Image description

কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ), নো ডেভেলপমেন্ট জোন ও সংরক্ষিত পর্যটন এলাকায় রাস্তা নির্মাণের ওপর হাইকোর্টের দেওয়া নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ। ফলে সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে হোটেল সায়মন পর্যন্ত প্রস্তাবিত সড়কের নির্মাণকাজ আপাতত বন্ধই থাকছে।

একই সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের অবকাশ শেষে দুই সপ্তাহের মধ্যে এ বিষয়ে জারি করা রুল নিষ্পত্তির নির্দেশ দিয়েছেন সর্বোচ্চ আদালত।

সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ এ আদেশ দেন। আদালতে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) পক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন অ্যাডভোকেট মিনহাজুল হক চৌধুরী ও সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল।

বেলা জানিয়েছে, কক্সবাজার পৌরসভা ‘নগর উন্নয়ন ও নগর শাসন প্রকল্প’-এর আওতায় জাইকার অর্থায়নে সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে হোটেল সায়মন পর্যন্ত প্রায় ১ দশমিক ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। প্রকল্পের জন্য সৈকতের বিশাল এলাকা ভরাট করে রাস্তা নির্মাণের কাজ শুরু হলে পরিবেশবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দেয়।

অভিযোগ রয়েছে, সড়ক নির্মাণের প্রস্তুতি হিসেবে সৈকতের বহু বছরের বালিয়াড়ি এক্সকাভেটর দিয়ে কেটে ও সমতল করা হয়েছে। এতে উপকূলকে ঝড়-জলোচ্ছ্বাস ও ঢেউয়ের আঘাত থেকে প্রাকৃতিকভাবে সুরক্ষা দেওয়া বালিয়াড়ির পাশাপাশি সাগরলতা, লাল কাঁকড়া এবং বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

পরিবেশবাদীদের মতে, কক্সবাজারের বালিয়াড়ি শুধু পর্যটকদের হাঁটার জায়গা নয়; এটি সৈকতের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। বালিয়াড়ি নষ্ট হলে উপকূলীয় পরিবেশের ভারসাম্য যেমন বিঘ্নিত হতে পারে, তেমনি ভবিষ্যতে সৈকত ক্ষয় ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

এ অবস্থায় সৈকতের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় জনস্বার্থে রিট করে বেলা। আবেদনে বলা হয়, সমুদ্র সৈকতের প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় স্থাপনা নির্মাণ থেকে বিরত থাকা এবং বিদ্যমান অবৈধ স্থাপনা অপসারণের বিষয়ে এর আগেও সুপ্রিম কোর্ট একাধিক রায় ও আদেশ দিয়েছেন। এসব নির্দেশনার পরও সৈকতের সংরক্ষিত এলাকায় রাস্তা নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে গত ২ সেপ্টেম্বর বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি আজিজ আহমেদ ভূঞার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ সড়ক নির্মাণের সব কার্যক্রমের ওপর আট সপ্তাহের নিষেধাজ্ঞা দেন এবং রুল জারি করেন।

রুলে কক্সবাজার পৌরসভা কর্তৃক ওই সড়ক নির্মাণ এবং তা প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতা কেন সংবিধান ও প্রচলিত আইনের পরিপন্থী, আইনগত কর্তৃত্ববিহীন, জনস্বার্থবিরোধী, বিধিবহির্ভূত ও বেআইনি ঘোষণা করা হবে না—তা জানতে চাওয়া হয়। একই সঙ্গে ইতোমধ্যে নির্মিত সড়কের অংশবিশেষ অপসারণ করে সমুদ্র সৈকত, বালিয়াড়ি ও এর জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধারের নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, তাও জানতে চেয়েছেন হাইকোর্ট।

হাইকোর্টের এ আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ। শুনানি শেষে সোমবার আপিল বিভাগ হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখেন।

আইনজীবী মিনহাজুল হক চৌধুরী বলেন, "হাইকোর্টের দেওয়া নিষেধাজ্ঞার আদেশ আপিল বিভাগ বহাল রেখেছেন। সুপ্রিম কোর্টের অবকাশকালীন ছুটি শেষ হওয়ার পর দুই সপ্তাহের মধ্যে রুলটি শুনানি ও নিষ্পত্তির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।"

আপিল বিভাগের এ আদেশের ফলে কক্সবাজার সৈকতের সংরক্ষিত এলাকায় বিতর্কিত সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ এখন আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে। একই সঙ্গে বালিয়াড়ি, সৈকতের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার প্রশ্নটিও নতুন করে সামনে এসেছে।

ডিআর