যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার ০.২৫ শতাংশ বাড়িয়ে প্রায় ৩.৯ শতাংশে উন্নীত করেছে। ২০২৩ সালের পর এই প্রথম মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিল। গত পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে মূল্যস্ফীতির হার কাঙ্ক্ষিত দুই শতাংশের লক্ষ্যমাত্রার উপরে অবস্থান করছে। আগস্ট মাসে ভোক্তা মূল্য সূচক আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩.৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং জুলাইয়ের তুলনায় মাসিক বৃদ্ধির হার চারগুণ বেড়ে শূন্য দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছেছে। এই ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতিকে বাগে আনতেই সুদের হার ৩.৭৫ শতাংশ থেকে ৪.০ শতাংশের সীমায় উন্নীত করা হয়েছে। আগামীতে আরও এক দফা হার বাড়িয়ে ৪.১ শতাংশ করা হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ফেডারেল রিজার্ভের এই পদক্ষেপটি ঋণগ্রহীতাদের জন্য নেতিবাচক বার্তা নিয়ে এলেও সঞ্চয়কারীদের জন্য কিছুটা স্বস্তির খবর হয়ে এসেছে।
সেন্ট্রাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ারশ সম্প্রতি জানিয়েছেন, অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতি দীর্ঘায়িত হতে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তিনি উল্লেখ করেন যে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন নিম্নআয়ের মানুষেরা, আর তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এলে তারাই সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন। সুদের হার বাড়ানোর মূল উদ্দেশ্য হলো সাধারণ মানুষ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের খরচ করার ক্ষমতা কমিয়ে বাজারে ঘরবাড়ি, গাড়ি এবং অন্যান্য পণ্য ও সেবার চাহিদা হ্রাস করা, যার ফলে সামগ্রিক অর্থনীতি কিছুটা ধীরে চলবে এবং পণ্যের দামের ওপর থেকে ঊর্ধ্বমুখী চাপ কমে আসবে।
এই সিদ্ধান্তের ফলে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে যারা ঘরবাড়ি, গাড়ি বা বড় কোনো গৃহস্থালি সরঞ্জাম কিনতে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীল, তাদের ওপর। একইসঙ্গে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে বকেয়া পরিশোধ করছেন এমন গ্রাহকদের ওপরও বাড়তি সুদের চাপ পড়বে। ক্রেডিট কার্ডের সুদের হার মূলত ব্যাংকের প্রাইম রেটকে অনুসরণ করে এবং ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার পরিবর্তন করার এক মাসের মধ্যেই ক্রেডিট কার্ডের সুদের হার পরিবর্তিত হয়। ফলে আগামী এক-দুই মাসের মধ্যে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারকারীদের সুদের হার অন্তত ০.২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে। নিউ ইয়র্ক ফেডের তথ্য অনুসারে, বর্তমান জীবনযাত্রার বাড়তি খরচের সাথে মেটাতে আমেরিকানরা দিন দিন ক্রেডিট কার্ডের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, যার ফলে ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ক্রেডিট কার্ডে মোট বকেয়ার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১.২৬ ট্রিলিয়ন ডলারে।
অবশ্য বিশ্লেষকদের মতে, এককভাবে মাত্র ০.২৫ শতাংশের এই বৃদ্ধিটি সাধারণ মানুষের ওপর তাৎক্ষণিকভাবে বিশাল কোনো নেতিবাচক ধাক্কা দেবে না। তবে পরপর কয়েক দফায় যদি সুদের হার বাড়ানো হতে থাকে, তবে সেটির সম্মিলিত প্রভাব বেশ ভারী হয়ে উঠবে। গাড়ির বাজারের ক্ষেত্রেও এই সুদের হার বৃদ্ধি চাপ তৈরি করবে। কারণ ইতিমধ্যেই নতুন গাড়ির গড় দাম ৫০ হাজার ডলার ছাড়িয়ে গেছে এবং বর্তমানে নতুন ও ব্যবহৃত গাড়ির ঋণের গড় সুদের হার যথাক্রমে ৭ শতাংশ ও ১০.৬ শতাংশে রয়েছে। গাড়ি কিনতে গিয়ে প্রতি মাসে গড়ে ৭৬৫ ডলার পর্যন্ত কিস্তি গুণতে হচ্ছে গ্রাহকদের।
অন্যদিকে, বন্ধকী ঋণ (মর্টগেজ)-এর সুদের হার সরাসরি ফেডের নীতি নির্ধারণী হারের সঙ্গে সম্পর্কিত না হলেও তা মূলত ১০ বছর মেয়াদী ট্রেজারি নোটের লাভের ওপর নির্ভর করে। সম্প্রতি জ্বালানি পণ্যের দাম বৃদ্ধি এবং ক্রমবর্ধমান সরকারি ঋণের কারণে এই ১০ বছর মেয়াদী ট্রেজারি নোটের লাভ ৫ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। ফলে গত সপ্তাহে ৩০ বছর মেয়াদী ফিক্সড মর্টগেজ ঋণের গড় হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬.৭৬ শতাংশে, যা বিগত ১৪ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। আবাসন খাতে সুদের হার বৃদ্ধির এই ধাক্কা ইতিমধ্যেই স্পষ্ট হতে শুরু করেছে এবং বিগত তিন মাস ধরেই পুরনো ঘরবাড়ি বিক্রির পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। অবশ্য মহামারী করোনার সময় যারা কম সুদে অর্থাৎ ৪ শতাংশ বা তার চেয়েও কম হারে দীর্ঘমেয়াদী মর্টগেজ ঋণ লক করে নিয়েছিলেন, তারা এই সুদের হার বৃদ্ধির চাপ থেকে কিছুটা সুরক্ষার ভেতরে থাকছেন।
তবে এই সুদের হার বৃদ্ধির ফলে কেবল ঋণগ্রহীতারাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তা নয়, বরং ব্যাংকে টাকা জমানো সঞ্চয়কারীদের জন্য কিছুটা ভালো সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ফেড সরাসরি সেভিংস অ্যাকাউন্ট বা সার্টিফিকেট অব ডিপোজিটের সুদের হার নির্ধারণ না করলেও তাদের এই সিদ্ধান্ত পুরো ব্যাংকিং খাতের জন্য দিকনির্দেশনা তৈরি করে। ২০২২ সালের শুরুতে যেখানে এক বছর মেয়াদী সার্টিফিকেট অব ডিপোজিটের সুদের হার ছিল মাত্র ০.১৫ শতাংশ, সেটি পরবর্তীতে বৃদ্ধি পেয়ে গত মাসে ১.৭১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে অনলাইন ব্যাংকগুলো নতুন আমানতকারীদের আকৃষ্ট করতে অধিক সুদের হার অফার করছে। যদিও সে ক্ষেত্রে অনেক সময় প্রাথমিক জমার পরিমাণ কিছুটা বেশি রাখার শর্ত প্রযোজ্য থাকে।
সূত্র: এপি
এমআর




Comments