মাটির প্রতিমায় প্রাণের ছোঁয়া গাইবান্ধায় শারদীয় দুর্গোৎসবের ব্যাপক প্রস্তুতি
গাইবান্ধা জেলাজুড়ে এখন দিনভর মণ্ডপে মণ্ডপে ব্যস্ত প্রতিমাশিল্পীরা। কারও হাতে মাটির দলা, কারও হাতে তুলির আঁচড়। কেউ প্রতিমার অবয়বে ফুটিয়ে তুলছেন সূক্ষ্ম কারুকাজ, আবার কেউ ব্যস্ত মণ্ডপ সাজানোর কাজে। দিনের আলো ফোটার পর শুরু হচ্ছে কাজ, চলছে সন্ধ্যা পেরিয়েও। শারদীয় দুর্গোৎসবকে সামনে রেখেই প্রতিমা তৈরিতে উৎসবের আমেজ।
জেলার ৬২৮টি মন্দির ও মণ্ডপে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। কোথাও প্রতিমায় দেওয়া হচ্ছে শেষ তুলির আঁচড়, কোথাও চলছে মণ্ডপের সাজসজ্জা ও আলোকসজ্জার কাজ। প্রতিটি প্রতিমায় ফুটে উঠছে শিল্পীদের শ্রম, সময়, মেধা ও শিল্পবোধের সম্মিলিত ছাপ।
সোমবার (৫ অক্টোম্বর) সকালে জেলা পূজা উদযাপন পরিষদ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গাইবান্ধা সদরে ১০৫টি, সাদুল্লাপুরে ১১৩টি, গোবিন্দগঞ্জে ১৩৪টি, ফুলছড়িতে ১৪টি, সাঘাটায় ৬৪টি, সুন্দরগঞ্জে ১৩৯টি এবং পলাশবাড়ীতে ৫৯টি মন্দির-মণ্ডপে এবার দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে।
সনাতন পঞ্জিকা অনুযায়ী, আসছে ১০ অক্টোবর মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবীপক্ষের সূচনা হবে। ১৬ অক্টোবর মহাপঞ্চমীর পর ১৭ অক্টোবর মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু হবে দুর্গোৎসবের মূল আনুষ্ঠানিকতা। ১৮ অক্টোবর মহাসপ্তমী, ১৯ অক্টোবর মহাষ্টমী ও ২০ অক্টোবর মহানবমী শেষে ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে পাঁচ দিনের দুর্গোৎসব।
প্রতিমাশিল্পী দ্বীপ মহন্ত বলেন, প্রতিমা তৈরির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। ‘একটি প্রতিমা তৈরি করতে অনেক সময়, শ্রম ও যত্নের প্রয়োজন হয়। মাটির কাজ থেকে শুরু করে রঙ ও সাজসজ্জা প্রতিটি ধাপেই শিল্পীকে মনোযোগ দিয়ে কাজ করতে হয়। পূজার আগেই প্রতিমা সুন্দরভাবে সম্পন্ন করে আয়োজকদের হাতে তুলে দিতে পারলেই তাদের পরিশ্রম সার্থক হবে।’
এদিকে কোথাও মণ্ডপের প্যান্ডেল তৈরির কাজ চলছে, কোথাও চলছে আলোকসজ্জা ও নিরাপত্তাব্যবস্থা গুছিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি। পূজা কমিটির সদস্যদের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবকরাও ভাগ করে নিচ্ছেন নিজেদের দায়িত্ব। পূজার দিনগুলোতে দর্শনার্থীরা যাতে কোনো ধরনের বিড়ম্বনায় না পড়েন, সেদিকেও রাখা হচ্ছে বিশেষ নজর।
সাদুল্যাপুর উপজেলার আরাজী জামালপুর মন্দির কমিটির সভাপতি কাজল দেব শর্মা বলেন, পূজাকে ঘিরে তাদের প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে। মণ্ডপের সাজসজ্জা, আলোকসজ্জা ও নিরাপত্তার বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। শান্তিপূর্ণ ও আনন্দঘন পরিবেশে সবাই যেন দুর্গোৎসব উপভোগ করতে পারেন, সেটাই তাদের প্রধান লক্ষ্য। এ জন্য স্থানীয় বাসিন্দাসহ সবার সহযোগিতা প্রত্যাশা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে দুর্গাপূজা এখন শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। পূজার দিনগুলোতে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে নানা বয়সী মানুষ ভিড় করেন মণ্ডপে। প্রতিমা দর্শনের পাশাপাশি আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিতজনদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎও হয়। শিশু-কিশোরদের মধ্যেও থাকে বাড়তি উচ্ছ্বাস। ফলে কয়েক দিনের জন্য পূজামণ্ডপগুলো পরিণত হয় মানুষের মিলনমেলায়।
গাইবান্ধা জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বিরতী রঞ্জন বলেন, শান্তিপূর্ণ পরিবেশে দুর্গোৎসব পালনের লক্ষ্যে সংগঠনের পক্ষ থেকে স্বেচ্ছাসেবকেরা কাজ করবেন। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সময় পূজার কার্যক্রম বন্ধ রাখা হবে। সবার সহযোগিতায় এবারও দুর্গোৎসব শান্তিপূর্ণ পরিবেশে উদযাপন হবে বলে তারা আশা করেন। পূজার আয়োজনে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
পুলিশ সুপার মো. জসিম উদ্দীন বলেন, আসন্ন দুর্গাপূজা নির্বিঘ্নে উদযাপনের লক্ষ্যে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। পূজামণ্ডপগুলো সিসি ক্যামেরার আওতায় আনার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হবে।
সব প্রস্তুতি শেষে এখন অপেক্ষা শুধু সেই মাহেন্দ্রক্ষণের। প্রতিমায় শেষ তুলির আঁচড়, মণ্ডপে শেষ সাজসজ্জা আর ঢাকের বাদ্যির অপেক্ষায় গাইবান্ধার ৬২৮টি মন্দির-মণ্ডপ। শরতের শুভ্রতার সঙ্গে মানুষের মনে ধীরে ধীরে জমে উঠছে শারদীয় উৎসবের রঙ।
এসএ




Comments