Image description

সম্মানিত শিক্ষামন্ত্রী ড. এহছানুল হক মিলন মহোদয়। আপনাকে নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে। আপনার কঠোরতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে পরীক্ষায় নকলের বিরুদ্ধে আপনার অবস্থান অনেকের কাছে কঠোর মনে হতে পারে। কিন্তু আজ আমি একজন শিক্ষাবিদ, শিক্ষক এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন একজন নাগরিক হিসেবে বলতে চাই, নকলের বিরুদ্ধে আপনার এই কঠোর অবস্থানকে আমি মন থেকে ভালোবাসি, শ্রদ্ধা করি এবং সমর্থন করি।

কারণ, একটি জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে সব সময় অস্ত্রের প্রয়োজন হয় না। কখনো কখনো শিক্ষার নামে অযোগ্যতাকে পুরস্কৃত করাই যথেষ্ট।

২০০৯ সাল থেকে, বিশেষ করে পরবর্তী বছরগুলোতে, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় GPA-5 অর্জনকে ক্রমশ সহজ করে তোলার একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছিল। সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের সময় থেকে এই প্রবণতা আরও দৃশ্যমান হয়েছে বলে আমার পর্যবেক্ষণ।

আমি নিজের চোখে এমন অনেক শিক্ষার্থীকে দেখেছি, যাদের প্রকৃত মেধা ও প্রস্তুতি বিবেচনায় সর্বোচ্চ GPA-3 পাওয়াও কঠিন ছিল, অথচ তারা GPA-5 পেয়েছে। আমরা তখন আনন্দ করেছি, উৎসব করেছি, সন্তানদের সাফল্য উদ্‌যাপন করেছি। কিন্তু একবারও গভীরভাবে ভাবিনি, এই কৃত্রিম সাফল্যের আড়ালে আমরা আসলে কী হারাচ্ছি!

আমরা হয়তো শিক্ষার্থীদের খুশি করেছি, অভিভাবকদের গর্বিত করেছি, প্রতিষ্ঠানগুলোর সাফল্য দেখিয়েছি। কিন্তু তাদের প্রকৃত যোগ্যতা, আত্মবিশ্বাস এবং ভবিষ্যতের সক্ষমতা কি বাড়াতে পেরেছি?

আজ তার মূল্য আমাদের দিতে হচ্ছে। একটি সার্টিফিকেট একজন শিক্ষার্থীকে উত্তীর্ণ করতে পারে, কিন্তু তাকে যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারে না।

মন্ত্রী মহোদয়,

আমি চাই, আপনি আপনার অবস্থানে দৃঢ় থাকুন। নকল, অনিয়ম, প্রশ্নফাঁস এবং মূল্যায়নের অসততার বিরুদ্ধে আপনার অবস্থান অব্যাহত রাখুন। সাময়িক জনপ্রিয়তার চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিন।

তবে একটি বিষয় বিশেষভাবে অনুরোধ করতে চাই। শুধু শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ভালো ফলাফল প্রত্যাশা করলেই হবে না। আমাদের নিশ্চিত করতে হবে মানসম্মত শিক্ষক, দক্ষ শিক্ষক, প্রশিক্ষিত শিক্ষক এবং সত্যিকার অর্থে শিক্ষাদানে আগ্রহী শিক্ষক।

দুর্বল শিক্ষক দিয়ে শক্তিশালী জাতি গঠন করা যায় না

শিক্ষকদের নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, পেশাগত উন্নয়ন, জবাবদিহি এবং মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। শ্রেণিকক্ষে মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে চিন্তা করতে শেখানো, প্রশ্ন করতে উৎসাহিত করা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা তৈরি করা এবং মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় এমন পরিবর্তন প্রয়োজন, যেখানে GPA-5 নয়, প্রকৃত মেধা ও যোগ্যতা হবে সাফল্যের পরিচয়। যেখানে একজন শিক্ষার্থী শুধু পরীক্ষায় ভালো করবে না, বরং জীবনের পরীক্ষাতেও নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারবে। যেখানে সার্টিফিকেটের চেয়ে দক্ষতা, মুখস্থবিদ্যার চেয়ে চিন্তাশক্তি এবং ফলাফলের চেয়ে প্রকৃত শিক্ষা বেশি মূল্য পাবে।

মন্ত্রী মহোদয়, আপনার কাছে আমার একটি ব্যক্তিগত অঙ্গীকারও রয়েছে। আমি একজন শিক্ষক, নেতৃত্ব উন্নয়ন কৌশলবিদ এবং করপোরেট প্রশিক্ষক হিসেবে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছি এবং দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পেশাজীবীদের প্রশিক্ষণ দিয়েছি।

আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তনে শুধু সরকারের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন শিক্ষক, শিক্ষাবিদ, প্রশিক্ষক, গবেষক, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং সচেতন নাগরিকদের সম্মিলিত অংশগ্রহণ।

আপনি যদি সত্যিকার অর্থে শিক্ষার গুণগত পরিবর্তনের একটি মিশন হাতে নেন, আমি আমার অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও সামর্থ্য নিয়ে সেই উদ্যোগে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। কোনো পদ বা ব্যক্তিগত সুবিধার প্রত্যাশায় নয়। বরং আগামী প্রজন্মের জন্য একটি যোগ্য, দক্ষ, আত্মবিশ্বাসী ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যাশায়।

শেষে শুধু একটি কথা বলতে চাই, আমরা আমাদের সন্তানদের GPA-5 দিয়ে আনন্দিত করতে চাই না; আমরা চাই তারা জীবনে এমন যোগ্যতা অর্জন করুক, যাতে পৃথিবীর যেকোনো জায়গায় মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে।

মাননীয় মন্ত্রী, জনপ্রিয় হওয়ার চেয়ে প্রয়োজনীয় হওয়া অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আপনার সংস্কার কার্যক্রমে হয়তো সমালোচনা আসবে, বাধা আসবে, প্রতিরোধ আসবে। কিন্তু বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্তগুলো নিতে পিছপা হবেন না।

আপনার এই যাত্রায় একজন শুভাকাঙ্ক্ষী, শিক্ষাবিদ ও সহযোগী হিসেবে পাশে থাকার প্রত্যাশা রাখছি। শিক্ষার মান ফিরুক। মেধার প্রকৃত মূল্যায়ন হোক। যোগ্য মানুষ তৈরি হোক।

কারণ, আমরা শুধু শিক্ষিত বাংলাদেশ চাই না, আমরা একটি যোগ্য বাংলাদেশ চাই।

শ্রদ্ধা ও শুভকামনায়,

প্রফেসর এস. এম. আরিফুজ্জামান

শিক্ষাবিদ | Leadership Strategist | Executive Coach

Partner & Corporate Trainer, Quazi Consultants