গতকাল ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, (বুধবার) সন্ধ্যায় নিউইয়র্কের একটি রেস্টুরেন্টে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) যুক্তরাষ্ট্র শাখা এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের উদ্যোগে বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এবং জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের যুক্তরাষ্ট্র আগমন উপলক্ষে প্রস্তুতি ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে ভার্চুয়ালি উপস্থিত থাকার কথা ছিল বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ড. আসাদুজ্জামান রিপনের। প্রধান বক্তা ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য অধ্যাপক ড. সুকমল বড়ুয়া। বিশেষ অতিথি ছিলেন বিএনপি-যুক্তরাষ্ট্র শাখার সাবেক সহ-সভাপতি আলহাজ্ব সোলাইমান ভূঁইয়া।
সভায় সভাপতিত্ব করেন বিএনপি যুক্তরাষ্ট্র শাখার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, বিশিষ্ট চিকিৎসক ও বিএনপির চেয়ারপার্সনের সাবেক পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. মজিবুর রহমান মজুমদার। সভাটি যৌথভাবে সঞ্চালনা করেন যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির সাবেক সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও তিতুমীর কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক নির্বাচিত এজিএস আনোয়ারুল ইসলাম আনোয়ার এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ফোরাম যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক ছাত্রনেতা মোতাহার হোসেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত ও মোনাজাত পরিচালনা করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ফোরাম যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক সভাপতি মাওলানা ওমর ফারুক। দোয়া অনুষ্ঠানে মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া এবং তাঁদের কনিষ্ঠ পুত্র মরহুম আরাফাত রহমান কোকোর আত্মার মাগফিরাত কামনা করা হয়।
এ সময় বিএনপির চেয়ারম্যান ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের দীর্ঘায়ু ও শারীরিক সুস্থতা এবং জিয়া পরিবারের সকল সদস্যের সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করে বিশেষ দোয়া করা হয়। মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের আত্মার মাগফিরাত এবং জুলাই আন্দোলনের শহীদদের মাগফিরাত ও আহতদের সুস্থতা কামনা করেও বিশেষ দোয়া করা হয়। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ-এর সুস্থতা কামনায়ও বিশেষভাবে দোয়া করা হয়।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ড. আসাদুজ্জামান রিপন ইন্টারনেট সংযোগের সমস্যাজনিত কারণে বক্তব্য রাখতে পারেননি।
আলোচনা সভার প্রধান বক্তা অধ্যাপক ড. সুকমল বড়ুয়া বলেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা হিসেবে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পর রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং সুশাসনের ভিত্তি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
দেশের সকল ধর্ম, বর্ণ ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীকে এক সুতোয় বেঁধে তিনি ‘বাংলাদেশি’ নামক সমন্বিত আত্মপরিচয় প্রবর্তন করেন। মুক্তবাজার অর্থনীতি, খাল খনন কর্মসূচি এবং পোশাক খাতের সূচনা করে তিনি স্বনির্ভর বাংলাদেশের ভিত গড়েন।
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের দর্শনের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘ স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় আজীবন এক আপসহীন ও ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় চরম প্রতিকূলতা, কারাবরণ এবং পারিবারিক আত্মত্যাগ স্বীকার করেও তিনি এ দেশের মানুষের ম্যান্ডেট ও ভালোবাসা থেকে কখনো বিচ্যুত হননি।
এরশাদের সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে (১৯৮২-১৯৯০) তিনি রাজপথে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। কোনো ধরনের আপস না করায় তিনি জনগণের কাছে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে স্বীকৃতি পান। শত প্রতিকূলতা ও দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের মাঝেও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ এবং দেশের মানুষের প্রতি অবিচল অবস্থান তাঁকে ইতিহাসের এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর তাঁর মহাপ্রয়াণের পর বাংলাদেশের মানুষ এবং বিশ্ববাসী তাঁর প্রতি যে অভূতপূর্ব সম্মান ও ভালোবাসা প্রদর্শন করেছে, তা সমসাময়িক রাজনৈতিক ইতিহাসে সত্যিই বিরল।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর পিতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং মাতা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আদর্শিক ও রাজনৈতিক পথ অনুসরণ করে বাংলাদেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার পুনরুদ্ধার এবং একটি স্বনির্ভর রাষ্ট্র গঠনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি দেশের সুশাসন ও অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন।
সভাপতির বক্তব্যে ডা. মুজিবুর রহমান মজুমদার বলেন, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর গণহত্যা ও দমন-পীড়নের পর দেশের মানুষ যখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে, তখন চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা করেন।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হয়। ১৯৭৫ সালের সাংবিধানিক পরিবর্তনের মাধ্যমে একদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও সংবাদমাধ্যমের ওপর ব্যাপক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পরিবর্তনের পর জিয়াউর রহমান জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হন।
এই পর্যায়ে তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম প্রধান দিক ছিল রাজনৈতিক বহুত্ববাদ পুনঃপ্রবর্তন। তাঁর শাসনামলে নিষিদ্ধ ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা বিভিন্ন দলকে আবার রাজনীতি করার সুযোগ দেওয়া হয় এবং সংবাদপত্র ও মতপ্রকাশের ওপর বিদ্যমান বিধিনিষেধের কিছু অংশ প্রত্যাহার করা হয়। তাঁর রাজনৈতিক পদক্ষেপের মধ্যে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলগুলোর পুনরুজ্জীবন এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়টি উল্লেখযোগ্য।
বাংলাদেশের মানুষের বহুপ্রতীক্ষিত একটি আধুনিক, সমৃদ্ধ ও আত্মনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে তিনি নিরলসভাবে কাজ করে যান। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কৃষি ও উৎপাদন বৃদ্ধি, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবনমানের উন্নয়ন, জাতীয় ঐক্য এবং রাজনৈতিক বহুত্ববাদ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি শক্তিশালী ও মর্যাদাশীল রাষ্ট্র গড়ে তোলাই ছিল তাঁর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর তাঁর অসমাপ্ত স্বপ্ন ও কর্মসূচিকে সামনে রেখে তাঁর সহধর্মিণী বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের মানুষের অধিকার, গণতন্ত্র ও উন্নয়নের জন্য দীর্ঘদিন সংগ্রাম করে যান। তাঁর নেতৃত্বে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা সুদৃঢ়করণ এবং দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। ফলে শহীদ জিয়ার রেখে যাওয়া স্বপ্ন ও রাষ্ট্রচিন্তার ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের মানুষ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার সুফল ভোগ করার সুযোগ পায়।
গণতান্ত্রিক আন্দোলনের আপসহীন নেত্রী, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর তাঁরই সুযোগ্য পুত্র তারেক রহমান দেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে বাংলাদেশের নেতৃত্বের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর নেতৃত্বে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্বপ্ন এবং বেগম খালেদা জিয়ার অসমাপ্ত কাজকে এগিয়ে নিয়ে একটি গণতান্ত্রিক, সমৃদ্ধ, আধুনিক ও আত্মনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যয় আরও শক্তিশালী হয়।
উক্ত সভায় যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি এবং অঙ্গ সংগঠনের নেতৃবৃন্দের মধ্যে বক্তব্য রাখেন আলহাজ্ব সোলাইমান ভূঁইয়া, নিয়াজ আহমেদ জুয়েল, সৈয়দ মুরাদুল হাসান রেজা, জাকির এইচ চৌধুরী, সায়েদুল হক, ডা. শামীম দেওয়ান, মাকসুদ চৌধুরী, নাছিম আহমেদ, সৈয়দা মাহমুদা শিরিন, শেখ আলী, এম শহিদুল ইসলাম, ডা. তারেক জামান, নুর আলম, হাবিবুর রহমান হাবিব, শেখ জহির, ফরহাদ হোসেন মৃধা, মোরশেদ আলম, মোহাম্মদ নুরুজ্জামান লালটু প্রমুখ।
সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন মো. বাচ্চু মিয়া, শাহাবুদ্দিন আহমেদ, মোহাম্মদ সেলিম সারোয়ার, মো. সারওয়ার আবুল কালাম দুলাল, মো. জাহারুল রহিম, মোহাম্মদ আখতার হোসেন, ডা. আশরাফুল হক, মোহাম্মদ লক্কিয়ত উল্লাহ, আফজান মিয়া, মো. নজরুল ইসলাম, মো. মনসুর আলী, মো. নুরনবী, আইয়ুব আলী, আলাউদ্দিন, জহির উদ্দিন, মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন ভূঁইয়া, নজরুল ইসলাম খান প্রমুখ।
সবশেষে সঞ্চালক অনুষ্ঠানে উপস্থিত সবাইকে ধন্যবাদ জানান এবং জনাব তারেক রহমানের যুক্তরাষ্ট্র সফর সফল করার জন্য সকলের সহযোগিতা কামনা করে সভার সমাপ্তি ঘোষণা করেন।
এসএ




Comments