মোহনগঞ্জে শৈলজারঞ্জন সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে নেই সংস্কৃতিচর্চা
নেই পর্যটকের আনাগোনা
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নেত্রকোনায় আসেননি। তবু ‘উৎসর্গ’ কবিতায় তিনি লিখেছিলেন—“বেড়ার ওপারে মৌসুমি ফুলে রঙের স্বপ্ন বোনা, চেয়ে দেখে দেখে জানালার নাম রেখেছি—‘নেত্রকোণা’।”
সেই নেত্রকোনার সঙ্গে কবির যোগসূত্র রবীন্দ্রসংগীতাচার্য শৈলজারঞ্জন মজুমদার। তাঁর জন্মভিটা নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ পৌরসভা থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরে বাহাম গ্রামে। শৈলজারঞ্জনের স্মৃতি ও সংস্কৃতিচর্চাকে কেন্দ্র করে প্রায় তিন বছর আগে সেখানে গড়ে তোলা হয় শৈলজারঞ্জন মজুমদার সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই কেন্দ্র ঘিরে স্বপ্ন ছিল—এখানে নিয়মিত রবীন্দ্রসংগীতের চর্চা, লোকসংস্কৃতির গবেষণা, সাংস্কৃতিক প্রশিক্ষণ ও হাওরাঞ্চলের মানুষের মিলনমেলা বসবে। কিন্তু বাস্তবে সেই স্বপ্ন অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে। বিশাল অবকাঠামো থাকলেও নেই নিয়মিত সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, নেই দর্শনার্থীর আনাগোনা। অনেকটা অচল অবস্থায় পড়ে আছে কেন্দ্রটি।
গত ৬ সেপ্টেম্বর সরেজমিনে দেখা যায়, সোয়া দুই একর জায়গাজুড়ে নির্মিত বিশাল ভবনটি নীরব পড়ে আছে। চারপাশে জমেছে ঘাস-লতা। গ্রন্থাগার ও মহড়া কক্ষ অপরিষ্কার। মিলনায়তনও ফাঁকা। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় লিফট অচল হয়ে পড়ে আছে। পাঁচটি এসি নষ্ট। ৫৩টি বাতিও জ্বলছে না।
কেন্দ্রের দেখভালের দায়িত্বে থাকা টেকনিশিয়ান মোহাম্মদ সামিউজ্জামান ইমন কক্ষগুলো খুলে দেখান। বর্তমানে তিনিই কেন্দ্রটির অধিকাংশ কাজ সামলাচ্ছেন। তিনি জানান, দীর্ঘদিন ব্যবহার না করার কারণে বেশ কিছু সরঞ্জাম অকেজো হয়ে পড়েছে। মেরামত করা হলে সেগুলো সচল করা সম্ভব।
লুট হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কয়েক দফায় কেন্দ্রটিতে লুটপাটের ঘটনা ঘটে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। এ সময় ফ্যান, চেয়ার-টেবিল, ঝাড়বাতি, সিসিটিভি ক্যামেরা, সাউন্ড বক্স, আইপিএস, কম্পিউটার, বাদ্যযন্ত্র, বজ্রনিরোধক যন্ত্র ও অডিটোরিয়ামের কন্ট্রোল বক্সসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম নিয়ে যাওয়া হয়।
স্থানীয়দের উদ্যোগে পরে কিছু জিনিস ফেরত এলেও লুটপাটের সঙ্গে কারা জড়িত, তা এখনো শনাক্ত করা যায়নি। লুট হওয়া সরঞ্জাম উদ্ধারে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগও নেই বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো অভিযোগ দায়ের হয়েছে কি না, সে বিষয়েও স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
৫০ কোটি টাকার অবকাঠামো, কার্যক্রম নেই
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে গণপূর্ত বিভাগের মাধ্যমে ২০১৮ সালে কেন্দ্রটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। ভবন নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৩৫ কোটি ১৫ লাখ টাকা। জমি অধিগ্রহণে প্রায় ৫ কোটি এবং সংযোগ সড়ক নির্মাণে প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রকল্পটির ব্যয় প্রায় ৫০ কোটি টাকা। ২০২৩ সালের ১ মার্চ কেন্দ্রটির কার্যক্রম শুরু হয়। প্রথম দিকে কয়েকটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হলেও জুলাই বিপ্লবের পর থেকে সেখানে আর কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়নি।
কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, কেন্দ্রটি প্রতিদিন বেলা ২টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে। প্রবেশমূল্য ২০ টাকা। কিন্তু দর্শনার্থীর সংখ্যা খুবই কম। কেন্দ্রের দর্শনার্থী রেজিস্টার অনুযায়ী, গত ৫ সেপ্টেম্বর ৪০ জন দর্শনার্থী সেখানে আসেন। পরদিন ৬ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দর্শনার্থী এসেছেন মাত্র ১২ জন। জনপ্রতি ২০ টাকা প্রবেশমূল্য হিসেবে দুই দিনে আয় হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৪০ টাকা।
৩৪ পদের বিপরীতে কর্মী মাত্র দুজন
কেন্দ্রটির ৩৪টি পদের বিপরীতে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে পাঁচজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। ৫ আগস্টের পর তাদের মধ্যে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র দুজন। তারা হলেন টেকনিশিয়ান মোহাম্মদ সামিউজ্জামান ইমন ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী জয় হরিজন।
ফলে বিশাল এই সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, দর্শনার্থী ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য কার্যক্রম চালাতে গিয়ে তৈরি হয়েছে জনবল সংকট।
আরও জানা গেছে, ২১ সদস্যের পরিচালনা কমিটি থাকলেও গত তিন বছরে কমিটির কোনো সভা অনুষ্ঠিত হয়নি। কেন্দ্রটির মাসিক পরিচালন ব্যয় প্রায় ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা। অন্যদিকে কেন্দ্রের নিজস্ব তহবিলে প্রায় এক কোটি টাকা পড়ে আছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
‘ভবন দিয়ে সংস্কৃতিকেন্দ্র বাঁচে না’
কেন্দ্রটির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীদের মধ্যে হতাশা রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সংস্কৃতিকর্মী বলেন, “মানুষ এখন অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে পড়েছে। দেশীয় সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ দিন দিন কমছে। মোবাইল ও ইন্টারনেটের প্রতি মানুষের আসক্তিও এর অন্যতম কারণ। বিশেষ করে যুবক ও শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ অনলাইন বিনোদনে ব্যস্ত।” নেত্রকোনা জেলা উদীচীর সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান খান বলেন, “ভবন আর মিলনায়তন দিয়ে কেন্দ্র বাঁচে না। নিয়মিত অনুষ্ঠান, প্রশিক্ষণ এবং শিল্পীদের আনাগোনা লাগে। এখানে এখন সেই প্রাণটাই নেই।”
শৈলজারঞ্জন মজুমদারের জীবনীকার সঞ্জয় সরকার বলেন, “আমরা ভেবেছিলাম এটি সংস্কৃতিচর্চার একটি বড় কেন্দ্র হবে। কিন্তু কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় তা হয়নি। সরকারের উচিত প্রয়োজনীয় লোকবল দিয়ে দ্রুত কেন্দ্রটি সচল করা।”
দ্রুত মেরামতের আশ্বাস
মোহনগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও শৈলজারঞ্জন মজুমদার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত সদস্য সচিব আমিনা খাতুন বলেন, “সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সভাপতি ডিসি মহোদয়। সদস্য সচিব না থাকায় আমি ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। এখানে দুইজন লোক কর্মরত আছেন। শূন্য পদের বিপরীতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা পেলে জনবল নিয়োগ দেওয়া হবে।”
তিনি আরও বলেন, “কেন্দ্রের লিফটসহ অনেক কিছু নষ্ট হয়ে গেছে। ইতোমধ্যে এগুলোর তালিকা কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। খুব দ্রুত এগুলো মেরামত করা হবে। জুলাই বিপ্লবের পর থেকে সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়নি। তবে বড় ধরনের কোনো অনুষ্ঠান হলে সেখানে আয়োজন করা হবে।” জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, “কেন্দ্রটি কীভাবে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যায়, তা নিয়ে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা হচ্ছে।”
শৈলজারঞ্জন মজুমদার
রবীন্দ্রসংগীতাচার্য শৈলজারঞ্জন মজুমদার ১৯০০ সালের ১৯ জুলাই নেত্রকোনার মোহনগঞ্জের বাহাম গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা বনমালী কিশোর দত্ত মজুমদার এবং মা সরলা সুন্দরী। ১৯১৮ সালে নেত্রকোনা দত্ত হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক এবং ১৯২৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে শান্তিনিকেতনে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে সংগীত শিক্ষা নেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে ‘গীতাম্বুধি’ উপাধিতে ভূষিত করেন। শৈলজারঞ্জন মজুমদার পরবর্তীকালে রবীন্দ্রসংগীতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাধক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
শৈলজারঞ্জন মজুমদার মূলত লেখক হিসেবে নয়, রবীন্দ্রসংগীতের শিক্ষক, গবেষক, সংগ্রাহক ও সংগীতাচার্য হিসেবে বেশি পরিচিত। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে— রবীন্দ্রসংগীতের স্বরলিপি ও সংগীতবিষয়ক লেখা ‘গানের ভুবনে রবীন্দ্রনাথ’ — রবীন্দ্রসংগীত ও রবীন্দ্রনাথের সংগীতভাবনা নিয়ে তাঁর স্মৃতি ও বিশ্লেষণধর্মী কাজ। রবীন্দ্রসংগীতের বিভিন্ন স্বরলিপি সংরক্ষণ ও সম্পাদনার কাজ—এ ক্ষেত্রে তাঁর অবদান বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর স্মৃতিকথা, প্রবন্ধ ও রবীন্দ্রসংগীত বিষয়ক লেখালেখি বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।
তিনি প্রথম বাংলাদেশে আসেন ১৯৭৪ সালে। এরপর ১৯৭৫ ও ১৯৮৬ সালে আবার বাংলাদেশে আসেন। “জন্মভূমির টানে শৈলজারঞ্জন মজুমদার ১৯৭৫ সালে তাঁর নিজ জন্মভিটা মোহনগঞ্জের বাহাম গ্রামে ফিরে আসেন।” ওই সফরে তিনি জন্মভূমির মাটি কপালে মেখেছিলেন এবং স্থানীয়দের কাছ থেকে সংবর্ধনাও পেয়েছিলেন। ১৯৯২ সালের ২৪ অক্টোবর কলকাতার সণ্টলেকে নিজ বাড়িতর তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
তাঁর স্মৃতি ও অবদানকে ঘিরে নির্মিত প্রায় ৫০ কোটি টাকার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটি এখন নিয়মিত সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও পর্যটকের অপেক্ষায়। স্থানীয়দের প্রত্যাশা—দ্রুত জনবল নিয়োগ, নষ্ট সরঞ্জাম মেরামত, নিয়মিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও কার্যকর প্রচারণার মাধ্যমে কেন্দ্রটিকে আবার প্রাণবন্ত করে তোলা হবে।
এসএ




Comments