পাকা ভবনের আশায় স্কুলঘর নিলাম
শাহজাদপুরে কবরস্থানের ছাপরা ঘরে চলছে কোমলমতি শিশুদের পাঠদান
ঝড়-বৃষ্টি হলেই পাঠদান বন্ধ
পাকা ভবনের আশায় পুরোনো স্কুলঘর নিলামে বিক্রি করে দেওয়ায় চরম অবকাঠামোগত সংকটে পড়েছেন সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার জালালপুর ইউনিয়নের লোচনাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। ভবন না থাকায় বর্তমানে পাশের একটি কবরস্থানের ছাপরা ঘর এনে কোনো রকমে সেখানে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পাঠদান করানো হচ্ছে।
সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, বিদ্যালয়টির নতুন পাকা ভবন নির্মাণের প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আগের ঘরটি নিলামে বিক্রি করে দেওয়া হয়। তবে নতুন ভবন নির্মাণে জটিলতা দেখা দেওয়ায় এবং বিকল্প কোনো ব্যবস্থা না থাকায় বর্তমানে পুরোপুরি অবকাঠামোহীন হয়ে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এ অবস্থায় শিক্ষা কার্যক্রম সচল রাখতে বাধ্য হয়ে পাশের একটি কবরস্থান থেকে জরাজীর্ণ ছাপরা ঘর স্থানান্তর করে সেখানে সাময়িকভাবে বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। রোদ, বৃষ্টি ও খোলা আকাশের নিচে এমন জরাজীর্ণ পরিবেশে ক্লাস করতে গিয়ে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের।
বিদ্যালয়টির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুল লতিফ জানান, ছোট একটি পরিত্যক্ত ঘরে শিক্ষক-শিক্ষার্থী একসঙ্গে বসেন। পাশের কবরস্থান থেকে ছাপরা এনে বেড়া ছাড়াই সেখানে ক্লাসরুম বানানো হয়েছে। বর্তমানে সেখানেই পাঠদান চলছে।
তিনি আরও জানান, ২০২৪ সালে বিদ্যালয়টির জন্য একটি দ্বিতল পাকা ভবন নির্মাণে ১ কোটি ১২ লাখ টাকা বরাদ্দ আসে। তবে বিদ্যালয়ের যোগাযোগব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় নির্মাণসামগ্রী পরিবহন ব্যয় বেশি হবে এবং এতে ঠিকাদারের লাভের পরিবর্তে লোকসান হবে—এমন কারণ দেখিয়ে কার্যাদেশ পেলেও ঠিকাদার কাজ শুরু করেননি।
প্রধান শিক্ষক আরও বলেন, ১৯৪১ সালে ১৩ নম্বর জালালপুর ইউনিয়নে লোচনাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। বিদ্যালয়টির লেখাপড়ার মান ভালো হলেও অবকাঠামোর অভাবে শিক্ষার্থী-শিক্ষিকারা সমস্যায় পড়ছেন। অনেক শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে আসতে চায় না, অভিভাবকরাও সন্তানদের পাঠাতে আগ্রহ হারাচ্ছেন। বর্তমানে শতাধিক শিক্ষার্থী এখানে পড়াশোনা করছে। তাদের ধরে রাখতে দ্রুত শ্রেণিকক্ষ নির্মাণ করা জরুরি।
তিনি জানান, বর্তমানে যমুনা নদীর অবস্থান বিদ্যালয় থেকে অনেক দূরে। ফলে ভাঙনের কোনো ঝুঁকি নেই। তারপরও নতুন ভবন নির্মাণের কথা বলে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে ‘কাজ করছি’ বলা হলেও প্রায় দুই বছর পার হয়ে গেছে।
এদিকে অভিভাবক মুক্তি খাতুন ও রিতু খাতুন ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ছাপরা ঘরের বেড়া ও পর্যাপ্ত অবকাঠামো না থাকায় গরমের সময় স্কুলে ছেলে-মেয়েরা প্রায়ই অসুস্থ বোধ করে। অনেক শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে আসতে চায় না।
অন্যদিকে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানায়, টিনের ছাপরা ঘরে প্রচণ্ড গরমে ক্লাস করতে হয়। ঝড়-বৃষ্টি হলে ক্লাস বন্ধ রাখতে হয়।
শাহজাদপুরের স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) উপজেলা প্রকৌশলী রাহাত ইসলাম জানান, ২০২৪ সালে লোচনাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণের জন্য প্রায় ১ কোটি ১২ লাখ টাকার টেন্ডার আহ্বান করা হয়। আব্দুস সোবহান ডাবলু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজটি পায়।
তিনি জানান, পরবর্তী সময়ে নির্ধারিত সময়ে কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে না, জায়গার স্বল্পতা, বিদ্যালয়ের পাশে বড় খাল এবং যমুনা নদীর ভাঙনের ঝুঁকিসহ কয়েকটি কারণ দেখিয়ে টেন্ডার আহ্বানের প্রায় ছয় মাস পর সেটি বাতিল করে উপজেলা প্রকৌশল অধিদপ্তর। বরাদ্দের টাকাও ফেরত চলে যায়।
রাহাত ইসলাম আরও জানান, তিনি সম্প্রতি এ উপজেলায় যোগদান করেছেন। ঠিকাদারের কোনো গাফিলতি ছিল কি না, সে বিষয়ে তার জানা নেই। তবে অফিসের ফাইলপত্র দেখে তিনি জানতে পেরেছেন, বিদ্যালয়টি যমুনার তীরবর্তী হওয়ায় এখানে বহুতল পাকা ভবন নির্মাণের সুযোগ নেই। এ কারণে নতুন করে বিদ্যালয়টির শ্রেণিকক্ষ ‘পাইলট-ডিজাইন’ (অবকাঠামো স্টিলের ফ্রেম) সেমিপাকা ভবন করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মুরাদ হোসেন বলেন, “আমি এ উপজেলায় যোগদানের আগে স্কুল ভবন নির্মাণের টেন্ডার বাতিল হয়েছে। তাই বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে এ বিদ্যালয়ের অবকাঠামো নির্মাণের জন্য দ্রুত বরাদ্দ মেলে কি না, সে জন্য চেষ্টা করা হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “বিদ্যালয়টির শ্রেণিকক্ষ না থাকায় অভিভাবকেরা ছেলে-মেয়েদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে অনীহা প্রকাশ করায় শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ধরে রাখতে শিক্ষকদের পরিশ্রম করতে হচ্ছে।”
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাবরিনা শারমিন প্রতিবেদককে জানান, বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। দ্রুত পাঠদানের জন্য অন্তত দুই-তিনটি শেডঘর তৈরির ব্যবস্থা করার চেষ্টা করবেন তিনি।
এসএ




Comments