সময়ের বিবর্তন, আধুনিক নির্মাণসামগ্রীর সহজলভ্যতা ও জীবনযাত্রার মান পরিবর্তনের প্রবাহে চট্টগ্রামসহ পুরো দেশ থেকেই বিলুপ্তির পথে গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী ছনের ঘর।
একসময় চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার গ্রামীণ জনপদের প্রধান পরিচিত দৃশ্য ছিল ছনের ছাউনি দেওয়া ঘর। কালের আবর্তে সেই দৃশ্য এখন প্রায় বিলীন। তবে দুর্গম পাহাড়ি জনপদের কিছু এলাকায় এখনো টিকে রয়েছে ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে থাকা দু-একটি ছনের ঘর।
প্রায় তিন দশক আগেও ফটিকছড়ির বিভিন্ন গ্রাম-গঞ্জে দেখা যেত বাঁশ, বেত ও ছন দিয়ে তৈরি দোচালা ঘর। কোথাও কোথাও মাটি ও কাঠ দিয়ে তৈরি ঘরের ওপর দেওয়া হতো ছনের ছাউনি। স্থানীয়ভাবে এসব ঘর ছিল দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারের বসবাসের অন্যতম প্রধান আশ্রয়।
স্থানীয় প্রবীণ অধিবাসী আবুল ফজলের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রাচীনকাল থেকেই ফটিকছড়ির মানুষ প্রকৃতিনির্ভর উপকরণ দিয়েই ঘরবাড়ি নির্মাণ করতেন। মাটি, কাঠ, বাঁশ, বেত ও ছন ছিল ঘর তৈরির মূল ভিত্তি। এর মধ্যে ছনের তৈরি ঘর ছিল তুলনামূলকভাবে সহজলভ্য ও বেশ আরামদায়ক। ছনের ঘরের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহে ঘর ঠান্ডা রাখা। এ কারণে ফটিকছড়ির অনেক সচ্ছল পরিবারও প্রখর খরতাপ থেকে বাঁচতে মূল বাড়ির পাশে ছনের কাচারিঘর বা বিশ্রামঘর নির্মাণ করতেন।
উপজেলার সাবেক এক বন কর্মকর্তা জানান, একসময় ফটিকছড়ির পাহাড়ি এলাকায় ব্যাপকভাবে ছনের চাষ হতো। পাহাড় ও বনাঞ্চল থেকে ছন সংগ্রহ করে তা বিক্রি করতেন অনেকেই। ছন কাটা, শুকানো, বাঁধাই করা ও পরিবহনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিল অসংখ্য শ্রমজীবী পরিবার। স্থানীয় হাট-বাজারে বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি হতো এই ছন। এমনকি ফেনী, নোয়াখালী ও কুমিল্লার বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলেও ফটিকছড়ির পাহাড়ি ছনের ব্যাপক চাহিদা ছিল।
পাহাড়ের ঢাল ও জঙ্গল এলাকায় প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো ছন ছিল হালকা ও টেকসই। দক্ষ কারিগরদের নিখুঁত ছোঁয়ায় ছনের ছাউনি দেওয়া ঘরগুলো হয়ে উঠত গ্রামীণ রূপসী বাংলার এক অনবদ্য শৈল্পিক নিদর্শন।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে টিন, ইট, সিমেন্ট ও কংক্রিটের স্থায়িত্ব ও ব্যবহার বাড়তে থাকায় ছনের ঘরের প্রচলন নাটকীয়ভাবে কমে যায়। এর পাশাপাশি গত তিন দশকে অবাধে পাহাড় কাটা ও বন উজাড়ের কারণে কমে গেছে ছনের চাষ এবং ছননির্ভর মানুষের সংখ্যাও।
স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তিত্ব ও সাবেক স্কুলশিক্ষক আবুল বশর মাস্টারের মতে, ছনের ঘর হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফটিকছড়ির লোকজ সংস্কৃতি ও প্রাচীন গ্রামীণ জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বকীয় অধ্যায় হারিয়ে যাচ্ছে। একসময় যে ছনের ঘর ছিল ফটিকছড়ির জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তা এখন কেবলই স্মৃতির পাতায় জমা হচ্ছে।
এলাকার সচেতন প্রবীণ নাগরিকদের আক্ষেপ, অতীতের এসব চিরচেনা ঐতিহ্য যেন শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ না থাকে। সরকারি উদ্যোগে এসব লোকজ ঐতিহ্য ও নিদর্শন সংরক্ষণ করা হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গ্রাম-বাংলার প্রাচীন গৃহায়ন সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পারবে।
ডিআর




Comments