৩১ লাখ টাকা হারিয়েও সন্তানের লাশের অপেক্ষায় মা
দালালদের ফাঁদে লিবিয়ায় প্রাণ গেল যুবকের
ইতালি পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে মাদারীপুরের এক যুবককে লিবিয়ায় আটকে রেখে নির্যাতন ও হত্যার অভিযোগ উঠেছে মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে। ছেলেকে বিদেশে পাঠাতে গিয়ে প্রায় ৩১ লাখ টাকা হারিয়েও সন্তানকে জীবিত ফিরে পাননি বৃদ্ধা মা। এখন ছেলের লাশ দেশে ফিরিয়ে এনে নিজ হাতে দাফন করার অপেক্ষায় দিন গুনছেন তিনি। এ ঘটনায় জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়েছে নিহতের পরিবার।
অনুসন্ধান ও ভুক্তভোগী পরিবারের সূত্রে জানা যায়, মাদারীপুর সদর উপজেলার চরগোবিন্দপুর এলাকার মৃত করিম সরদারের ছেলে দেলোয়ার সরদার, তার স্ত্রী সোহাগী বেগম এবং দালাল সুমন সরদার ২৫ লাখ টাকার বিনিময়ে মাসুম আকন (২৫) নামের এক যুবককে বৈধ স্পন্সর ভিসায় ইতালি পাঠানোর আশ্বাস দেন।
চুক্তি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৮ আগস্ট প্রথম দফায় ১০ লাখ টাকা দেওয়া হয়। এক সপ্তাহ পর ভিসা হয়েছে জানিয়ে ১৫ আগস্ট আরও ১০ লাখ টাকা এবং বিমান ভাড়া বাবদ বিবাদীদের ব্যাংক হিসাবে আরও ১ লাখ টাকা জমা দেওয়া হয়।
এরপর ৭ সেপ্টেম্বর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ইতালির উদ্দেশ্যে রওনা হন মাসুম। পরদিনই দালালরা তার পরিবারকে জানায়, মাসুম ইতালিতে পৌঁছে গেছেন। কিন্তু এর ১০ দিন পর ইমো অ্যাপের মাধ্যমে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে মাসুম জানান, তাকে ইতালিতে নেওয়া হয়নি। সৌদি আরব ও মিশর হয়ে তাকে লিবিয়ার একটি বন্দিশালায় আটকে রাখা হয়েছে।
মাসুমকে মুক্ত করতে দালালরা পরিবারের কাছে আরও ১০ লাখ টাকা দাবি করে। উপায়ান্তর না দেখে গত ১৮ সেপ্টেম্বর নড়াইলের ইসলামী ব্যাংকের ‘মরিয়ম ট্রেডার্স’ নামের একটি অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে আরও ৯ লাখ ৯০ হাজার টাকা পাঠায় পরিবার। এতে দালালদের দেওয়া মোট টাকার পরিমাণ দাঁড়ায় ৩০ লাখ ৯০ হাজার টাকা।
তবে এত টাকা দেওয়ার পরও থামেনি কথিত মানবপাচারকারী চক্রটি। তারা আরও ৫ লাখ টাকা দাবি করে। পরিবার ওই টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে লিবিয়ায় থাকা মাসুমের ওপর অমানবিক শারীরিক নির্যাতন চালানো হয় বলে অভিযোগ স্বজনদের।
পরিবারের দাবি, একপর্যায়ে দালাল চক্রের নির্দেশে লিবিয়ায় মাসুমকে হত্যা করা হয়।
ঘটনার খবর পাওয়ার পর নিহতের পরিবারের সদস্যরা অভিযুক্তদের বাড়িতে গিয়ে টাকা ফেরত এবং মাসুমের লাশ দেশে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানান। এ সময় তাদের প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেছে পরিবার।
পরে বাধ্য হয়ে ভুক্তভোগী পরিবার মাদারীপুরের বিজ্ঞ মানবপাচার ট্রাইব্যুনাল আদালতে পাঁচজনকে আসামি করে মামলা দায়ের করে।
মামলার আসামিরা হলেন—সুমন সরদার, দেলোয়ার সরদার, সোহাগী বেগম, সিমু আক্তার ও শফিকুল ইসলাম।
নিহতের বড় ভাই মামুন আকন বলেন, “ধার-দেনা ও সুদে টাকা এনে দালালদের হাতে তুলে দিয়েছিলাম ভাইটাকে বাঁচানোর জন্য। তারা টাকাও নিল, আবার আমার ভাইটাকেও মেরে ফেলল। আমরা অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই। পাশাপাশি সরকারের কাছে দাবি, আমার ভাইয়ের লাশ যেন দ্রুত দেশের মাটিতে এনে দাফন করতে পারি।”
নিহতের বৃদ্ধ মা কুট্টি বিবি (৭২) কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার সম্পদ গেছে, টাকা গেছে, সন্তান গেছে। এই বয়সে সবকিছু হারিয়ে আমি নিঃস্ব। আমি শুধু আমার ছেলের লাশটা দেখতে চাই, দেশের মাটিতে তাকে কবর দিতে চাই। আর এই ঘটনায় যারা জড়িত, তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।”
ছেলেকে হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়া এই মায়ের একমাত্র আকুতি—দ্রুত যেন তার সন্তানের মরদেহ লিবিয়া থেকে দেশে ফিরিয়ে এনে শেষবারের মতো দেখতে এবং নিজ হাতে দাফন করতে পারেন।
এসএ




Comments