চীনের রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ইউনিট্রি রোবোটিকসের শেয়ারবাজারে অভিষেকেই দেখা গেল অবিশ্বাস্য উত্থান। বুধবার সাংহাইয়ের প্রযুক্তিনির্ভর স্টার মার্কেটে তালিকাভুক্তির পর কোম্পানিটির শেয়ারদর প্রাথমিক লেনদেনে ৬০০ শতাংশের বেশি বেড়ে যায়। প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওর মাধ্যমে বাজারে আসা ইউনিট্রির শেয়ার লেনদেনের শুরুতে ১ হাজার ১০০ ইউয়ান পর্যন্ত উঠে যায়। পরে কিছুটা কমে প্রায় ৯০০ ইউয়ানে লেনদেন হচ্ছিল।
চীনের ‘নাসডাক’ হিসেবে পরিচিত স্টার মার্কেটে ইউনিট্রির এই অভিষেক দেশটির রোবোটিকস শিল্পের জন্য বড় মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে রোবট ও রোবট পরিচালনাকারী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির নেতৃত্ব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতাও আরও স্পষ্ট হচ্ছে।
ইউনিট্রি প্রথম চীনা হিউম্যানয়েড রোবট নির্মাতা নয়, যারা শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে। তবে মূল ভূখণ্ড চীনে তালিকাভুক্ত হওয়া এই খাতের প্রথম প্রতিষ্ঠান এটি।
হিউম্যানয়েড রোবটে কেন এত আগ্রহ?
কারখানা, গুদাম ও বাড়িতে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র এবং স্মার্ট ভ্যাকুয়াম ক্লিনারের ব্যবহার এরই মধ্যে ব্যাপক। এখন মানুষের মতো দুই পায়ে হাঁটতে ও বিভিন্ন কাজ করতে সক্ষম হিউম্যানয়েড রোবট নিয়ে বড় ধরনের বিনিয়োগ শুরু হয়েছে। টেসলা, বিওয়াইডি ও অ্যামাজনের মতো বড় প্রতিষ্ঠানও এই প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে।
২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ইউনিট্রি রোবোটিকসের মূল কোম্পানি ইউশু টেকনোলজি। চীনের হাংঝৌভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটি সেন্সর, রোবোটিক আর্ম, চার পায়ের রোবট এবং হিউম্যানয়েড রোবট তৈরি করে। ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটি ৫ হাজার ৫০০টির বেশি হিউম্যানয়েড রোবট সরবরাহ করেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। একই বছর প্রায় ২৭৮ মিলিয়ন ইউয়ান নিট মুনাফা করেছে কোম্পানিটি, যা হিউম্যানয়েড রোবট খাতে এখনো বিরল সাফল্য।
ইউনিট্রির অন্যতম শক্তি হলো তুলনামূলক কম দাম। প্রতিষ্ঠানটির রোবট কুকুরের দাম শুরু হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৭০০ ডলার থেকে। তুলনায় বোস্টন ডায়নামিকসের ‘স্পট’ রোবট কুকুরের দাম প্রায় ৭০ হাজার ডলার। ২০২৩ সাল থেকে হিউম্যানয়েড রোবট বিক্রি করছে ইউনিট্রি। ২০২৪ সালে বাজারে আসে তাদের শিশুর আকারের G1 মডেল, যার দাম প্রায় ১৩ হাজার ৫০০ ডলার।
চীনের কৌশলগত বিনিয়োগ-
বয়স্ক জনসংখ্যা ও ভবিষ্যৎ শ্রমিক সংকট মোকাবিলায়ও রোবোটিকসকে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি হিসেবে দেখছে চীন। দেশটির সরকার রোবোটিকস খাতকে ‘কৌশলগত অগ্রাধিকার’ হিসেবে বিবেচনা করছে। সরকারি বিনিয়োগের ফলে ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে চীনে রোবোটিকস কোম্পানির সংখ্যা তিন গুণেরও বেশি বেড়েছে বলে চায়না ডেইলির বরাতে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শুধু শিল্পকারখানা নয়, হাসপাতাল ও ভবিষ্যতে মানুষের বাড়িতেও হিউম্যানয়েড রোবট ব্যবহারের সম্ভাবনা দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে ব্যাটারি সক্ষমতা, নির্ভরযোগ্যতা, গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার মতো বিষয় এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রযুক্তি লড়াইয়ে নতুন ফ্রন্ট-
রোবট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রযুক্তি প্রতিযোগিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। জাতীয় নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে যুক্তরাষ্ট্র নতুন চীনা তৈরি হিউম্যানয়েড ও চার পায়ের রোবট নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছে। অন্যদিকে চীনা কোম্পানিগুলো তুলনামূলক কম খরচে রোবট তৈরি করে বৈশ্বিক বাজারে দ্রুত অবস্থান তৈরি করছে।
ইউনিট্রির আইপিওকে তাই শুধু একটি কোম্পানির শেয়ারবাজারে প্রবেশ হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকেরা। এটি চীনের রোবোটিকস শিল্পে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকও হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনো ঘরের দৈনন্দিন কাজে হিউম্যানয়েড রোবট ব্যাপকভাবে ব্যবহারের সময় আসেনি। আপাতত কারখানা, গুদাম ও হাসপাতালের মতো নিয়ন্ত্রিত পরিবেশই হতে পারে এই প্রযুক্তির প্রধান বাজার।
তবে ইউনিট্রির শেয়ারবাজারে অভিষেক একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পর রোবোটিকসও চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রযুক্তি প্রতিযোগিতার নতুন বড় ক্ষেত্র হয়ে উঠছে।
এম আর এ




Comments