একটি সেতু-যা বদলে দিতে পারত হাজারো মানুষের জীবন। কমিয়ে দিতে পারত বছরের পর বছর ধরে চলা যাতায়াতের দুর্ভোগ। কিন্তু সাত বছর পেরিয়ে গেলেও সেই স্বপ্ন আজও অধরা। নির্মাণাধীন নলাম সেতু এখন স্থানীয়দের কাছে উন্নয়নের প্রতীক নয়, বরং অবহেলা, ধীরগতি ও প্রশাসনিক জটিলতার এক নির্মম উদাহরণ। ফলে বংশী নদীর দুই তীরের অন্তত ১০ গ্রামের হাজারো মানুষ প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে খেয়া নৌকায় পারাপার করতে বাধ্য হচ্ছেন।
শনিবার (১৮ জুলাই) সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়,সাভার উপজেলার আশুলিয়ার বংশী নদীর তীরে অবস্থিত মাইঝাল, পাইছাল, উনাইল, ধামসোনা, গোপালবাড়ীসহ অন্তত ১০টি গ্রামের মানুষের কাছে নলাম সেতু শুধু একটি অবকাঠামো নয়, এটি ছিল উন্নত যোগাযোগ, নিরাপদ যাতায়াত এবং অর্থনৈতিক মুক্তির স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের অপেক্ষা যেন শেষই হচ্ছে না।
বর্তমানে নদী পারাপারের একমাত্র ভরসা একটি খেয়া নৌকা। প্রতিদিন স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, কৃষক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে নদী পার হতে হয়। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় কোনো অসুস্থ রোগী কিংবা প্রসূতিকে হাসপাতালে নেওয়ার সময়। অনেক ক্ষেত্রে একটি নৌকার অপেক্ষাই জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের আন্দোলন ও দাবির মুখে ২০১৯ সালের ২১ জুলাই ৮২০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ২৪ ফুট প্রস্থের নলাম সেতুর নির্মাণকাজের উদ্বোধন করা হয়। প্রকল্পটির ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ২১ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। ২০২২ সালের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও পরবর্তীতে তিন দফা সময় বাড়িয়ে ২০২৬ সাল পর্যন্ত নেওয়া হয়। কিন্তু এখনো সেতুর নির্মাণকাজ অসম্পূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে কাজ প্রায় বন্ধ থাকায় এলাকাবাসীর মনে দেখা দিয়েছে চরম হতাশা।
দীর্ঘদিনের এই দুর্ভোগের প্রতিবাদে সম্প্রতি নলাম সেতুর সামনে মানববন্ধন করেছেন এলাকাবাসী ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ। তাদের একটাই দাবি-অবিলম্বে সেতুর নির্মাণকাজ শেষ করে ১০ গ্রামের মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান ঘটাতে হবে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কার্যকর তদারকির অভাব এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বহীনতার কারণেই বছরের পর বছর ধরে প্রকল্পটি ঝুলে আছে।
এই গ্রামের বাসিন্দা ও ঢাকা জেলা উত্তর ছাত্রদলের সভাপতি মোহাম্মদ তমিজ উদ্দিন বলেন, “দীর্ঘ সাত বছর আগে নলাম সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হলেও আজও তা শেষ হয়নি। একটি সেতুর অভাবে ১০ গ্রামের হাজারো মানুষ প্রতিদিন চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। শিক্ষার্থী, কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ থেকে শুরু করে জরুরি রোগী-সবাইকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে খেয়া নৌকায় চলাচল করতে হচ্ছে। আমরা এলাকাবাসী সেতুর কাজ দ্রুত শেষ করার দাবিতে মানববন্ধন করেছি, সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। তাই দ্রুত সময়ের মধ্যে নির্মাণকাজ পুনরায় শুরু করে শেষ না করা হলে ১০ গ্রামের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে আরও কঠোর আন্দোলনের কর্মসূচি দিতে বাধ্য হব।”
এব্যাপারে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স কহিনুর এন্ড খোশেদা এন্টারপ্রাইজ (জেভি)-এর বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। ফলে এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে সাভার উপজেলা এলজিইডির কর্মকর্তা মিনারুল ইসলাম বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে না পারায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স কহিনুর এন্ড খোশেদা এন্টারপ্রাইজ (জেভি)-কে একাধিকবার নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ ও কার্যাদেশ বাতিলের জন্য নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সেতুর অবশিষ্ট কাজ সম্পন্ন করতে নতুন করে টেন্ডার আহ্বানেরও প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণকাজ বন্ধ থাকার কারণ খতিয়ে দেখা হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত কাজ পুনরায় শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।




Comments