৪০ বছরেও চালু হয়নি ৩০০ কোটি টাকার হাসপাতাল
পরিত্যক্ত ভবনে মাদকসেবীদের আড্ডা
ঢাকার ধামরাই উপজেলার চৌহাট ইউনিয়নের পাইকপাড়া গ্রামে প্রায় ১৬ একর জমির ওপর নির্মিত ইউনুস খান মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল। প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে তোলা এই বিশাল স্থাপনা চার দশকেও চালু করা সম্ভব হয়নি। একসময় মানুষের চিকিৎসাসেবা ও কল্যাণের স্বপ্ন নিয়ে নির্মিত হাসপাতালটি এখন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। চারদিকে ঝোপঝাড়, ভবনের ভেতরে অন্ধকার কক্ষ, ভাঙাচোরা সিঁড়ি আর সুনসান পরিবেশ—সব মিলিয়ে স্থানীয়দের কাছে এটি পরিচিতি পেয়েছে ‘ভূতুড়ে হাসপাতাল’ হিসেবে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকায় হাসপাতালটির বিভিন্ন ভবন ও আশপাশের এলাকায় মাদকসেবীদের আনাগোনা বেড়েছে। দিনের বেলায় কৌতূহলী দর্শনার্থীরা স্থাপনাটি দেখতে এলেও সন্ধ্যার পর সেখানে যেতে ভয় পান অনেকে। অথচ হাসপাতালটি চালু হলে ধামরাইসহ আশপাশের এলাকার হাজারো মানুষ উন্নত চিকিৎসাসেবা পেতে পারতেন। একই সঙ্গে সৃষ্টি হতে পারত বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ।
এমন দৃশ্য দেখা গেছে ধামরাই উপজেলার চৌহাট ইউনিয়নের পাইকপাড়া গ্রামে সরেজমিনে গিয়ে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আশির দশকে দেশের শিল্প খাতের সঙ্গে যুক্ত শিল্পপতি ও পদ্মা প্রিন্টার্স এবং সোনালী গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের চেয়ারম্যান প্রয়াত খান মোহাম্মদ ইকবাল আহমেদ নিজ গ্রামে একটি আন্তর্জাতিক মানের ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। ১৯৮৬ সালে পাইকপাড়া গ্রামে প্রায় ১৬ একর জমির ওপর এ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়।
প্রকল্পটি ঘিরে তখন এলাকায় ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা তৈরি হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে সৌদি আরবের এক বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করেন। ওই সময় গ্রামবাসীকে আপ্যায়নের জন্য দুটি গরু জবাই করা হয়। প্রত্যন্ত গ্রামে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার সম্ভাবনায় আশাবাদী হয়ে ওঠেন এলাকাবাসী।
তবে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের নামে প্রকল্পটি প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিলেও খান মোহাম্মদ ইকবাল আহমেদ তাতে সম্মত হননি বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদও প্রকল্পটি বাস্তবায়নের আশ্বাস দিয়েছিলেন বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। সে সময় ইকবাল আহমেদের ছোট ভাই খান মোহাম্মদ ইসরাফিল খোকন জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য ছিলেন।
পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, ব্যবসায়িক সংকট ও আর্থিক প্রতিবন্ধকতায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন না পাওয়ায় বিকল্প পরিকল্পনা হিসেবে সেখানে মাদ্রাসা ও এতিমখানা প্রতিষ্ঠার কথা ভাবা হয়। পাশাপাশি একটি পোশাক কারখানা গড়ে তোলার পরিকল্পনা ছিল, যার আয় থেকে মাদ্রাসা ও এতিমখানা পরিচালনার কথা ছিল। কিন্তু নানা প্রতিকূলতায় সেই উদ্যোগও বাস্তবায়িত হয়নি।
পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, পরবর্তী সময়ে ইউনুস খান তাঁর সন্তানদের একটি আধুনিক ক্যান্সার হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেন। বাবার সেই ইচ্ছা পূরণের লক্ষ্যে খান মোহাম্মদ ইকবাল আহমেদ সেখানে ‘ইউনুস খান মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন।
প্রকল্পের আওতায় নির্মাণ করা হয় চারতলা হাসপাতাল ভবন, চিকিৎসক ও কর্মকর্তাদের আবাসনের ব্যবস্থা, শিক্ষার্থীদের জন্য হোস্টেল, মসজিদ এবং পুকুরসহ বিভিন্ন অবকাঠামো। দীর্ঘ সময় ধরে ধাপে ধাপে নির্মাণকাজ চললেও হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি।
পরিবারের সূত্রে আরও জানা যায়, বিদেশি অনুদান এনে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এক ব্যক্তি শিল্পপতি খান মোহাম্মদ ইকবাল আহমেদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ আর্থিক ক্ষতির ধাক্কা সামলে ওঠা তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। এরপরও নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। ২০১৭ সালে তাঁর মৃত্যুর পর নির্মাণ ও পরিচালনার উদ্যোগ কার্যত থেমে যায়।
এভাবে প্রায় চার দশক ধরে নানা পরিকল্পনা ও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এগোলেও হাসপাতালটি আর মানুষের চিকিৎসাসেবার কেন্দ্রে পরিণত হতে পারেনি।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল কাদের বলেন, “ইকবাল আহমেদের বাবার নামে হাসপাতালটিতে আমি একটানা সাত বছর কাজ করেছি। প্রথমে সেখানে ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয় করার পরিকল্পনা ছিল। সেটি না হওয়ায় মাদ্রাসা ও এতিমখানা এবং পাশে পোশাক কারখানা করার কথা ভাবা হয়। পরে হাসপাতাল নির্মাণের কাজ শুরু হয়। কিন্তু সেটিও চালু করা সম্ভব হয়নি। এখন স্থাপনাটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছে। হাসপাতালটি চালু হলে হাজার হাজার মানুষ চিকিৎসাসেবা পেতেন।”
দর্শনার্থী নাসির উদ্দীন বলেন, “পাইকপাড়ায় এত বড় একটি হাসপাতাল নির্মাণ করা হয়েছে শুনে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ দেখতে আসে। বিশাল জায়গাজুড়ে ভবনগুলো দাঁড়িয়ে আছে। তবে হাসপাতালটি দ্রুত চালু করা গেলে একদিকে মানুষ চিকিৎসাসেবা পাবে, অন্যদিকে অনেকের কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে।”
স্থানীয় যুবক কামাল হোসেন বলেন, “আমরা মাঝেমধ্যে কয়েকজন মিলে মাদকসেবীদের তাড়ানোর চেষ্টা করি। কিন্তু নিরাপত্তার ব্যবস্থা না থাকায় তাদের আনাগোনা পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না। এর আগে ভবনের ছাদ থেকে পড়ে এক মাদকসেবীর মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে বলে শুনেছি।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে হাসপাতাল প্রাঙ্গণটি ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। ভবনের বিভিন্ন অংশে ঝোপঝাড় জন্মেছে। ফাঁকা কক্ষ ও সিঁড়িতে রয়েছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা। এ অবস্থায় স্থাপনাটি সংরক্ষণ ও নিরাপদ রাখার পাশাপাশি এর ভবিষ্যৎ ব্যবহার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
খান মোহাম্মদ ইকবাল আহমেদের ছোট ভাই ও জাতীয় পার্টির সাবেক সংসদ সদস্য খান মোহাম্মদ ইসরাফিল খোকন মুঠোফোনে বলেন, তাঁর ভাই প্রতারণার শিকার হয়েছিলেন। তিনি নিজেও ওই প্রতারণার ফাঁদে পড়েছিলেন বলে জানান।
তিনি আরও বলেন, একসময় বারডেম হাসপাতালের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ খান স্থাপনাটিতে হাসপাতাল পরিচালনার উদ্যোগ নিতে চেয়েছিলেন। পরিবারের সদস্যরা এতে সম্মত হলেও ইকবাল আহমেদের দুই ছেলে রাজি না থাকায় সেই উদ্যোগ আর এগোয়নি।
ইসরাফিল খোকন জানান, বর্তমানে সরকার কিংবা কোনো স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান জনস্বার্থে হাসপাতালটি চালুর উদ্যোগ নিলে তাঁদের পরিবার প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। এ বিষয়ে মালিকপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো বাধা নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এ বিষয়ে ধামরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আল মামুন বলেন, “উপজেলার চৌহাট ইউনিয়নের পাইকপাড়া এলাকায় ব্যক্তিমালিকানাধীন একটি হাসপাতাল রয়েছে। এটি নির্মাণে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। মালিকপক্ষ যদি লিখিতভাবে হাসপাতালটি সরকারের কাছে হস্তান্তর করে, তাহলে সরকার এটি নিয়ে কাজ করতে পারবে। মালিকপক্ষ সম্মতি দিলে হাসপাতালটি নিয়ে নতুন করে উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব।”
প্রশাসনের এ বক্তব্য অনুযায়ী, হাসপাতালটি চালু করার ক্ষেত্রে মালিকানা ও হস্তান্তরের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তবে দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকা স্থাপনাটির ভবিষ্যৎ কী হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো উদ্যোগের কথা জানা যায়নি।
একসময় ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়, পরে মাদ্রাসা ও এতিমখানা, আর শেষ পর্যন্ত আধুনিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল—এভাবেই বারবার বদলেছে পাইকপাড়ার এই প্রকল্পের পরিকল্পনা। কিন্তু কোনো উদ্যোগই শেষ পর্যন্ত পূর্ণতা পায়নি। মানুষের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও চিকিৎসাসেবার সুযোগ সৃষ্টির যে স্বপ্ন নিয়ে স্থাপনাটির নির্মাণ শুরু হয়েছিল, তা আজও অধরা।
প্রায় ১৬ একর জমির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই অবকাঠামো এখন যেমন বিপুল বিনিয়োগের অপচয়ের প্রশ্ন সামনে আনছে, তেমনি জনস্বার্থে এর ব্যবহার নিশ্চিত করার সম্ভাবনাও তৈরি করছে। মালিকানা ও পরিচালনার জটিলতা নিরসন, ভবনগুলোর নিরাপত্তা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে স্থাপনাটিকে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, তা নিয়ে কার্যকর উদ্যোগ জরুরি।
হাসপাতালটি কি শেষ পর্যন্ত মানুষের চিকিৎসাসেবার ঠিকানা হয়ে উঠবে, নাকি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিণত হবে আরও বড় ধ্বংসস্তূপে—এ প্রশ্নের উত্তর এখন নির্ভর করছে মালিকপক্ষ, প্রশাসন ও সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের কার্যকর উদ্যোগের ওপর।
এসএ




Comments