খুঁটিতে বাঁধা বাবাকে চা-রুটি খাওয়ানো সেই ছোট্ট তুবার পাশে প্রশাসন, রিহ্যাবে বাবা
বাজারের একটি খুটির সঙ্গে বাঁধা অবস্থায় এক ব্যক্তি। চারপাশে উৎসুক মানুষের ভিড়। সেই ভিড় ঠেলে এগিয়ে যায় চার-পাঁচ বছরের ফুটফুটে শিশু তুবা। পরনে সাধারণ পোশাক, হাতে চায়ের কাপ আর রুটি। পরম ভালোবাসায় ও নিশ্চিন্তে নিজের হাতে বাবাকে চা-রুটি খাইয়ে দিচ্ছে সে—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এমন এক হৃদয়স্পর্শী দৃশ্য নাড়া দিয়েছে লাখো মানুষের বিবেককে। ভিডিওটি দেখে দেশজুড়ে সৃষ্টি হয় গভীর সহানুভূতি ও আলোড়ন।
অবশেষে সামাজিকমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া সেই অবুঝ শিশু তুবা ও তার অসহায় পরিবারের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে বরিশাল জেলার উজিরপুর উপজেলা প্রশাসন। চিকিৎসার মাধ্যমে বাবাকে মাদকাসক্তি থেকে মুক্ত করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা, পুরো পরিবারের দেখভাল করা, স্ত্রীকে স্বাবলম্বী করা এবং শিশু তুবার পড়াশোনা অব্যাহত রাখার পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আলী সুজা।
পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তুবার বাবা রায়হানুল হক অনিক দীর্ঘদিন ধরে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে মাদকাসক্তিতে ভুগছিলেন। মাদকাসক্তি ও শারীরিক-মানসিক অস্থিরতার কারণে অনেক সময় পরিবারের পক্ষে তাঁকে নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়ত। অনিককে সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। পরবর্তীতে জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সরাসরি সহায়তায় সোমবার একটি বিশেষ গাড়িতে করে অনিককে তিন মাসের জন্য একটি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে (রিহ্যাব) পাঠানো হয়েছে।
উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আলী সুজা জানান, অনিককে রিহ্যাবে চিকিৎসার জন্য পাঠানোর পাশাপাশি তাঁর পুরো পরিবারের নিরাপত্তা ও নিয়মিত খরচের দায়িত্ব নিয়েছে প্রশাসন। অনিক পুনর্বাসন কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন থাকা তিন মাস সময়ের মধ্যে তাঁর পরিবারের খাবারসহ যাবতীয় মৌলিক চাহিদার প্রয়োজনীয় সহযোগিতা উপজেলা প্রশাসন থেকে নিয়মিত প্রদান করা হবে।
একই সাথে তুবার পড়াশোনা যেন কোনোভাবেই অর্থের অভাবে বা পারিবারিক সংকটে বন্ধ হয়ে না যায়, সে বিষয়েও উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। তুবার ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল করতে তার পড়াশোনার জন্য যা যা প্রয়োজন তা প্রশাসন থেকে নিশ্চিত করা হবে।
পরিবারটির স্থায়ী আর্থিক সচ্ছলতা ও নির্ভরতা নিশ্চিত করার ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন। ইউএনও জানান, অনিকের চিকিৎসা শেষে ফেরা পর্যন্ত তাঁর স্ত্রীকে আয়মূলক কাজের সুযোগ করে দিয়ে স্বাবলম্বী করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তিনি যদি সেলাইয়ের কাজে পারদর্শী হন কিংবা আগ্রহ প্রকাশ করেন, তবে তাঁকে বিনামূল্যে সেলাই মেশিন প্রদান করা হবে। এ ছাড়া তাঁর সক্ষমতা ও ইচ্ছানুযায়ী অন্য কোনো আয়বর্ধক কর্মসংস্থানে যুক্ত করতেও প্রশাসন সার্বিক সহযোগিতা দেবে।
অনাহার ও মানবিক সংকটে পড়া এই পরিবারটির পাশে দাঁড়াতে সমাজের সামর্থ্যবান ও বিত্তবান মানুষদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ইউএনও মো. আলী সুজা। তিনি জানান, ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর থেকেই স্থানীয় ও দূরদূরান্তের বহু মানুষ শিশু তুবা ও তার পরিবারের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করেছেন এবং সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। অনেকেই সরাসরি বা প্রশাসনের মাধ্যমে সহায়তা করার ইচ্ছা জানিয়েছেন। কেউ যদি পরিবারটির পাশে দাঁড়াতে চান, তবে উপজেলা প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করে তা নিরাপদে পরিবারের হাতে পৌঁছে দেওয়া যাবে।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি সিসিটিভি বা ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায়, বাজার এলাকার একটি দোকানের সামনের খুঁটিতে বাধা অবস্থায় রাখা রয়েছে তুবার বাবা অনিককে। চতুষ্পাশে মানুষের আনাগোনা ও ভিড়ের মাঝেই খুদে শিশু তুবা কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে বাবার পাশে গিয়ে দাঁড়ায় এবং পরম স্নেহে নিজ হাতে তাকে চা ও টিফিনের রুটি খাইয়ে দিতে থাকে। অবুঝ শিশুটির এই ভালোবাসা ও করুণ দৃশ্য দেখে সামাজিকমাধ্যমে চোখ ভিজেছে হাজারো মানুষের।
ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর সাধারণ মানুষ তুবার বাবার ভালো চিকিৎসার দাবি এবং শিশুটির ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করার জোর দাবি তুলেছিলেন। সেই জনদাবির পরিপ্রেক্ষিতে দ্রুত সময়ের মধ্যে বরিশালের উজিরপুর উপজেলা প্রশাসনের এই মানবিক ও সার্বিক পদক্ষেপ প্রশংসিত হচ্ছে সর্বস্তরে।
ডিআর




Comments