ঢেউ পেরিয়ে এশিয়ান গেমসে ফাতেমা
বাংলাদেশের প্রথম নারী সার্ফারের সঙ্গে জাপানের মঞ্চে কক্সবাজারের মান্নান
ভোরের আলো ফোটার আগেই কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে নেমে পড়েন ফাতেমা আক্তার। পর্যটকদের কোলাহল শুরু হওয়ার আগেই সার্ফবোর্ড হাতে ঢেউয়ের গতিপথ বোঝার চেষ্টা করেন। কখনো শান্ত, কখনো উত্তাল বঙ্গোপসাগরের ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই করেই কেটেছে তার পথচলা। সেই লড়াই এবার তাকে নিয়ে যাচ্ছে এশিয়ার সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসরের মঞ্চে।
২০২৬ সালের এশিয়ান গেমসে সার্ফিং ডিসিপ্লিনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বের সুযোগ পেয়েছেন দেশের প্রথম নারী সার্ফার ফাতেমা আক্তার। তার সঙ্গে পুরুষ বিভাগে অংশ নেবেন কক্সবাজারের আরেক তরুণ সার্ফার মোহাম্মদ মান্নান। সার্ফিংয়ে এবারই প্রথম এশিয়ান গেমসের মঞ্চে অংশ নিচ্ছে বাংলাদেশ।
জাপানের আইচি-নাগোয়া শহরকে কেন্দ্র করে আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে ২০তম এশিয়ান গেমস। সার্ফিং প্রতিযোগিতা হওয়ার কথা রয়েছে আইচি প্রিফেকচারের তাহারা সিটির প্যাসিফিক লং বিচ ও আকাবানে লং বিচে। ২৬ থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর সার্ফিংয়ের ইভেন্ট অনুষ্ঠিত হবে।
ফাতেমার মূল বাড়ি কক্সবাজারের দ্বীপ উপজেলা মহেশখালীতে। জীবিকার প্রয়োজনে পরে তার পরিবার কক্সবাজার শহরে চলে আসে। বর্তমানে তারা কলাতলী এলাকায় বসবাস করছেন। চার ভাই-বোনের মধ্যে তৃতীয় ফাতেমার সার্ফিংয়ে আসার পথটিও ছিল নানা প্রতিকূলতায় ভরা।
আর্থিক সংকটের পাশাপাশি মেয়েদের সমুদ্রে নেমে সার্ফিং করা নিয়েও তাকে শুনতে হয়েছে নানা কথা। শুরুতে পরিবার থেকেও ছিল উদ্বেগ। তবু কোনো বাধাকেই থামার কারণ হতে দেননি ফাতেমা।
ফাতেমা বলেন, “ছোটবেলায় সার্ফারদের পেছন পেছন আমিও সমুদ্রসৈকতে চলে আসতাম। মা আসতে দিতে চাইতেন না। তাই অনেক সময় লুকিয়েই সার্ফিং শেখার জন্য চলে আসতাম। তখন হয়তো জানতাম না সার্ফিং আমাকে কোথায় নিয়ে যাবে।”
তিনি বলেন, “মেয়ে হয়ে সার্ফিং করি বলে অনেকেই আমাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করত। নানা কটু কথার শিকার হয়েছি। কিন্তু থেমে যাইনি। কারণ, আমার একটা স্বপ্ন ছিল।” এখন সেই স্বপ্নের গন্তব্য জাপান।
ফাতেমার সঙ্গে এশিয়ান গেমসে অংশ নিচ্ছেন মোহাম্মদ মান্নান। দুজনই দীর্ঘদিন ধরে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে অনুশীলন করছেন। তাদের প্রস্তুতির দায়িত্বে রয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয় সার্ফিং দলের ন্যাশনাল কোচ রাশেদ আলম।
রাশেদ আলম বলেন, “ফাতেমা ও মান্নান গত এপ্রিল মাসে কক্সবাজার সৈকতে অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় সার্ফিং প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। তাদের এখন প্রয়োজন আরও নিবিড় ও আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ।”
কক্সবাজারের তরুণ সার্ফার ও বাংলাদেশ সার্ফিং অ্যাসোসিয়েশনের মুখপাত্র সাইফুল্লাহ সিফাত বলেন, কক্সবাজারের বালুময় বিস্তীর্ণ সৈকত সার্ফিংয়ের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। সঠিক পরিকল্পনা ও প্রশিক্ষণ অবকাঠামো গড়ে উঠলে এখান থেকে আরও আন্তর্জাতিক মানের সার্ফার তৈরি করা সম্ভব।
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতিভা থাকলেও সার্ফিংয়ের অন্যতম বড় বাধা অর্থনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার অভাব। আন্তর্জাতিক মানের সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণ এবং বিদেশে প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সরকারি ও বেসরকারি সহায়তা।
বাংলাদেশ সার্ফিং অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী বলেন, “আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ। সরকারি সহায়তা পেলে বাংলাদেশের সার্ফাররা বিশ্বমঞ্চে আরও ভালো করতে সক্ষম।”
এশিয়ান গেমসে অংশগ্রহণকে জীবনের অন্যতম বড় অর্জন হিসেবে দেখছেন ফাতেমা। তবে তার স্বপ্ন শুধু নিজের সাফল্যে সীমাবদ্ধ নয়। আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভালো কিছু করে দেশের আরও মেয়েদের সার্ফিংয়ে আগ্রহী করে তুলতে চান তিনি।
কলাতলীর সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা যে তরুণীকে একসময় সার্ফিং শেখার জন্য লুকিয়ে সমুদ্রসৈকতে যেতে হতো, তিনিই এবার এশিয়ান গেমসের মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তার সঙ্গে একই স্বপ্ন নিয়ে জাপানের পথে মোহাম্মদ মান্নান।
কক্সবাজারের ঢেউ থেকে তাদের এই যাত্রা বাংলাদেশের সার্ফিংয়ে নতুন ইতিহাসের সূচনা করতে যাচ্ছে। তবে সেই সম্ভাবনাকে আন্তর্জাতিক সাফল্যে রূপ দিতে প্রয়োজন পরিকল্পিত প্রশিক্ষণ, উন্নত অবকাঠামো ও কার্যকর পৃষ্ঠপোষকতা।
কারণ, কক্সবাজারের ঢেউয়ে প্রতিভার অভাব নেই—প্রশ্ন হলো, সেই প্রতিভাকে বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নেবে কে?
এসএ




Comments