বাজারের কোনো পণ্যেই স্বস্তির খবর নেই। ঈদুল ফিতরের আগে থেকেই অস্থির হওয়া বাজারদর এখনও স্থির হয়নি। উল্টো ঈদের পর নতুন করে উত্তাপ ছড়াচ্ছে চিনি, তেল, পেঁয়াজ, আলু, আদা ও ডিমের দাম। কেজিতে এসব পণ্যের দাম বেড়েছে ১৫ থেকে ২০ টাকা করে।
বিক্রেতারা বরাবরের মতো সরবরাহ সংকটকে দায়ী করলেও সরকারের নজরদারির অভাবকেই দায়ী করছেন সাধারণ ক্রেতা। তাদের মতে, নজরদারি না থাকার সুযোগে অসাধু ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে দাম বাড়াচ্ছে। অপরদিকে অর্থনীতিবিদ ও বাজার-বিশ্লেষকরা মনে করেন, এ মুহূর্তে এসব পণ্যের দাম বাড়ানোর কোনো যৌক্তিকতা নেই। এতে মধ্যবিত্ত ও সীমিত আয়ের লোকজন চরম দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছে বলেও মনে করেন বাজার-সংশ্লিষ্টরা। তাই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ আশা করছেন তারা।
শুক্রবার সময়ের আলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, টানা ছয় মাস ধরে বিশ্ব বাজারে কমেছে সয়াবিন ও পাম অয়েলের দাম। তাই দেশের বাজারে ভোজ্য তেলের দাম কমার কথা। অথচ না কমিয়ে উল্টো দাম বাড়িয়ে দেশের ভোক্তার জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছেন ব্যবসায়ীরা। ভ্যাট ছাড় সুবিধা উঠে যাওয়ার পরদিন থেকেই বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয় সয়াবিন তেলের। এরপর লিটারে এক লাফে ১২ টাকা দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হয়। অথচ আমদানিকারকদের মিলে ও বাজারে যেসব ভোজ্য তেল রয়েছে সেগুলো আগের ওই ভ্যাট ছাড়ের সুবিধায় আমদানি করা। সুতরাং এখন সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানো একেবারেই অমানবিক সিদ্ধান্ত বলে মনে করছেন বাজার-বিশ্লেষকরা। সরকার চিনির দাম বেঁধে দিয়েছে প্রতি কেজি ১০৪ টাকা, অথচ বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকায়। অস্বাভাবিক দাম বাড়িয়েই ক্ষান্ত হননি ব্যবসায়ীরা, সরবরাহ কমিয়ে বাজার থেকে চিনি প্রায় গায়েব করে ফেলেছেন তারা।
চিনির পর ভোজ্য তেল নিয়েও তেলেসমাতি কারবার শুরু করেছেন ব্যবসায়ীরা। আর এ ধরনের কাজে নেতৃত্ব দিচ্ছে ৫-৬টি করপোরেট প্রতিষ্ঠান-যারা মূলত ভোজ্য তেল, চিনি, ডালসহ ভোগ্যপণ্যের সিংহভাগ আমদানি করে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কারণে-অকারণে দেশে একেক সময় একেক পণ্যের দাম বাড়ছে। কোনো পণ্যের দাম বাড়লে তা সহজে কমছে না। দাম বাড়ানোর সুনির্দিষ্ট কারণ না থাকলেও ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ, ডলারের দাম বেড়ে যাওয়া, সময়মতো এলসি খুলতে না পারাসহ বিভিন্ন যুক্তি দাঁড় করিয়ে রেখেছেন ব্যবসায়ীরা। এমনকি সরবরাহ সংকট দেখাতে অনেক সময় বাজার থেকে পণ্য হাওয়া করে দিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। এসব কাজে শক্ত ভিত তৈরি করে রেখেছে অসাধু সিন্ডিকেট। তবে এ সিন্ডিকেট ভাঙতে বিভিন্ন সময় সরকারি উদ্যোগ দেখা গেলেও খুব বেশি কার্যকর হতে দেখা যায়নি। ফলে দ্রব্যমূল্যের এমন লাগামহীন উল্লম্ফনে নাভিশ্বাস উঠছে সাধারণ ক্রেতার।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে ব্যবসায়ীদের সদিচ্ছা থাকতে হবে। সদিচ্ছার অভাবই আমাদের দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধির প্রধানতম কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অনেকে এটিকে আরও বেশি মুনাফার উপায় হিসেবে ব্যবহার করে থাকেন।
প্রান্তিক পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা যদি মজুদ করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে থাকেন তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। তবে যারা সত্যিকার অর্থেই বৃহৎভাবে দাম বাড়াতে কলকাঠি নাড়ছেন তাদের না ধরলে সমস্যার সমাধান হবে না। সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, সিন্ডিকেট ভাঙতে সরকারকে আরও কঠোর আইন প্রণয়ন করতে হবে। বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সবার একসঙ্গে কাজ করতে হবে। যেসব অসাধু সিন্ডিকেট অতিমুনাফার লোভে নিত্যপণ্যের দাম অযৌক্তিকভাবে বাড়াচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে-এমনটাই আমাদের প্রত্যাশা।




Comments