Image description

রাজশাহীর অলিগলি থেকে প্রধান রাজপথ—সর্বত্রই এখন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইকের একক রাজত্ব। তবে এই বিশাল যানবহরের পেছনের জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় চলছে চরম অরাজকতা ও নজিরবিহীন লুটপাট। সাধারণ আবাসিক গ্রাহক কিংবা ছোটখাটো দোকানের মিটারের বিদ্যুৎ ব্যবহার করে নগরজুড়ে গড়ে উঠেছে এক অপ্রতিরোধ্য বাণিজ্যিক চার্জিং সিন্ডিকেট। কোনো ধরনের বাণিজ্যিক মিটার ছাড়াই বাসাবাড়ির লাইন এবং মেইন তার থেকে সরাসরি হুকিং করে রাতভর চার্জ দেওয়া হচ্ছে হাজার হাজার অটোরিকশা। চালকদের কাছ থেকে গাড়িপ্রতি দৈনিক ১৮০ থেকে ২০০ টাকা হাতিয়ে নিয়ে একটি অসাধু চক্র কোটিপতি বনে গেলেও বিতরণ লাইনে সৃষ্টি হচ্ছে বিপজ্জনক ‘হিডেন লোড’ বা অদৃশ্য লোড। এতে একদিকে ট্রান্সফরমার বিকল ও লোডশেডিংয়ের ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ গ্রাহক, অন্যদিকে সরকারের কোষাগার থেকে প্রতিবছর হাওয়া হয়ে যাচ্ছে বিপুল অঙ্কের রাষ্ট্রীয় রাজস্ব।

সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাজশাহী মহানগরীর ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকা, রেললাইনের পাশের বস্তি ও বিভিন্ন বাজারের পেছনের গলিগুলোতে রাত নামলেই শুরু হয় এই গোপন কর্মযজ্ঞ। দিনের বেলা যেসব দোকান মুদিখানা কিংবা ফটোকপির ব্যবসা চালায়, গভীর রাতে শাটার নামিয়ে সেগুলোর ভেতরেই শুরু হয় ব্যাটারি চার্জিং। আবাসিক মিটারের নির্ধারিত বিদ্যুতের দাম কম হওয়ার সুযোগ নিয়ে একটি প্রভাবশালী চক্র বাণিজ্যিক শুল্ক ফাঁকি দিয়ে এই কারবার চালিয়ে যাচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসেও হানা: সিন্ডিকেটের অভিযোগ 

সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র মিলেছে দেশের অন্যতম শীর্ষ বিদ্যাপীঠ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) অভ্যন্তরে। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টেশন বাজার ও স্টেডিয়াম মার্কেট ঘুরে পাওয়া গেছে এই অবৈধ বাণিজ্যের তথ্য। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, রাতের আঁধারে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরের দোকানগুলোতে কম খরচে ব্যাটারি চার্জে লাগিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়েন চালকরা। সকালে গাড়ি নিয়ে তারা শহরের রাস্তায় বেরিয়ে পড়েন। মাসে অন্তত ১৫ থেকে ২০ দিন নিয়মিত চলে এই চৌর্যবৃত্তি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টেডিয়াম মার্কেটে রয়েছে প্রায় ৭৪টি দোকান এবং স্টেশন বাজারে রয়েছে মুদিসহ প্রায় ৫৭টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। অভিযোগ রয়েছে, এসব এলাকার কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বৈধ ব্যবহারের বাইরে গভীর রাতে অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জিংয়ের কাজে বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে।

এই ঘটনায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং সেকশনের অ্যাসিস্ট্যান্ট রেজিস্ট্রার বাইতুল্লাহর বিরুদ্ধে দায়িত্বহীনতা ও একটি অসাধু সিন্ডিকেটে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি মিটার রিডিং না নিয়েই মনগড়া বিল তৈরি করেন এবং অবৈধ সুবিধা নিয়ে এই কারবার টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করছেন।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে অ্যাসিস্ট্যান্ট রেজিস্ট্রার বাইতুল্লাহ বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই অংশে মিটার রিডিং নেওয়া হয়। আমার অধীনে প্রায় ১৯০টি মিটার রয়েছে। অটোরিকশায় অবৈধ চার্জ দেওয়ার বিষয়ে সম্প্রতি তিনটি দোকানের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেয়ে অভিযানে গিয়েছিলাম, তবে সেগুলো বন্ধ পাওয়া যায়। অনিয়ম পেলেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের প্রশাসক অধ্যাপক এস এম কামরুজ্জামান বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে কোনো ধরনের অনিয়মকে ছাড় দেওয়া হবে না। অভিযোগের সত্যতা মিললে জড়িতদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

চালকদের অকপট স্বীকারোক্তি !

নগরীর ভদ্রা মোড় থেকে অলকার মোড়ে যাওয়ার পথে কথা হয় দিনাজপুর থেকে আসা অটোরিকশাচালক মুন্নার (৪৫) সঙ্গে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘বড় গ্যারেজে চার্জের খরচ অনেক বেশি। তাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টেশন বাজারের দোকানগুলোতে কম টাকায় রাতে ব্যাটারি চার্জ দিয়ে আসি। শহরের বিভিন্ন পাড়ায় আবাসিক বাড়ির পাশের ছোট দোকানের মিটার থেকেও তার টেনে ব্যাটারি চার্জ দেওয়া যায়।’

অনুমোদন ১৪ হাজারের, দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ২৮ হাজার! 

রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) তথ্যমতে, নগরীতে অনুমোদিত বড় অটোরিকশা ৮ হাজার ৯৭০টি এবং ছোট অটোরিকশা ৫ হাজার ৮১৯টি। অর্থাৎ মোট নিবন্ধিত অটোরিকশা ১৪ হাজার ৭৮৯টি। কিন্তু বাস্তবে প্রতিদিন রাজপথে নামছে অন্তত ২৬ হাজার থেকে ২৮ হাজার গাড়ি। এর মধ্যে প্রায় ৩ হাজার গাড়ি আসে পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন উপজেলা থেকে।

এই বিশাল যানবহরের চাহিদাকে পুঁজি করে নগরীতে গড়ে উঠেছে প্রায় সাড়ে ৫০০ কাঁচা ও টিনের ছাউনির গ্যারেজ। নেই অগ্নিনিরাপত্তা কিংবা বৈধ অবকাঠামো। সরাসরি মেইন লাইন বা আবাসিক সংযোগ থেকে লাইন টেনে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে সেখানে সারারাত চলে চার্জিং।

বাড়ছে ‘হিডেন লোড’, জাতীয় গ্রিডে মারাত্মক টান 

বিদ্যুৎ প্রকৌশলীদের মতে, একটি অটোরিকশায় ৪ থেকে ৬টি ব্যাটারি থাকে। পূর্ণ চার্জ হতে সময় লাগে ৫ থেকে ৮ ঘণ্টা এবং বিদ্যুৎ খরচ হয় প্রায় ৬ থেকে ১০ ইউনিট।

রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) ছাত্রকল্যাণ দপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক ড. রবিউল ইসলাম সরকার বলেন, ‘মধ্যরাতে শত শত অটোরিকশা একসঙ্গে চার্জে বসানো হলে বিতরণ লাইন ও গ্রিডের ওপর এক বিশাল অদৃশ্য চাপ (হিডেন লোড) তৈরি হয়। এতে ট্রান্সফরমার অতিরিক্ত উত্তপ্ত হয়ে ঘন ঘন ফিউজ পুড়ে যায় ও অনাকাঙ্ক্ষিত লোডশেডিংয়ের সৃষ্টি হয়।’

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর গবেষণা অনুযায়ী, অনিয়ন্ত্রিত ও অবৈধ উপায়ে চার্জ দেওয়ার কারণে সরকার প্রতিবছর জাতীয় গ্রিড থেকে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, সারা দেশে প্রায় ৫০ থেকে ৮০ লাখ বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার রয়েছে, যার দৈনিক বিদ্যুৎ চাহিদা জাতীয় গ্রিডের মোট উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশ বা তারও বেশি।

প্রশাসনের বক্তব্য ও ভবিষ্যৎ শঙ্কা 

রাজশাহী সিটি করপোরেশনের রাজস্ব কর্মকর্তা আবু সালেহ মো. নূর-ঈ-সাইদ বলেন, ‘নগরীতে বাস্তবে কতটি অটোরিকশা গ্যারেজ রয়েছে তার পূর্ণাঙ্গ তালিকা নেই। তবে মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’ নেসকোর প্রধান প্রকৌশলী (অপারেশন) জিয়াউল ইসলাম বলেন, ‘আবাসিক সংযোগ দিয়ে বাণিজ্যিক চার্জিংয়ের বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। যেখানেই এমন অনিয়ম মিলছে, সংযোগ বিচ্ছিন্নসহ আইনানুগ ব্যবস্থা ও জরিমানা করা হচ্ছে।’

সম্প্রতি সরকার অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন, কিউআর কোড ও জিপিএস ট্র্যাকিংয়ের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সড়কে গাড়ি আটকে জরিমানা করলেই চলবে না; অবৈধ চার্জিং নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করে বাণিজ্যিক মিটারের আওতায় না আনলে বা স্মার্ট চার্জিং স্টেশন না বসালে বিদ্যুতের অপচয় ও রাজস্ব ক্ষতির এই রক্তক্ষরণ ঠেকানো যাবে না।

এসএ