Image description

পীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স । ফাইল ছবি

ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলায় উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে বিষপানে আত্মহত্যার চেষ্টার ঘটনা। পারিবারিক কলহ, দাম্পত্য সংকট, প্রেমঘটিত জটিলতা থেকে শুরু করে বর্তমানে অনলাইন জুয়া ও মাদকাসক্তির করাল গ্রাসে নারী-পুরুষ উভয়ের মধ্যেই এই আত্মঘাতী প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

পীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত গত পাঁচ মাসে অন্তত ৭৭ জন বিষপান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। এর মধ্যে ৩৭ জন নারী এবং ৪০ জন পুরুষ। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কয়েকজনের মৃত্যুও হয়েছে।

তদন্ত ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বিষপান করা নারীদের ক্ষেত্রে স্বামীর নির্যাতন, শাশুড়ি-ননদের সঙ্গে বিরোধ, পারিবারিক অশান্তি, মা-বাবার ওপর অভিমান, তুচ্ছ শাড়ি বা মোবাইল ফোন কিনে না দেওয়া এবং জোরপূর্বক বিয়ের চেষ্টার মতো কারণগুলো প্রধান। অন্যদিকে, পুরুষদের আত্মহত্যার চেষ্টার পেছনে কাজ করছে ভিন্ন ও নতুন কিছু সামাজিক ব্যাধি। বিশেষ করে অনলাইন জুয়ায় সর্বস্ব হারানো, মাদক ক্রয়ের টাকা জোগাড় করতে না পারা, স্ত্রীর তালাক বা ছেড়ে চলে যাওয়া এবং মা-বাবার কাছে মোটরসাইকেল বা দামী মোবাইল চেয়ে না পাওয়ার ক্ষোভ থেকে পুরুষেরা বিষপানের পথ বেছে নিচ্ছেন।

আইনজীবী আবু সায়েম বলেন, “আগে সাধারণত নারীদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি থাকলেও বর্তমানে পীরগঞ্জে পুরুষদের সংখ্যা বাড়ছে। মাদক, অনলাইন জুয়া ও সামাজিক অপমানের মতো কারণগুলো এর জন্য দায়ী।”

পীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে কর্মরত আনোয়ার হোসেন জানান, বেশিরভাগ রোগী দানাদার ও ঘাস মারার বিষপান করে হাসপাতালে আসেন। তবে হাসপাতালে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও আলাদা 'ওয়াশ রুম' না থাকায় এই ধরনের জরুরি রোগীদের চিকিৎসা দিতে হিমশিম খেতে হয়।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. ওয়ারিস ইয়াজদানি বলেন, “গত পাঁচ মাসে বিষপানের রোগীর সংখ্যা অস্বাভাবিক বেড়েছে। অনেককে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য জেলা সদর বা দিনাজপুর মেডিকেল কলেজে পাঠানো হয়। দ্রুতই হাসপাতালে আলাদা ওয়াশ রুমের ব্যবস্থা করা হবে।”

শিক্ষাবিদ ও সংস্কৃতিকর্মী অধ্যাপক মনোতোষ কুমার দে এই পরিস্থিতির সামাজিক ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, “পারিবারিক বন্ধন শিথিল হওয়া এবং মাদক ও অনলাইন জুয়ার বিস্তার মানুষকে মানসিকভাবে দুর্বল করে দিচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু চিকিৎসা নয়, পরিবার ও সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ এবং ব্যাপক সচেতনতা প্রয়োজন।”

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, আত্মহত্যা প্রতিরোধে তৃণমূল পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার প্রসার এবং সামাজিক মূল্যবোধের চর্চা এখন সময়ের দাবি।

মানবকণ্ঠ/ডিআর