বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ারে তিন উদ্ভাবনী প্রজেক্ট নিয়ে ডুয়েটের অংশগ্রহণ
দেশের উদ্ভাবন, গবেষণা, প্রযুক্তি ও উদ্যোক্তা কার্যক্রমকে একটি সমন্বিত জাতীয় প্ল্যাটফর্মে উপস্থাপন এবং সরকারি-বেসরকারি খাত, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, উদ্ভাবক, উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কার্যকর সংযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬’-এ অংশগ্রহণ করেছে ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট), গাজীপুর।
রাজধানীর বিজয় সরণির নভোথিয়েটারে ‘ইনোভেট টু মার্কেট’ প্রতিপাদ্যে ১২ থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর তিন দিনব্যাপী এ মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এতে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং সংশ্লিষ্ট দুটি এবং এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং সংশ্লিষ্ট একটি—মোট তিনটি উদ্ভাবনী প্রজেক্ট উপস্থাপন করছে ডুয়েটের প্রতিনিধিদল।
ডুয়েটের উপস্থাপিত প্রজেক্টগুলো হলো—কাশফুল ও তুলার সমন্বয়ে টেকসই সুতা তৈরি, গার্মেন্টস শিল্পে লবণ-ক্ষার ছাড়া কাপড় রংকরণ এবং জৈব বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদনের জন্য ব্রিকুয়েট মেশিনের উন্নয়ন।
টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহজালাল খন্দকারের তত্ত্বাবধানে পিএইচডি গবেষক ইয়াসিন আরাফাতের গবেষণায় গ্রামবাংলায় সহজলভ্য কাশফুলের আঁশকে তুলার আংশিক বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করে সুতা তৈরির সম্ভাবনা যাচাই করা হয়েছে।
গবেষণাটির মূল লক্ষ্য ছিল—কাশফুলের আঁশ শিল্প পর্যায়ে সুতা তৈরিতে কতটা ব্যবহারযোগ্য, কোন অনুপাতে কাশফুল ও তুলা মেশালে ভালো মানের সুতা পাওয়া যায় এবং এর মাধ্যমে উৎপাদন খরচ কতটা কমানো সম্ভব, তা নির্ধারণ করা। গবেষণায় সুতার শক্তি, প্রসারণ, সমতা, হেইরিনেস এবং বিভিন্ন ত্রুটিসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
শিল্প পর্যায়ের ওপেন-এন্ড রোটর স্পিনিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিভিন্ন অনুপাতে কাশফুল ও তুলার মিশ্রণে সুতা তৈরি করা হয়। পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায়, তুলার সঙ্গে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত কাশফুল মিশিয়ে তৈরি সুতা কাপড় তৈরির জন্য উপযোগী। তবে ৪০ শতাংশ কাশফুলের মিশ্রণেও বাণিজ্যিকভাবে গ্রহণযোগ্য মানের সুতা পাওয়া গেছে।
পরিসংখ্যানভিত্তিক বিশ্লেষণে ২৭ দশমিক ৭ শতাংশ কাশফুল ও ৭২ দশমিক ৩ শতাংশ তুলার মিশ্রণকে সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ অনুপাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ অনুপাত সুতার মান ও উৎপাদন খরচ—উভয় দিক থেকেই উপযোগী। এ পদ্ধতিতে তৈরি সুতার উৎপাদন খরচ প্রায় ১১ দশমিক ৭ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। অর্থাৎ, প্রতি কেজি সুতার উৎপাদন খরচ প্রায় ২ দশমিক ৯৮ মার্কিন ডলার থেকে কমে ২ দশমিক ৬৩ ডলারে নামিয়ে আনা সম্ভব।
গবেষকদের মতে, কাশফুল সেচ, সার বা কীটনাশক ছাড়াই স্বাভাবিকভাবে জন্মে। ফলে পানিনির্ভর তুলা চাষের ওপর চাপ কমিয়ে পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী কাঁচামালের নতুন উৎস হিসেবে কাশফুলের আঁশের ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে।
টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল হান্নানের তত্ত্বাবধানে নুসরাত জাহান খানমের করা দ্বিতীয় প্রজেক্টটি কাপড় রং করার প্রক্রিয়া সংক্রান্ত। কাপড় রং করার প্রচলিত পদ্ধতিতে ব্যবহৃত লবণ ও ক্ষারের বিকল্প হিসেবে গবেষকরা একটি কেমিক্যালমুক্ত প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন। এ প্রযুক্তিতে শুধু গরম পানি ব্যবহার করেই তুলা রং করা সম্ভব।
গবেষকদের দাবি, এ পদ্ধতিতে রাসায়নিকের খরচ সম্পূর্ণ সাশ্রয় হওয়ার পাশাপাশি ৬৬ শতাংশ পানির অপচয় রোধ এবং ৭৩ শতাংশ পর্যন্ত দূষিত বর্জ্যপানি কমানো সম্ভব। একই রঙের পানি টানা ১০ বার পর্যন্ত পুনর্ব্যবহার করা যায়। ফলে দেশের টেক্সটাইল শিল্পে এ প্রযুক্তি উল্লেখযোগ্য সাশ্রয় বয়ে আনতে পারে।
ইনস্টিটিউট অব এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাহবুবুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে সহযোগী হিসেবে শেখ রেজওয়ানুল হকের করা তৃতীয় প্রজেক্টটি খোলা জায়গায় ফেলে রাখা ময়লা-আবর্জনার পরিবেশগত সমস্যা সমাধানসংক্রান্ত।
এ প্রজেক্টের গবেষকরা তৈরি করেছেন ‘ব্রিকুয়েট মেশিন’। মেশিনটি পচনশীল ও দাহ্য আবর্জনাকে মাত্র তিনটি সহজ ধাপে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের উপযোগী কয়লায় রূপান্তর করতে পারে। গবেষকদের মতে, মেশিনটির ব্যবহার একদিকে শহরের বায়ুদূষণ ও বর্জ্য কমাতে সহায়তা করবে, অন্যদিকে স্বল্পমূল্যে জ্বালানি সরবরাহের মাধ্যমে গ্রামীণ ও ক্ষুদ্র শিল্পে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
ইনোভেশন ফেয়ারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নেন ডুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইকবাল। তিনি ডুয়েটের স্টল পরিদর্শন করেন।
এ সময় তিনি বলেন, “বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬-এ ডুয়েটের তিনটি উদ্ভাবনী প্রজেক্ট উপস্থাপন করার সুযোগ পেয়ে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত। গার্মেন্টস শিল্পের কাঁচামাল সুতা তৈরিতে কাশফুলের ব্যবহার উপযোগিতা, লবণ-ক্ষারমুক্ত কাপড় রংকরণ এবং বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদনের এই গবেষণাগুলো প্রমাণ করে যে, আমাদের গবেষকরা দেশীয় সমস্যার সমাধানে পরিবেশবান্ধব ও লাগসই প্রযুক্তি উদ্ভাবনে সক্ষম।
“‘ইনোভেট টু মার্কেট’ প্রতিপাদ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ডুয়েট সবসময় একাডেমিক গবেষণাকে বাস্তব প্রয়োগ ও বাণিজ্যিকীকরণের পথে এগিয়ে নিতে বদ্ধপরিকর। আমি বিশ্বাস করি, এই ধরনের প্ল্যাটফর্ম বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পখাত ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সেতুবন্ধন তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এই অর্জনের জন্য আমি সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও গবেষকদের আন্তরিক অভিনন্দন জানাই এবং ভবিষ্যতেও এমন উদ্ভাবনী উদ্যোগ অব্যাহত রাখার প্রত্যাশা করি।”
গত শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) সকালে রাজধানীর বিজয় সরণির নভোথিয়েটারে ‘ইনোভেট টু মার্কেট’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে তিন দিনব্যাপী এ মেলার উদ্বোধন করা হয়। মেলায় সরকারি-বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, ৭৩টি পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, স্বতন্ত্র গবেষক, শিক্ষার্থী, নতুন স্টার্টআপ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান (এসএমই) এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা অংশ নিয়েছেন।
মেলায় প্রযুক্তি, ব্যবসা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও পরিবেশসহ বিভিন্ন খাতের এক হাজারের বেশি নতুন ও সম্ভাবনাময় উদ্ভাবন প্রদর্শিত হচ্ছে।
এসএ




Comments