Image description

টানা চার বছর ধরে চলা লাগামহীন মূল্যস্ফীতি ও খাদ্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতিতে দেশের মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। চাল, ডাল, তেল থেকে শুরু করে শাকসবজি—সবকিছুর দাম প্রতিদিন বাড়লেও মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের আয় বাড়েনি। জুন ২০২৬-এ সার্বিক মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৯.১৬ শতাংশে নামলেও বাজারে তার স্বস্তি নেই। ভেতরের আড়তকেন্দ্রিক সিন্ডিকেট, পরিবহন খাতের চাঁদাবাজি এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনায় সার ও জ্বালানি সংকটের পূর্বাভাস—সব মিলিয়ে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা এখন চরম ঝুঁকির মুখে।

সিন্ডিকেট ও মধ্যস্বত্বভোগীর থাবা: রাজধানীর কারওয়ান বাজার, যাত্রাবাড়ী, মিরপুর ও মহাখালীসহ বিভিন্ন বাজারে আলু ছাড়া ৮০ টাকার নিচে কোনো সবজি মিলছে না। আলু ৫০ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হলেও বেগুন, পটোল, ঢ্যাঁড়শ বা চিচিঙ্গা বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১২০ টাকায়। গোল বেগুন ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা এবং কাঁচামরিচ ২০০ টাকা ছাড়িয়েছে।

একই শহরে বাজারভেদে পণ্যের দামে বড় তারতম্য দেখা যাচ্ছে। ডিমের ডজন মগবাজার পিয়ারাবাগ বাজারে ১৩৫ টাকা হলেও মহল্লার দোকানে বিক্রি হচ্ছে ১৬০ থেকে ১৬৫ টাকায়। শসা কারওয়ান বাজারে ৬০ টাকা হলে মহাখালীতে ৮০ থেকে ৯০ এবং বড় মগবাজারে ৮০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আড়ত থেকে চড়া দামে কেনা ও পরিবহন খরচের অজুহাত দিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।

স্থানীয় নেতাকর্মীদের দৌরাত্ম্য ও চাঁদাবাজি: রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় স্থানীয় নেতাকর্মীদের দৌরাত্ম্য ও চাঁদাবাজি সরাসরি পড়ছে ভোক্তার পকেটে। রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া, যশোর, নরসিংদী, বরিশাল ও ঝালকাঠি থেকে শাকসবজিবাহী ট্রাক রাজধানীতে আসার পথে বিভিন্ন পয়েন্টে ৫০০ থেকে ১,৫০০ টাকা চাঁদা দিতে হয়। আড়তে জায়গা বরাদ্দ, ফুটপাত দখল ও রসিদহীন তোলা আদায়ের অতিরিক্ত খরচ দিনশেষে যুক্ত হচ্ছে খুচরা মূল্যে।

বাজারের এমন বিশৃঙ্খলায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বেসরকারি চাকরিজীবী আনিসুর রহমান জানান, ‘মাস শেষে বেতন যা পাই, তার অর্ধেকের বেশি চলে যায় বাজার করতে। ৮০ টাকার নিচে কোনো সবজি নেই। আলু খেয়ে তো আর দিন চালানো যায় না। বাজারে কোনো শৃঙ্খলা নেই; এক দোকান থেকে অন্য দোকানে ৫-১০ টাকা পার্থক্য। সরকার বা তদারকি সংস্থার কোনো উপস্থিতি আমরা বাজারে দেখি না।’
কারওয়ান বাজারে আসা রোকেয়া বেগম বলেন, ‘আগে তাও এক-দুইটা সবজি কমে পাওয়া যেত, এখন সবকিছুর দাম ১০০ ছুঁইছুঁই। শোনা যায় রাস্তায় নাকি মোড়ে মোড়ে চাঁদা দিতে হয়, আর সেই টাকা আমাদের পকেট থেকে যাচ্ছে। কোনো নেতা আসুক আর যাক, সাধারণ মানুষের কষ্ট কেউ দেখে না।’

উচ্চমূল্যের চাপ সবচেয়ে বেশি গরিবের কাঁধে: সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণায় উঠে এসেছে, খাদ্যপণ্যের মূল্যের চাপ সবচেয়ে বেশি বইতে হচ্ছে নিম্নআয়ের মানুষকে। কারণ তাদের আয়ের বড় অংশই খাদ্যে ব্যয় হয়। ফলে খাদ্য মূল্যস্ফীতির কারণে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও সঞ্চয়ের মতো খাতে ব্যয় কমাতে বাধ্য হচ্ছে পরিবারগুলো। উত্পাদন, বিপণন, বাজারজাতকরণ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অদক্ষ সরবরাহ ব্যবস্থা, মজুতদারি ও প্রতিযোগিতার অভাব একযোগে খাদ্যের দাম বাড়াচ্ছে। মধ্যস্বত্বভোগীদের একাধিক হাতবদলে কৃষক যে দামে পণ্য বিক্রি করেন, ভোক্তা কেনেন তার বহুগুণ দামে।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে ‘দ্য ফুড প্রাইস চেইন: মার্কেটস, মার্জিনস অ্যান্ড ইন্টারমিডিয়ারিজ ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘গত কয়েক বছর ধরে মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে এবং চার বছর ধরে এটি দেশের অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি মানুষের ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করছে। তবে খাদ্যের দাম বৃদ্ধির জন্য একক কোনো কারণকে দায়ী করা যায় না। 

মাঠপর্যায়ের গবেষণায় দেখা গেছে, উত্পাদন, বিপণন, বাজারজাতকরণ, সরবরাহ ব্যবস্থা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বাজারের অদক্ষতা, মজুতদারি, সরবরাহ ঘাটতি এবং প্রতিযোগিতার অভাবসহ বিভিন্ন কারণ একযোগে খাদ্যের দাম বাড়াতে ভূমিকা রাখে। তাই এই সমস্যার সমাধানেও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।’ ওই অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির ও কৃষি অর্থনীতিবিদ এম এ সাত্তার ম্ললসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।

বিষাক্ত রাসায়নিক ও কৃত্রিম পণ্যে ভরপুর বাজার: মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি পণ্যের মান নিয়েও রয়েছে মারাত্মক সংকট। নদী ও পুকুরে চাষ করা মাছে ভারী ধাতু (সিসা) ও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি মিলছে। অসাধু ব্যবসায়ীরা কৃত্রিমভাবে পণ্য সুদর্শন করতে ক্ষতিকর রাসায়নিক মেশাচ্ছে। বিএসটিআই’র লোগো অপব্যবহারের পাশাপাশি ‘অর্গানিক’, ‘দেশি’ বা ‘প্রিমিয়াম’ নাম দিয়ে একই পণ্য ভিন্ন ভিন্ন চড়া দামে বিক্রি করে ভোক্তাদের ঠকানো হচ্ছে।

নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলো তাদের জনবল সংকট ও সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা নিয়মিত বাজার মনিটরিং ও অভিযান পরিচালনা করছি। মূল্যতালিকা টাঙানো ও পাকা রসিদ সংরক্ষণের বিষয়ে ব্যবসায়ীদের বাধ্য করার চেষ্টা চলছে। তবে শুধু বাজারে অভিযান চালিয়ে দাম নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। কারণ পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং পরিবহন খাতের চাঁদাবাজি বন্ধ করা অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের দায়িত্ব। উত্পাদকের কাছ থেকে খুচরা পর্যায়ে পৌঁছানো পর্যন্ত যে মধ্যস্বত্বভোগী ও চাঁদাবাজির চক্র রয়েছে, তা গোড়া থেকে উচ্ছেদ করতে হবে।’

একইভাবে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ‘আমরা পণ্যের গুণগতমান ও ভেজাল প্রতিরোধে কাজ করছি। বাজারে ‘অর্গানিক’ বা ‘বিশেষ মানের’ নামে যে বিভ্রান্তি তৈরি করা হয়, তার বিরুদ্ধে আমাদের মনিটরিং টিম কাজ করছে। তবে মূল্য নির্ধারণের প্রত্যক্ষ এখতিয়ার আমাদের নেই। বাজারে বিক্রয়যোগ্য খাদ্যপণ্য যেন মানসম্মত হয় এবং ভোক্তারা যাতে বিভ্রান্ত না হন, সে বিষয়ে আমরা শিগগিরই আরও কঠোর নীতিমালা ও ঝটিকা অভিযান জোরদার করব।’

আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি ও সার সংকট: যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর ইরান হরমুজ প্রণালিতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় এবং জাহাজে হামলার ঘটনায় এ নৌপথ অচল হয়ে পড়েছে। এতে ইউরিয়া সারের সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ডব্লিউএফপির তথ্যমতে, আন্তর্জাতিক বাজারে ইউরিয়ার দাম ইতোমধ্যে ৫০ শতাংশ বেড়েছে। বাংলাদেশে ব্যবহূত ৮০ শতাংশ ইউরিয়া কাতার, সৌদি আরব ও আমিরাত থেকে আসে। বর্তমানে দেশে যে মজুত আছে তা দিয়ে অক্টোবর পর্যন্ত চলবে। এরপর সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে কৃষি উত্পাদন ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জাতিসংঘের ‘দ্য স্টেট অব ফুড সিকিউরিটি অ্যান্ড নিউট্রিশন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড ২০২৬’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে ২৬.২ শতাংশ (প্রায় ৪ কোটি ৫৪ লাখ) মানুষ মাঝারি বা তীব্র খাদ্য অনিরাপত্তায় রয়েছে। ৩৮.৬ শতাংশ (প্রায় ৬ কোটি ৭৮ লাখ) মানুষের স্বাস্থ্যকর খাদ্য কেনার সামর্থ্য নেই। দিনে প্রয়োজনীয় ২,৩৩০ কিলোক্যালরির স্বাস্থ্যকর খাদ্যের গড় ব্যয় ২০১৭ সালের ৩.৯ ডলার থেকে বেড়ে ২০২৫-২৬ সালে ৪.৫৯ ডলারে পৌঁছেছে, যা দক্ষিণ এশিয়ায় অন্যতম সর্বোচ্চ। শিশুদের ক্ষেত্রে ১০.৭ শতাংশ (১৭ লাখ) তীব্র ক্ষীণতায় এবং ২৫.১ শতাংশ (৪২ লাখ) খর্বাকৃতিতে ভুগছে। ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী ৩৭.৬ শতাংশ নারী রক্তস্বল্পতায় আক্রান্ত।

১ কোটি ৮১ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য সংকটের ঝুঁকিতে: আইপিসির (ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন) সর্বশেষ বিশ্লেষণে সতর্ক করা হয়েছে, দেশে বর্তমানে ১ কোটি ৫৩ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে। বছরের শেষ নাগাদ (সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর) এ সংখ্যা বেড়ে ১ কোটি ৮১ লাখে পৌঁছাতে পারে, যার মধ্যে প্রায় ৭ লাখ ৮৭ হাজার মানুষ জরুরি পর্যায়ের চরম খাদ্য সংকটে পড়বে। হাওর, পার্বত্য চট্টগ্রাম, উপকূলীয় এলাকা ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে এই ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী এ প্রসঙ্গে জানান, ‘খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মানুষের সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াতে বাংলাদেশ সরকার তথ্য-প্রমাণভিত্তিক বিশ্লেষণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। আইপিসির এই ফলাফল আমাদের সম্পদের আরও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে এবং জলবায়ু ও অর্থনৈতিক চাপের মুখে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য সমন্বিত উদ্যোগ আরও জোরদার করতে সহায়তা করবে।’

সংকট উত্তরণে চার পদক্ষেপ: পর্যবেক্ষকদের মতে, বাজার নিয়ন্ত্রণে সাময়িক অভিযান নয়, বরং স্থায়ী পদক্ষেপ প্রয়োজন— মহাসড়ক, প্রবেশমুখ ও আড়তের চাঁদাবাজি সম্পূর্ণ বন্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া, কৃষক থেকে সরাসরি ভোক্তা পর্যায়ে সরকারি পরিবহনে পণ্য পৌঁছাতে ‘কৃষক বাজার’ সমপ্রসারণ, জেলা প্রশাসন ও ভোক্তা অধিকারের দৃশ্যমান ও নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং পাইকারি ও খুচরা—উভয় বাজারে মূল্যতালিকা দৃশ্যমান রাখা এবং পাকা কেনাবেচার রসিদ বাধ্যবাধকতা করা। তাদের মতে, রাজনৈতিক প্রভাব ও সিন্ডিকেটের এই দুষ্টচক্র উচ্ছেদ করা না গেলে সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা বিধান অসম্ভব হয়ে পড়বে।