সাগরে মাছ ধরতে যাওয়ার আগেই পশুর নদীতে প্রাণ গেল ১৯ বছরের মেহেদীর
লাইফ জ্যাকেট ছাড়াই ঝুঁকি নিয়ে সাগরে হাজারো জেলে
অভাবের সংসারে একটু সচ্ছলতা ফেরাতে মাছ ধরতে সাগরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন ১৯ বছর বয়সী মেহেদী হাসান। কিন্তু সাগরে পৌঁছানোর আগেই পশুর নদীর উত্তাল ঢেউ ও স্রোতে থেমে গেল তাঁর জীবন। নিখোঁজের প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) বিকেলে মোংলার চিলা খালের গোড়ায় ভেসে ওঠে তাঁর মরদেহ।
নিহত মেহেদী হাসান বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার গৌরম্ভা ইউনিয়নের একটি দরিদ্র জেলে পরিবারের সন্তান। তাঁর বাবা অন্যের নৌকায় মাছ ধরে সংসার চালান। পরিবারের আর্থিক সংকট দূর করতে মাত্র ১৫ বছর বয়স থেকেই বাবার সঙ্গে সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া শুরু করেন মেহেদী।
স্থানীয় জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) গভীর রাতে আনুমানিক ৩টার দিকে মোংলার চিলা থেকে ‘এফবি মা-বাবার দোয়া’ নামের একটি মাছ ধরার ট্রলার ১০ জন জেলেকে নিয়ে বঙ্গোপসাগরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। ওই ট্রলারের সবচেয়ে কম বয়সী জেলে ছিলেন মেহেদী।
ট্রলারটি পশুর নদীর হাড়বাড়িয়া ও চিলা খালের মোহনার মাঝামাঝি এলাকায় পৌঁছালে ভোরের জোয়ারের প্রবল স্রোতে প্রচণ্ডভাবে দুলতে থাকে। এ সময় ট্রলারের সামনের দিকে বসে ছিলেন মেহেদী। হঠাৎ বড় একটি ঢেউয়ের ধাক্কায় ভারসাম্য হারিয়ে তিনি নদীতে পড়ে যান। সঙ্গে থাকা জেলেরা ‘মেহেদী পড়ে গেছে’ বলে চিৎকার শুরু করলেও ততক্ষণে স্রোতের টানে অনেক দূরে চলে যান তিনি।
ট্রলারে থাকা মাঝি মালেক বলেন, “ছেলেটা ভালো সাঁতার জানত না। পানিতে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই ডুবে যায়। আমরা জাল ফেলেছি, অনেকক্ষণ ধরে আশপাশে খুঁজেছি, কিন্তু তাকে পাইনি।”
খবর পেয়ে রাতেই মোংলা ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। টানা ছয় ঘণ্টা পশুর নদীর ওই এলাকায় তল্লাশি চালিয়েও মেহেদীর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
ফায়ার সার্ভিসের এক কর্মকর্তা জানান, পশুর নদীর ওই অংশে পানির গভীরতা ৬০ ফুটের বেশি এবং স্রোত অত্যন্ত প্রবল। রাতের অন্ধকারে সেখানে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা বেশ কঠিন।
অবশেষে শুক্রবার বিকেলে চিলা খালের গোড়ায় জাল ফেলছিলেন স্থানীয় জেলে রবিউল ইসলাম। এ সময় তিনি পানিতে একটি মরদেহ ভাসতে দেখে চিৎকার দেন। পরে আশপাশের জেলেরা ঘটনাস্থলে এসে চাঁদপাই ফরেস্ট স্টেশনে খবর দেন। খবর পেয়ে বন বিভাগের কর্মীরা এসে মরদেহটি উদ্ধার করেন।
চাঁদপাই রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) জানান, স্থানীয় জেলেদের সহযোগিতায় মরদেহটি উদ্ধার করে মোংলা থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।
এদিকে মেহেদীর বাড়িতে নেমে এসেছে শোকের মাতম। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। সন্তান হারানোর শোকে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন তাঁর মা। যে ছেলেটি পরিবারের অভাব দূর করতে সাগরে মাছ ধরতে যেত, সেই ছেলের নিথর দেহই ফিরল বাড়িতে।
মেহেদীর মৃত্যুর পর নতুন করে সামনে এসেছে মোংলা ও রামপাল অঞ্চলের জেলেদের নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি। স্থানীয় সূত্রের দাবি, এ অঞ্চলের সাগরগামী প্রায় ৯০ শতাংশ মাছ ধরার ট্রলারে লাইফ জ্যাকেট, লাইফ বয়া কিংবা প্রয়োজনীয় প্রাথমিক নিরাপত্তা সরঞ্জাম থাকে না। ফলে জীবিকার তাগিদে প্রতিনিয়ত জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাগরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন হাজারো জেলে।
জেলে সমিতির এক নেতা বলেন, “একটি লাইফ জ্যাকেটের দাম প্রায় দেড় হাজার টাকা। মহাজনরা সেটিও দিতে চান না। সরকার থেকেও পর্যাপ্ত নিরাপত্তাসামগ্রী দেওয়া হয় না। আজ মেহেদী মারা গেল, কাল হয়তো আরেকজনের এমন পরিণতি হবে।”
পুলিশ জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া ও ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। এদিকে মরদেহ উদ্ধারের পর ঘটনাস্থল ও সংশ্লিষ্ট এলাকায় মোংলা কোস্টগার্ড, নৌ পুলিশ এবং বন বিভাগের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
মেহেদীর এই মর্মান্তিক মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের স্বপ্নই নিভিয়ে দেয়নি, বরং সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া হাজারো জেলের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। জীবিকার তাগিদে যারা প্রতিদিন নদী ও সাগরে পাড়ি জমান, তাঁদের জীবন রক্ষায় কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
এসএ




Comments