জলাবদ্ধতায় গিলে খাচ্ছে বোয়ালখালীর শত শত হেক্টর ফসলি জমি
জলাবদ্ধতার কারণে চট্টগ্রামের বোয়ালখালীতে দিন দিন বাড়ছে অনাবাদি জমির পরিমাণ। দীর্ঘদিন ধরে পানি জমে থাকায় আগাছা ও কচুরিপানায় ঢেকে যাচ্ছে শত শত হেক্টর ফসলি জমি। একসময় যে জমিতে ধান, শাকসবজিসহ নানা ধরনের ফসলের সমারোহ ছিল, সেসব জমির বড় একটি অংশ এখন পড়ে আছে পরিত্যক্ত অবস্থায়।
কৃষকদের অভিযোগ, পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ করে অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ, খাল দখল ও ভরাট, অপরিকল্পিত কালভার্ট নির্মাণ এবং বিভিন্ন মিল-কারখানার বর্জ্য দূষণের কারণে পানি চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর সঙ্গে জমির উর্বরতা কমে যাওয়ায় অনেক কৃষক চাষাবাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
গত বুধবার বিকেলে উপজেলার আহলা করলডেঙ্গা, জ্যৈষ্ঠপুরা, আমুচিয়া, শ্রীপুর-খরণদ্বীপ, পোপাদিয়া, পশ্চিম গোমদণ্ডী, শাকপুরা ও সারোয়াতলী ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ কৃষিজমি দীর্ঘদিন ধরে অনাবাদি পড়ে আছে। কোথাও জমিতে কচুরিপানা, কোথাও আগাছার আধিক্য। অথচ কয়েক বছর আগেও এসব জমিতে নিয়মিত চাষাবাদ হতো।
স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, জলাবদ্ধতা এখন আর মৌসুমি সমস্যা নয়। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন এলাকার কৃষিজমিতে এ সমস্যা স্থায়ী রূপ নিয়েছে। পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় বর্ষা মৌসুমে জমিতে পানি জমে থাকে। আবার কোথাও সেচের অভাবে বোরো আবাদও ব্যাহত হচ্ছে।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বোয়ালখালীতে মোট আবাদি জমির পরিমাণ ৫ হাজার ১৬৫ হেক্টর। এর মধ্যে এক ফসলি জমি ২ হাজার ২৬ হেক্টর, দুই ফসলি ২ হাজার ৬৬৩ হেক্টর এবং তিন ফসলি জমি রয়েছে ৪৭৬ হেক্টর।
কৃষি অফিসের সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, নানা কারণে উপজেলায় প্রায় ১ হাজার ১০০ হেক্টর জমি অনাবাদি হয়ে পড়েছে। এসব জমিতে আগে বছরে প্রায় ৩ থেকে ৪ হাজার মেট্রিক টন ধান এবং অন্তত ৫ হাজার মেট্রিক টন রবিশস্য ও সবজি উৎপাদন হতো।
গোমদণ্ডীর বাসিন্দা শাহীনুর কিবরিয়া মাসুদ বলেন, “অনেকের নিজেদের কৃষিজমি আছে, অথচ জলাবদ্ধতার কারণে তারা চাষাবাদ করতে পারছেন না। স্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতা নিরসনে খালের মুখে স্লুইসগেট স্থাপন জরুরি।”
পশ্চিম গোমদণ্ডী হাজারীর চরের বাসিন্দা দেবাশীষ বড়ুয়া রাজু বলেন, এক দশক আগেও ওই এলাকায় ধানসহ বিভিন্ন ধরনের শাকসবজির চাষ হতো। মাঠজুড়ে ছিল ফসলের সমারোহ। কিন্তু জলাবদ্ধতার কারণে এখন বিপুল পরিমাণ জমিতে চাষাবাদ হচ্ছে না।
আমুচিয়া বগাচড়া বিলের কৃষক আব্দুল জলিল বলেন, “প্রায় ৩০ বছর ধরে এই বিলে চাষাবাদ করছি। এবারও ২০ একর জমিতে আমন ধান চাষ করেছি। আগে এখানে আমন ও বোরোর পাশাপাশি শীতকালীন নানা ধরনের শাকসবজি উৎপাদন হতো। কিন্তু বর্ষায় জলাবদ্ধতা এবং বোরো মৌসুমে সেচের সমস্যার কারণে কয়েকশ একর জমি অনাবাদি হয়ে যাচ্ছে।”
কধুরখীল কৃষ্ণদিঘীর পাড়সংলগ্ন হদর বিল ও মুরাদ মুন্সির হাট বিলেও দীর্ঘদিন ধরে চাষাবাদ হচ্ছে না। স্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে এসব জমিতে আগাছা জন্মেছে। পাশাপাশি ইঁদুর ও জোঁকের উপদ্রবও বেড়েছে বলে জানান স্থানীয় কৃষক সুনীল দে।
পশ্চিম গোমদণ্ডী ইউনিয়নের কৃষক নুরুল ইসলাম ও আহম্মদ নবী বলেন, “বাপ-দাদার আমল থেকে আমরা কৃষির ওপর নির্ভরশীল। পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না করে খাল ভরাট এবং অপরিকল্পিত কালভার্ট নির্মাণের কারণে পানি চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। কয়েক বছর ধরে এ সমস্যা আরও প্রকট হয়েছে। ফলে অনেক কৃষক চাষাবাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।”
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শাহানুর ইসলাম বলেন, “বিস্তীর্ণ ফসলি জমি অনাবাদি থাকার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান কারণ জলাবদ্ধতা এবং কৃষিজমি ভরাট করে অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ। পাশাপাশি কিছু কৃষকের মধ্যেও চাষাবাদে অনীহা তৈরি হয়েছে।”
তিনি বলেন, স্থায়ী জলাবদ্ধতা নিরসনে বোয়ালখালী খাল ও ছন্দরিয়া খালের মুখে স্লুইসগেট স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের মাধ্যমে স্লুইসগেট ও বেড়িবাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা করা যেতে পারে।
কৃষি কর্মকর্তা আরও বলেন, অনাবাদি জমিগুলো পুনরায় চাষাবাদের আওতায় আনা সম্ভব হলে কৃষকদের মধ্যে চাষাবাদে আগ্রহ বাড়বে। এর ফলে একদিকে কৃষকের আয় বাড়বে, অন্যদিকে স্থানীয়ভাবে খাদ্য উৎপাদনও বৃদ্ধি পাবে।
এসএ




Comments