এক লাখ ৪৭ হাজার ২০৯ কেজি কাঁচামাল। আমদানি করা হয়েছে বন্ড সুবিধায়। তবে এই কাঁচামালের কোনো অস্তিত্ব মেলেনি গুদামে। রপ্তানির কোনো প্রমাণও নেই। পুরো চালান বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে খোলা বাজারে। যাতে ক্ষতি সরকারি কোষাগারের ৪ কোটি ২৭ লাখ ৯২ হাজার ১৪১ টাকা। অনুসন্ধানে এমন সব চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে নগরের মেসার্স আর্টিস্টিক এ্যাপারেলস লিমিটেড নামক পোশাক কারখানার বিরুদ্ধে।
এদিকে, শতভাগ রপ্তানিমুখী শিল্পের সনদ নিয়ে ব্যবসা করা প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণের পর কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট ২০২৬ সালের ২৮ জানুয়ারি জরিমানা করে ৮ কোটি ৭৭ লাখ ৯২ হাজার ১৪১ টাকা। তবে জরিমানার এই টাকা এখনো পরিশোধ করেনি প্রতিষ্ঠানটি। উল্টো সিলগালা করা ওয়্যারহাউস খুলে দেওয়ার আবেদন নিয়ে হাজির হয়েছে মালিকপক্ষ!
সরেজমিন পরিদর্শন ও অনুসন্ধানে জানা গেছে, আর্টিস্টিক এ্যাপারেলস লিমিটেডের ঠিকানা নগরের নিউ চাক্তাইয়ের হাজী দেলোয়ার হোসেন সওদাগর মার্কেটের পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলা। গত বছরের ৭ আগস্ট কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের সাত সদস্যের একটি দল প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালায়। উৎপাদন কার্যক্রম সাব-কন্ট্রাক্টে চলছে বলে দাবি করলেও তার সপক্ষে কোনো কাগজ দেখাতে পারেনি প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরা।
গুদামের হিসাব চাওয়া হলে কমার্শিয়াল ম্যানেজার সাইমন জানান, বন্ড রেজিস্টার সম্প্রতি কেনা হলেও তাতে কোনো হিসাব লেখা হয়নি। ইনভেন্টরি শেষে প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা যৌথ বিবৃতিতে স্বীকার করেন, গুদামে পাওয়া কাঁচামালের বাইরে তাদের কাছে আর কিছু নেই। এরপরই সিলগালা করে দেওয়া হয় দুটি ইনটু বন্ড গুদাম।
গুদামে তখন মজুত মিলেছিল মাত্র ১৪ হাজার ৭৮৬ দশমিক ৭৮ কেজি পলিস্টার ওভেন ফেব্রিক্স—দুই স্টোর মিলিয়ে। অথচ নথি অনুযায়ী মজুত থাকার কথা ছিল আরও ১ লাখ ৪৭ হাজার ২০৯ দশমিক ৭৪ কেজি বেশি। ২০১৭ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত নিরীক্ষায় প্রতিষ্ঠানের কোনো সমাপনী মজুত দেখানো হয়নি। এমআইএস ডাটা, বিজিএমইএ-বিকেএমইএর ইউডি এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ড্যাশবোর্ড বিশ্লেষণ করেই এসব অসঙ্গতি ধরা পড়ে।
হিসাবে ফাঁকি সাড়ে চার কোটি
সবচেয়ে কম ঘোষিত মূল্যের বিল অব এন্ট্রি রেফারেন্স ধরে শুল্ক-কর হিসাব করে কাস্টমস। প্রথম চালানে ১ কোটি ৯৭ লাখ ৫৮ হাজার ৯৭৭ দশমিক ৭৮ টাকা এবং দ্বিতীয় চালানে ২ কোটি ৩০ লাখ ৩৩ হাজার ১৬৪ দশমিক ১৯ টাকা—মোট ৪ কোটি ২৭ লাখ ৯২ হাজার ১৪১ দশমিক ৯৭ টাকা রাজস্ব ফাঁকির হিসাব মেলে। এর বাইরে গত ৩০ জুলাই কাস্টমস হাউসের এআইআর শাখা আরও চারটি বিল অব এন্ট্রির মাধ্যমে ৩০ হাজার ৩৩৪ কেজি পণ্য আটক করে, যা এখনো ছাড় হয়নি।
নোটিশ এড়াতে বারবার সময়ের আবেদন
কাস্টমস আইন ২০২৩-এর ধারা ১২৬ অনুযায়ী কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি হয় প্রতিষ্ঠানের নামে। প্রথমে পনেরো দিন সময় দেওয়া হলেও শারীরিক অসুস্থতার অজুহাতে চার মাস সময় বাড়ানোর আবেদন করে মালিকপক্ষ। এরপর ২০২৫ সালের ১ ও ২৩ ডিসেম্বর দুই দফা শুনানির দিন ধার্য হলেও প্রতিষ্ঠানের কেউ হাজির হননি।
শেষ পর্যন্ত বন্ডের কাপড় দিয়ে পোশাক তৈরি করে রপ্তানি না করে অবৈধভাবে সরিয়ে ফেলার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় কাস্টমস আইনের ১১৮ ধারায় ৪ কোটি ২৭ লাখ ৯২ হাজার ১৪১ দশমিক ৯৭ টাকা রাজস্ব এবং ১৭১(১) ধারার ২৩ নম্বর ক্রমিক অনুযায়ী ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা জরিমানা—সর্বমোট ৮ কোটি ৭৭ লাখ ৯২ হাজার ১৪১ দশমিক ৯৭ টাকা পনেরো দিনের মধ্যে জমার নির্দেশ দেওয়া হয় ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখের আদেশে। ব্যর্থ হলে ওয়্যারহাউস লাইসেন্সিং বিধিমালা ২০২৪ অনুযায়ী বন্ড লাইসেন্স সাসপেন্ড বা বাতিলের কথাও বলা হয়েছে নির্দেশনায়।
'আগের মালিকের আমলে ঘটনা'—নোটিশের জবাবে দাবি
তদন্ত চলাকালীন ২০২৫ সালের ২১ সেপ্টেম্বর কারণ দর্শানো নোটিশের জবাব দেয় আর্টিস্টিক এ্যাপারেলস লিমিটেড। জবাবে বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক মামুনুর রহমান দাবি করেন, বন্ড সুবিধার কাঁচামাল আমদানি করে রপ্তানি না করার ঘটনা ঘটেছে আগের মালিক মনোজ কান্তি দাশের আমলে, যা সম্পর্কে তিনি একেবারেই অবগত ছিলেন না।
তিনি জানান, মনোজ কান্তি দাশের কাছ থেকে প্রতিষ্ঠানের মালিকানা নেওয়ার পর নতুন কোনো এলসি অর্ডার না পাওয়ায় প্রথম দিকে সাব-কন্ট্রাক্টে কারখানা সচল রাখেন তিনি। পরবর্তীতে কিছু এফওসি অর্ডার পান বলেও উল্লেখ করেন তার জবাবে।
তবে অভিযোগ রয়েছে, বন্ড সুবিধার আওতায় শুল্ক ফাঁকি, সম্ভাব্য আইনি জটিলতা, বড় অঙ্কের জরিমানা ও মামলার দায় এড়াতে কৌশলে তড়িঘড়ি করে প্রতিষ্ঠানটির মালিকানা পরিবর্তন করা হয়েছিল।
জরিমানাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি, ওয়্যারহাউস খোলার আবেদন!
এদিকে প্রতিষ্ঠানটি জরিমানা পরিশোধের বদলে নতুন কৌশল নিয়েছে। চলতি বছরের ১৯ মে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস কমিশনার বরাবর আবেদন করে জি.বি ওয়্যারহাউস (নম্বর জিবি৮০২০১০০২৭) আনলক করার দাবি জানানো হয়। আবেদনে বলা হয়, 'মিসডিক্লোরেশনজনিত জটিলতায় গুদাম লক থাকায় উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক বাণিজ্য ব্যাহত হচ্ছে।'
কাস্টমস ও বন্ড সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এটি জরিমানা এড়িয়ে পুনরায় বন্ড সুবিধা নেওয়ার একটি কৌশল মাত্র। জরিমানার টাকা পরিশোধ না করেই ঢাকার বিভিন্ন দপ্তরে তদবির চালিয়ে যাচ্ছে মালিকপক্ষ—এমন তথ্যও উঠে এসেছে অনুসন্ধানে। সবশেষ ওই কোম্পানি জরিমানার অর্থ পরিশোধ না করায় তাকে লাইসেন্সের কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
নেপথ্যে সিন্ডিকেট
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিজিএমইএ'র এক নেতার দাবি, কাস্টমস ও বিজিএমইএর কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহযোগিতা ছাড়া এত বড় জালিয়াতি সম্ভব নয়। তার অভিযোগ, এই চক্র বন্ড লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানকে সুরক্ষা দেয় এবং পরিদর্শনের আগে গোপনে সংকেত পাঠায়।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, প্রতিষ্ঠানের বর্তমান মালিক মামুনুর রহমান নিজেকে আগের মালিকের রেখে যাওয়া দায়ভার বহনকারী হিসেবে দাবি করলেও, দায়িত্ব নেওয়ার পর নিজে যে কাঁচামাল খালাস করেছেন তার হিসাবও তিনি দিতে পারেননি।
বিকেএমইএ'র এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বন্ড ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে এখন নজরদারি জোরদার করা জরুরি। জরিমানার এই বিপুল অঙ্কের টাকা আদৌ সরকারি কোষাগারে ফিরবে কি না, নাকি নতুন আইনি জটিলতায় বিষয়টি ঝুলে থাকবে—তা নিয়ে সন্দেহ আছে।
বিজিএমইএ'র পরিচালক এস এম আবু তৈয়ব অবশ্য ভিন্নমত পোষণ করেন। তার ভাষ্য, কাস্টমসের হিসাব অতিরঞ্জিত হতে পারে ও কতটুকু পণ্য প্রকৃতপক্ষে রপ্তানি হয়েছে তা যাচাই করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন, রপ্তানি না করে কাঁচামাল খোলা বাজারে বিক্রির প্রমাণ মিললে শাস্তি অবশ্যম্ভাবী। কারণ বন্ড সুবিধার অপব্যবহার কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়।
এসব বিষয়ে জানতে আর্টিস্টিক এ্যাপারেলস লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনোজ কান্তি দাশকে একাধিকবার ফোন করেও সংযোগ পাওয়া যায়নি। বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক মামুনুর রহমান ফোন রিসিভ করেননি, হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো বার্তারও কোনো জবাব দেননি।
তবে প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার (এডমিন) মোহাম্মদ তানভীর বলেন, রপ্তানির বিষয়টি বন্ড কমিশনারেট মনিটরিং করে ও এ ব্যাপারে তার মালিকপক্ষ অবগত। এমন কোনো অপরাধ করা হলে বন্ড আইনগতভাবে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেবে, আমরা তার জবাব দেব। তবে অভিযোগের বিস্তারিত বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলে দাবি করেন।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, চট্টগ্রামের সহকারী কমিশনার সুদীপ্ত মন্ডল সৌরভ বলেন, আর্টিস্টিক এ্যাপারেলস প্রতিষ্ঠানটি এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের জরিমানা পরিশোধ করেনি। নিয়ম না পালন না করায় প্রতিষ্ঠানটির বন্ড লাইসেন্স স্থগিত করা হয়েছে।
ডিআর




Comments