী সংক্রমণের চিকিৎসায় কার্যকর বিকল্প পেতে চিকিৎসকদের দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হবে না।

বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রচলিত চিকিৎসায় যখন কোনো ফল পাওয়া যায় না, তখন পরীক্ষামূলক থেরাপি প্রয়োগের বিশেষ কর্মসূচির (Compassionate Use) আওতায় ওই রোগীকে এই চিকিৎসা দেওয়া হয়। চিকিৎসায় ব্যবহারের আগে রোগীর শরীর থেকে সংগৃহীত ব্যাকটেরিয়ার নমুনায় এআই-নকশা করা ভাইরাসটি পরীক্ষা করা হয়। ল্যাবরেটরির পরীক্ষায় দেখা যায়, ওই ভাইরাসের মিশ্রণ নমুনায় থাকা অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়াগুলোকে পুরোপুরি নির্মূল করতে সফল হয়েছে।

তবে রোগীর সুনির্দিষ্ট রোগনির্ণয়, থেরাপির পর তাঁর শারীরিক অবস্থার অগ্রগতি কিংবা সংক্রমণ পুরোপুরি দূর হয়েছে কি না—এসব বিষয়ে এখনো বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি র‍্যাডিক্যাল নিউমেরিকস। তাছাড়া এই চিকিৎসা সংক্রান্ত কোনো গবেষণাপত্র এখনো কোনো পিওন-রিভিউড বা বিশেষজ্ঞ-পর্যালোচিত জার্নালে প্রকাশিত হয়নি।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করলেও এর অপব্যবহার নিয়ে জৈব-নিরাপত্তার ঝুঁকি নিয়েও উদ্বেগ বাড়াচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। এর আগে গত আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও আর্ক ইনস্টিটিউটের গবেষকেরা এআই ব্যবহার করে সম্পূর্ণ নতুন ধরনের ভাইরাস নকশা করার কথা জানিয়েছিলেন, যা ল্যাবরেটরিতে ই. কোলাই (E. coli) ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছিল।

ওই সময় গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছিলেন, মানুষের শরীরে সংক্রমণ ঘটাতে সক্ষম ক্ষতিকর ভাইরাস তৈরিতে যেন এ প্রযুক্তির কোনো ধরনের অপব্যবহার না হয়, সে বিষয়ে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও শক্তিশালী নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

ডিআর