হাতির আবাসস্থল সংকুচিত
আবাসস্থল সংকটে বাড়ছে হাতি-মানুষের সংঘাত, বাঁশখালীতে বিশ্ব হাতি দিবস পালিত
বাঁশখালীতে বাড়ছে মানুষ-হাতির সংঘাত
‘বিশ্বজুড়ে ঐক্য গড়ি, হাতির জীবন রক্ষা করি’- এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে বিশ্ব হাতি দিবস পালিত হয়েছে। বুধবার (১২ আগস্ট) নাপোড়া শেখেরখীল উচ্চ বিদ্যালয়ের হলরুমে হাতি সংরক্ষণ প্রকল্পের অর্থায়নে চট্টগ্রাম বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের উদ্যোগে র্যালি, আলোচনা সভা ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে হাতির আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত ৪৫ জনের মধ্যে মোট ১৯ লাখ ১৫ হাজার টাকার ক্ষতিপূরণের চেক বিতরণ করা হয়।
চট্টগ্রাম বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা দীপান্বিতা ভট্টাচার্যের সভাপতিত্বে এবং বাঁশখালী জলদি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য রেঞ্জের ফরেস্ট রেঞ্জার ইসরাইল হকের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমীন। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন সরকারি আলাওল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ আজিজুর রহমান, নাপোড়া শেখেরখীল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. জাহাঙ্গীর আলম, প্রাণিসম্পদ সম্প্রসারণ কর্মকর্তা ডা. জুলকারনাইন শাওন, চাম্বল বিট কর্মকর্তা মো. দিদার, নাপোড়া বিট কর্মকর্তা অঞ্জন কান্তি বিশ্বাস, পুইছুড়ি বিট কর্মকর্তা কামরুল হাসানসহ সংশ্লিষ্টরা।
আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, চুনতি সংরক্ষিত বন ও বাঁশখালীর বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় মানুষের বসতি বিস্তারের ফলে হাতির আবাসস্থল ও চলাচলের পথ সংকুচিত হচ্ছে। একই সঙ্গে বনের ভেতরে কৃষিকাজ ও খাদ্যযোগ্য উদ্ভিদ ধ্বংসের কারণে হাতির খাদ্যসংকট তৈরি হচ্ছে। ফলে খাবারের সন্ধানে হাতির পাল লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে এবং বাড়ছে মানুষ-হাতির সংঘাত। বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের মোট আয়তন ২৪ হাজার ৪৫৪ একর। এর মধ্যে জলদি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য রেঞ্জের ১৫ হাজার ৫৯৬ একর এলাকা বাঁশখালী উপজেলায়। এ উপজেলায় একটি রেঞ্জ ও চারটি বিট রয়েছে। পাহাড়ি এলাকার বড় একটি অংশ সংরক্ষিত বন এবং হাতির চলাচলের করিডর হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের বাঁশখালী অংশে ১৪টি হাতি মারা গেছে। একই সময়ে হাতি-মানুষের সংঘাতের ঘটনায় ১৫ জন মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। স্থানীয় কৃষক আবদুর রশীদ ও ইনফাস মিয়া বলেন, কয়েক বছর ধরে বন্যহাতির কারণে কৃষিকাজে নতুন আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। প্রায়ই রাতের বেলা হাতির পাল এসে কলাবাগান ও সবজির ক্ষেত নষ্ট করে। চাম্বল এলাকার কৃষক রামপ্রসাদ দাশ ও রাজীব দাশ জানান, হাতির পাল এলাকায় এলে স্থানীয়রা একত্রিত হয়ে আগুন জ্বালিয়ে ও বিভিন্ন শব্দ করে হাতিকে বনের দিকে তাড়ানোর চেষ্টা করেন।
জলদি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য রেঞ্জের ফরেস্ট রেঞ্জার ইসরাইল হক বলেন, ভৌগোলিকভাবে সংরক্ষিত বন ও লোকালয় কাছাকাছি হওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হচ্ছে। উপকূলীয় এলাকার অনেক মানুষ বনের জমিতে বসতি স্থাপন করছেন। হাতির বাসস্থান রক্ষায় ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করা হয়েছে এবং হাতির খাদ্য উপযোগী বাগান তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলেন, কয়েক বছর ধরে মানুষ ও হাতির দ্বন্দ্ব বেড়েছে। সংরক্ষিত বনে জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত ও গৃহহীন মানুষকে পুনর্বাসনের কারণে প্রকৃতি, বন্যপ্রাণী ও মানুষ- তিন পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।
সরকারি আলাওল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ আজিজুর রহমান বলেন, হাতির নিরাপদ আবাসস্থল, পর্যাপ্ত খাবার ও পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। বন দখল করে বসতি স্থাপন, অবাধে গাছ কাটা এবং অবৈধভাবে বালু-পাথর উত্তোলনের কারণে বনাঞ্চলের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেও পাহাড়ে বন্যপ্রাণীর খাদ্যভাণ্ডার কমে যাচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমীন বলেন, সংরক্ষিত বনে মানুষের বসতি গড়ে ওঠায় হাতির চলাচলের পথ বন্ধ ও আবাসস্থল সংকুচিত হয়েছে। খাবারের সন্ধানে হাতি লোকালয়ে চলে আসছে। হাতিকে রক্ষা করতে না পারলে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হবে।
তিনি বলেন, হাতির বিচরণক্ষেত্রে কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি করা যাবে না। হাতির নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে। আলোচনা সভা শেষে হাতি সংরক্ষণ ও মানুষ-হাতির সংঘাত কমাতে সচেতনতা তৈরির আহ্বান জানানো হয়।
এম আর এ




Comments