Image description

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর প্রস্তুতি এগিয়ে চলছে। কেন্দ্রটির প্রথম ও দ্বিতীয় ইউনিটে স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা স্থাপনের কাজ শেষ হয়েছে। পাশাপাশি প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরুর অনুমোদন এবং অতিরিক্ত ইউরেনিয়াম জ্বালানি প্রকল্প এলাকায় পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে উৎপাদন শুরুর প্রস্তুতি আরও এগিয়েছে।

রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু সংস্থা রোসাটমের তথ্য অনুযায়ী, রূপপুরে প্রথমবারের মতো তাদের বিদেশে নির্মিত কোনো বিদ্যুৎ কেন্দ্রে আধুনিক ‘অপারেটর ইনফরমেশন সাপোর্ট সিস্টেম’ (ওআইএসএস) বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

রোসাটমের সহযোগী প্রতিষ্ঠান রোসাটম অটোমেটেড কন্ট্রোল সিস্টেমসের (রাসু) সরবরাহ করা স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় ৪৩টি সিস্টেমের আওতায় প্রায় ২০ হাজার সরঞ্জাম রয়েছে। এসব ব্যবস্থা চুল্লির স্থিতিশীলতাসহ ৭ হাজারের বেশি প্রক্রিয়াগত পরামিতি পর্যবেক্ষণ করবে। এর মাধ্যমে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নিরাপদ ও দক্ষ পরিচালনায় সহায়তা মিলবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

প্রকল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ওআইএসএস। বিদ্যুৎ ইউনিটের ডিজিটাল প্রতিরূপ বা ‘ডিজিটাল টুইন’ ব্যবহার করে তৈরি এ ব্যবস্থা ইতোমধ্যে প্রথম ইউনিটে যুক্ত করা হয়েছে। চালুকরণ কার্যক্রমেও এটি ব্যবহৃত হচ্ছে। একই ব্যবস্থা দ্বিতীয় ইউনিটেও স্থাপন করা হবে।

ওআইএসএস ৩৬০টি প্রক্রিয়াগত ব্যবস্থা থেকে তথ্য বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন বিচ্যুতি শনাক্ত করতে পারে। পাশাপাশি ৮০টির বেশি নির্দেশনার ভিত্তিতে অপারেটরদের প্রয়োজনীয় সুপারিশ দেয়। এর মধ্যে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার নির্দেশনাও রয়েছে। জটিল পরিচালনাগত তথ্য সহজভাবে উপস্থাপনের মাধ্যমে অপারেটরদের দ্রুত ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে ব্যবস্থাটি।

রোসাটমের মহাপরিচালক আলেক্সেই লিখাচেভ বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র রাশিয়া ও বাংলাদেশের সহযোগিতার অন্যতম বৃহৎ প্রকল্প। আধুনিক স্বয়ংক্রিয়করণ ও নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও এটি একটি অগ্রগামী প্রকল্প। বিদেশে নির্মিত রোসাটমের কোনো বিদ্যুৎ কেন্দ্রে এই প্রথম ওআইএসএস বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সাড়া দেওয়ার সময় কমবে, পরিচালন ব্যয় হ্রাস পাবে এবং নিয়ন্ত্রণকক্ষের কর্মীরা নির্ভরযোগ্য সহায়তা পাবেন।

রোসাটমের প্রকৌশল বিভাগ অ্যাটমস্ট্রয় এক্সপোর্টের মাধ্যমে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে তৃতীয় প্রজন্মের প্লাস প্রযুক্তির দুটি ভিভিইআর-১২০০ পারমাণবিক চুল্লি রয়েছে।

ক্রিটিক্যালিটি শুরুর অনুমোদন

এর আগে গত ৮ অক্টোবর দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক বিক্রিয়া বা ক্রিটিক্যালিটি শুরুর অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ। এর ফলে কেন্দ্রটির বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতি আরও গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

প্রকল্প সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) নির্দেশনা অনুসরণ করে রাশিয়ার সহযোগিতায় প্রকল্পের ‘বি-১’ ধাপের পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। স্বয়ংক্রিয় চাপ প্রশমন ভালভের পরীক্ষায় জটিলতা কাটার পর ‘বি-২’ ধাপের কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

এ পর্যায়ে প্রাথমিক পরিচালনার জন্য চুল্লিকে প্রস্তুত করে স্বয়ংসম্পূর্ণ চেইন রিঅ্যাকশন বা ধারাবাহিক পারমাণবিক বিভাজন প্রক্রিয়া চালু করা হবে। এ প্রক্রিয়া সফল হলে চুল্লিতে নিয়ন্ত্রিতভাবে শক্তি উৎপাদনের পরবর্তী ধাপে যাওয়া সম্ভব হবে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের পর উৎপাদিত বিদ্যুৎ ধাপে ধাপে বাড়িয়ে ৩০০ মেগাওয়াটে নেওয়া হবে। এরপর জাতীয় সঞ্চালন লাইনে বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রকল্পে পৌঁছেছে অতিরিক্ত ইউরেনিয়াম

এদিকে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্য দিয়ে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে প্রথম ইউনিটের অতিরিক্ত ইউরেনিয়াম জ্বালানি প্রকল্প এলাকায় নেওয়া হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের এক কর্মকর্তা জানান, আন্তর্জাতিক নিয়ম ও নির্দেশনা অনুসরণ করে জ্বালানি বিশেষ শেডে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। সাধারণত একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালুর এক থেকে দেড় বছর পর কিছু জ্বালানি অ্যাসেম্বলি পরিবর্তন করতে হয়। প্রথম ইউনিটের জন্য আনা অতিরিক্ত জ্বালানি সেই প্রয়োজনের অংশ।

রোসাটম জানিয়েছে, প্রথম ও দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য মোট নয়টি চালানে ২০০টির বেশি জ্বালানি অ্যাসেম্বলি আনা হচ্ছে। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে এসব জ্বালানি সরবরাহ সম্পন্ন হওয়ার কথা। এর আগে ২০২৩ সালে প্রথম ইউনিটের জন্য আনা জ্বালানি চলতি বছরের মে মাসে চুল্লিতে স্থাপন করা হয়েছে।

প্রকল্প সূত্রের দাবি, নিরাপত্তা ভালভে ১৬ মেগাপ্যাসকেল চাপে পরীক্ষা সফলভাবে শেষ হয়েছে। পরবর্তী ধাপে ১৮ মেগাপ্যাসকেল চাপে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা করা হবে। সেটি সফল হলে পারমাণবিক বিভাজন প্রক্রিয়া শুরুর দিকে এগোনো যাবে।

সূত্রটির ভাষ্য অনুযায়ী, পাওয়ার স্টার্টআপের প্রস্তুতিতে পুরো অক্টোবর মাস লাগতে পারে। এরপর জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রক্রিয়া শুরু হবে।

সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ইউনিট থেকে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে নির্ধারিত সময়ে উৎপাদন ও সরবরাহ শুরু হওয়া নির্ভর করবে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, নিরাপত্তা যাচাই ও চালুকরণ কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার ওপর।