দেশের ব্যাংক খাত এখন বড় ধরনের আর্থিক সংকটের মুখে। খেলাপি ঋণ বাড়তে থাকায় ব্যাংকগুলোর আয় কমছে, বাড়ছে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের পরিমাণ। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ করতে না পারায় ক্ষয় হচ্ছে মূলধন। ফলে দীর্ঘ সময় পর ব্যাংক খাত রেকর্ড লোকসানের মুখে পড়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাত সম্পদ ও মূলধনের বিপরীতে মুনাফায় ছিল। ওই সময় ১০০ টাকা সম্পদের বিপরীতে ব্যাংকগুলোর আয় ছিল ৪৩ পয়সা। আর ১০০ টাকা মূলধনের বিপরীতে আয় ছিল ৮ টাকা ৭০ পয়সা।
তবে এরপর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। ঋণ অনিয়ম ও জালিয়াতির ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পাশাপাশি খেলাপি ঋণও বাড়তে থাকে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৪৬ হাজার কোটি টাকায়। একই সময়ে প্রভিশন ঘাটতি ছাড়িয়ে যায় ১ লাখ কোটি টাকা।
২০২৫ সালের মার্চে খেলাপি ঋণ আরও বেড়ে ১ লাখ ৮২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায় এবং প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়ায় ২৬ হাজার ৫৮৫ কোটি টাকা। এতে ব্যাংকগুলোর মুনাফা কমে যায়। অনেক ব্যাংক মুনাফা থেকে প্রয়োজনীয় অর্থ প্রভিশন হিসেবে সংরক্ষণ করতে পারেনি।
ফলে ২০২৫ সালের মার্চে ব্যাংক খাত গড়ে লোকসানে চলে যায়। ওই সময়ে ১০০ টাকা সম্পদের বিপরীতে ব্যাংকগুলোর লোকসান ছিল ১৮ পয়সা। আর ১০০ টাকা মূলধনের বিপরীতে লোকসান ছিল ৩ টাকা ৯৯ পয়সা।
পরবর্তী সময়ে লোকসানের মাত্রা আরও বাড়তে থাকে। ২০২৫ সালের জুনে সম্পদের বিপরীতে লোকসান বেড়ে হয় ৫৮ পয়সা এবং মূলধনের বিপরীতে ১৬ টাকা ১১ পয়সা। সেপ্টেম্বরে সম্পদের বিপরীতে লোকসান ছিল ৫৪ পয়সা, আর মূলধনের বিপরীতে ১৫ টাকা ১০ পয়সা।
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখা যায় গত বছরের ডিসেম্বরে। ওই সময়ে ১০০ টাকা সম্পদের বিপরীতে ব্যাংক খাতের লোকসান দাঁড়ায় ৪ টাকা ৮১ পয়সা। আর ১০০ টাকা মূলধনের বিপরীতে লোকসান হয় ২৪৩ টাকা ৯০ পয়সা। টাকার অঙ্কে ব্যাংক খাতের লোকসান দেড় লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে প্রভিশন ঘাটতি ছাড়িয়ে যায় ১ লাখ ৯১ হাজার কোটি টাকা। খেলাপি ঋণের চাপ সামলাতে গিয়ে অনেক ব্যাংকের মূলধনও ক্ষয় হয়েছে।
ব্যাংকগুলোর আয়ের প্রধান উৎস ঋণের সুদ ও বিভিন্ন সম্পদ থেকে পাওয়া আয়। ফলে সম্পদ থেকে আয় কমে গেলে ব্যাংকের সামগ্রিক আয়ও কমে যায়। খেলাপি ঋণ বাড়ায় এই আয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি প্রভিশন সংরক্ষণের চাপও বেড়েছে।
ব্যাংকের ধরনভেদেও লোকসানে বড় পার্থক্য দেখা গেছে। গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলো সবচেয়ে বেশি লোকসান করেছে। সম্পদের বিপরীতে এসব ব্যাংকের গড় লোকসান ছিল ৬ দশমিক ৯২ শতাংশ। সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের লোকসান ছিল শূন্য দশমিক ৩২ শতাংশ এবং বিশেষায়িত সরকারি ব্যাংকের ২ দশমিক ৮০ শতাংশ।
অন্যদিকে বিদেশি ব্যাংকগুলো ছিল লাভে। সম্পদের বিপরীতে এসব ব্যাংকের মুনাফা ছিল ৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ। মূলধনের বিপরীতেও বিদেশি ব্যাংকগুলো ১৬ দশমিক ২০ শতাংশ মুনাফা করেছে।
চলতি বছরের মার্চে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। ওই সময় খেলাপি ঋণ বেড়ে ৬ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। একই সময়ে প্রভিশন ঘাটতিও বেড়ে ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
ব্যাংক খাত পুনরুদ্ধারে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। তবে খেলাপি ঋণ, প্রভিশন ঘাটতি ও মূলধন সংকট একসঙ্গে বাড়তে থাকায় সংকট কাটিয়ে উঠতে সময় লাগছে।
এসএস




Comments