Image description

কৃষিশ্রমিকের পরিচয় পেরিয়ে উৎপাদক, উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে গড়ে উঠছেন জয়পুরহাটের আদিবাসী নারীরা। স্ট্রবেরি চাষ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, মূল্যসংযোজন, সমবায়ভিত্তিক উদ্যোগ ও ই-কমার্সের মাধ্যমে তাদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলক যোগাযোগ বাড়াতে গড়ে তোলা হচ্ছে রিজিওনাল অ্যালাইনমেন্ট সেন্টার।

দেশের গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা ডাহুক বাংলাদেশে অবস্থিত কানাডা হাইকমিশনের কানাডা ফান্ড ফর লোকাল ইনিশিয়েটিভস এর সহযোগিতায় উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনমান ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা উন্নয়নে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পটির বাস্তবায়ন এলাকা হিসেবে জয়পুরহাটকে বেছে নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের কমিউনিটি এনগেজমেন্ট পার্টনার হিসেবে কাজ করছে পিপলস ইউনিয়ন অব দ্য মার্জিনালাইজড ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন। 

আদিবাসী মহিলাদের ক্ষমতায়ন এবং মানসম্পন্ন স্ট্রবেরি-ভিত্তিক এন্টারপ্রাইজ বিকাশের মাধ্যমে বাজারের অ্যাক্সেস বাড়ানো শীর্ষক প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য আদিবাসী নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন। কৃষি উৎপাদন থেকে প্রক্রিয়াজাতকরণ, মূল্যসংযোজন, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও বাজারসংযোগের সমন্বিত কাঠামোর মাধ্যমে আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সক্রিয় অংশীদার হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

বাংলাদেশে সমতল অঞ্চলে ৩৫টিরও বেশি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসবাস। তাদের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৬ লাখ। নৃতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত নানা বাস্তবতায় এসব জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ এখনো পিছিয়ে পড়া ও প্রান্তিক অবস্থানে রয়েছে। বঞ্চনা, অধিকারহীনতা এবং মূলধারার উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সীমিত অংশগ্রহণের কারণে তাদের জীবন ও জীবিকায় সংকট রয়েছে।

জয়পুরহাটে সাম্প্রতিক সময়ে স্ট্রবেরি চাষ বাণিজ্যিকভাবে সম্ভাবনাময় হয়ে উঠেছে। এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে কর্মকার ও পাহানসহ স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নারীদের নিরাপদ স্ট্রবেরি চাষ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং মূল্যসংযোজিত পণ্য তৈরির সঙ্গে যুক্ত করা হবে। একই সঙ্গে প্রজন্মান্তরে অর্জিত তাদের কৃষিজ্ঞান ও ঐতিহ্যবাহী কৃষিচর্চাকে আধুনিক কৃষিবিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও বাজারের চাহিদার সঙ্গে সমন্বয় করা হবে।

প্রকল্পটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য ‘ইন্টিগ্রেটেড সোশাল ক্যাপিটাল’ ধারণার ভিত্তিতে অংশগ্রহণমূলক ও সমবায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা। এর আওতায় আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও তাদের প্রতিবেশী বাঙালি কৃষকসমাজ যৌথভাবে কৃষি, ব্যবসা ও অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন। দীর্ঘদিন ধরে স্বল্প মজুরিতে কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করা আদিবাসী মানুষকে শ্রমদাতা হিসেবে সীমাবদ্ধ না রেখে উৎপাদক, উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি করা হবে।

এ উদ্যোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ রিজিওনাল অ্যালাইনমেন্ট সেন্টার । ডাহুকের উদ্যোগ ও অর্থায়নে প্রস্তাবিত এ কমিউনিটি স্পেস আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলক যোগাযোগের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে দেশের অন্যান্য অঞ্চল ও আন্তর্জাতিক পরিসরের সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ তৈরির লক্ষ্য রয়েছে।

আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নেতৃত্ব ও অংশগ্রহণে একটি ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম তৈরির কাজও চলছে। এর মাধ্যমে জয়পুরহাটের আদিবাসী জনগোষ্ঠীসহ স্থানীয় কৃষকেরা তাদের উৎপাদিত কৃষিপণ্য ও বিভিন্ন সেবা সরাসরি বাজারজাত করতে পারবেন। এতে বিকল্প বাজারে প্রবেশ এবং উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যে সরাসরি সংযোগ তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হবে।

প্রকল্প পরিচালক ও গবেষক মাগফি রেজা সিদ্দিক বলেন, "আমাদের আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলো বাংলাদেশের সমাজ ও জাতিসত্তার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অংশগ্রহণ ছাড়া অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন সম্ভব নয়। আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে তাদের প্রজন্মান্তরে অর্জিত কৃষিজ্ঞান ও নিরাপদ কৃষিচর্চাকে মূল্যসংযোজিত কৃষিপণ্যের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে তা স্থানীয় অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে।"

প্রকল্পটির দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কার্যকর অংশগ্রহণ, সমবায় কাঠামোর টেকসই পরিচালনা, উৎপাদনের ধারাবাহিকতা এবং কার্যকর বাজারসংযোগের ওপর নির্ভর করবে। প্রকল্প শেষ হওয়ার পর স্থানীয় জনগোষ্ঠী নিজেদের নেতৃত্বে উদ্যোগগুলো কতটা ধরে রাখতে পারে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি হবে। কৃষিশ্রমিক থেকে উদ্যোক্তা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠী থেকে স্থানীয় উন্নয়নের সক্রিয় অংশীজন হয়ে ওঠার একটি সম্ভাব্য মডেল হিসেবে জয়পুরহাটের এ উদ্যোগ ভবিষ্যতে ভূমিকা রাখতে পারে।

এসএ